kalerkantho

সোমবার। ২৭ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ মাঘ ১৪২৬। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

বরিশালে প্রবাসীর বাড়িতে তিনজনের লাশ

বরিশাল অফিস   

৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বরিশালে প্রবাসীর বাড়িতে তিনজনের লাশ

মায়ের নিথর দেহ পড়ে ছিল বেলকনিতে। ভগ্নিপতির লাশ খাটে, তাঁর মাথা ঝুলে ছিল মেঝেতে। আর হাত-পা বাঁধা খালাতো ভাইয়ের লাশ ছিল পুকুর ঘাটে। কুয়েতপ্রবাসীর বাড়িতে খুন হওয়া লাশগুলো ছিল ছড়ানো-ছিটানো। কুয়েতের একটি মসজিদের ইমাম হাফেজ আব্দুর রব হাওলাদারের বরিশালের বানারীপাড়ার বাসা থেকে গতকাল শনিবার সকালে লাশগুলো উদ্ধার করে পুলিশ। যাঁদের লাশ উদ্ধার হয়েছে তাঁরা হলেন কুয়েতপ্রবাসীর মা মরিয়ম বেগম (৭৫), বোন মমতাজ বেগমের স্বামী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শফিকুল আলম (৬৫) এবং খালাতো ভাই মো. ইউসুফ। ময়নাতদন্তের জন্য লাশগুলো শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে, তিনজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে জাকির হোসেন নামের এক যুবককে আটক করা হয়েছে। হত্যারহস্য এখনো ভেদ করতে পারেনি পুলিশ। তবে মনে করা হচ্ছে, জাকিরের সহযোগিতায় ট্রিপল মার্ডার হতে পারে। প্রবাসীর স্ত্রীর আপত্তিকর ছবি জাকিরের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ওই ছবি দেখিয়ে প্রবাসীর স্ত্রীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়টি দেখে ফেলায় তিনজনকে খুন করা হয়ে থাকতে পারে। জাকির হোসেনের পাশাপাশি আরো কয়েকজনকে খুঁজছে পুলিশ।

প্রবাসীর স্ত্রী মিশরাত জাহান মিশু বলেন, রাতে খাবার খেয়ে দক্ষিণমুখী একতলা বাসার প্রথম সারির পশ্চিম দিকের কক্ষে ননদ মমতাজের স্বামী শফিকুল আলম ঘুমাতে যান। নলছিটির বাসিন্দা শফিকুল দুই দিন হয়েছে শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে এসেছেন। বিপরীত পাশের পূর্ব দিকের কক্ষে ভ্যানচালক দেবর ইউসুফ ছিলেন। পরের দুটি কক্ষের একটিতে তিনি (মিশরাত) তাঁর দুই সন্তান ইশফাত (৯) ও চার বছরের নুরজাহানকে নিয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন। আরেকটি কক্ষে শাশুড়ি মরিয়ম ও জায়ের মেয়ে আছিয়া আক্তার আফিয়া ছিলেন।

মিশরাত আরো বলেন, বছরখানেক ধরে রাজমিস্ত্রি জাকির হোসেন ভবন নির্মাণের কাজ করে আসছিলেন। একপর্যায়ে জাকির পরিবারকে জানান, ঘরে জিনের আছর পড়েছে। জিন তাড়াতে হবে। কয়েক দিন ধরেই তিনি জিন তাড়ানোর জন্য রাতে বাসায় আসছিলেন। জাকির বলেছেন রাতে দরজা খুলে রাখতে, যাতে ভালো জিন এসে আছর কেটে ফেলবে। পর পর দুই দিন বাসার দরজা খোলা রাখলেও কেউই ঘরে আসেনি। তাই শুক্রবার সন্ধ্যার পরপরই ঘরের দরজা আটকে ফেলেন। জিন তাড়ানোর বিষয়টি তাঁর প্রবাসী স্বামীও অবগত রয়েছেন। এ ব্যাপারে সম্প্রতি বিদেশ থেকে জাকিরকে টাকাও পাঠিয়েছিলেন।

গত শুক্রবার রাত ৮টার দিকে জাকির হোসেন বাসায় এসে দরজা খোলার জন্য বলেন। সে অনুযায়ী মিশরাত সামনের দরজা খুলে দেন। মিশরাত ও আফিয়াকে একটি কক্ষে নিয়ে গিয়ে জাকির তাঁদের আপত্তিকর অবস্থার ছবি ধারণ করেন। এতে বাধা দিলে জাকির তাঁদের বলেন, ‘জিন তোমার দুই সন্তানকে মেরে ফেলবে।’ তখন ঘরের মধ্যে লোকজনের ধস্তাধস্তি তাঁরা শুনতে পান। জিনরা ঘরের ভেতর ধস্তাধস্তি করছে বলে তাঁদের জাকির বলেন। ঘরের আলমারি থেকে জাকির স্বর্ণালংকার নিয়ে ভোরের দিকে চলে যান।

চাখার সরকারি ফজলুল হক কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী আছিয়া আক্তার আফিয়া বলে, ‘জাকির চলে যাওয়ার পর আমার কক্ষে গিয়ে দেখি দাদি সেখানে নেই। পাশের বেলকনিতে দাদির নিথর দেহ পড়ে আছে। আমি ডাক-চিৎকার দিয়ে সামনের কক্ষে গিয়ে বিছানায় ওপর ফুফার লাশ পড়ে থাকতে দেখি। সামনের কক্ষে চাচা ইউসুফ ঘুমিয়ে ছিলেন, সেখানে তাঁকে পাওয়া যায়নি। বাইরে খুঁজতে গিয়ে দেখি তাঁর লাশ হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বাসার পেছনের পুকুর ঘাটে উপুড় করে পড়ে আছে। পরে পুলিশ এসে লাশগুলো নিয়ে যায়।’ আছিয়া আরো বলে, ‘কক্ষের ভেতর যখন শব্দ হচ্ছিল, তখন ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেছি। কিন্তু রাজমিস্ত্রি বলেছে, ভেতরে গেলে জিন মেরে ফেলবে। তাই ভয়ে আর যাইনি। এমনকি ঘটনার পর জাকিরের নাম বলিনি।’

লাশগুলো যখন ঘরের ভেতর থেকে বাইরে নামিয়ে রাখা হচ্ছিল, তখন লাশ দেখার জন্য ওই বাড়ির উঠানে সাধারণ লোকজনের সঙ্গে জাকিরও এসেছিলেন। ঠিক তখনই প্রবাসীর মেয়ে ইশফাত ঘটনাস্থলে থাকা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বলে, রাতে জাকির হোসেন তাদের ঘরে এসেছিলেন। তখন প্রবাসীর স্ত্রী ঘটনার সত্যতা স্বীকার করলে, ঘটনাস্থল থেকে জাকিরকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রবাসীর বাড়িতে কাজ করার সময় তাঁর স্ত্রীর আপত্তিকর অবস্থার ছবি জাকির ধারণ করেছিলেন। সেই ছবি দেখিয়ে পুত্রবধূর সঙ্গে অবৈধ মেলামেশার সময় শাশুড়ি দেখে ফেলেন। মূলত সাক্ষী সরিয়ে ফেলার চিন্তা থেকে ট্রিপল মার্ডারের ঘটনা ঘটেছে।

বরিশালের উজিরপুর সার্কেল অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাকিবুল ইসলাম বলেন, ট্রিপল মার্ডারের সঙ্গে জাকির হোসেন জড়িত। জাকিরের কাছ থেকে আপত্তিকর কিছু ছবি উদ্ধার করা হয়েছে। এমনকি রাত সাড়ে ৪টায় প্রবাসীর স্ত্রীর বিকাশ নম্বর থেকে জাকিরের মুঠোফোনে পাঁচ হাজার টাকা পাঠানোর তথ্যও তাঁদের কাছে রয়েছে। তবে কী কারণে তিনজন খুন হয়েছেন, তা উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে। লাশের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। তবে প্রত্যেকের নাগ ও কান দিয়ে রক্ত ঝরছিল।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা