kalerkantho

রবিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০২০। ৫ মাঘ ১৪২৬। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

জাতীয় বিচার বিভাগীয় সম্মেলন আজ

মৌলিক কিছু সমস্যার সমাধান আশা করেন বিচারকরা

আশরাফ-উল-আলম   

৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মৌলিক কিছু সমস্যার সমাধান আশা করেন বিচারকরা

আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর বিচার বিভাগ ও বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের অনেক প্রত্যাশাই পূরণ হয়েছে। এজলাস সংকট দূর করতে দেশের বিভিন্ন জেলায় চিফ জুডিশিয়াল আদালত ভবন নির্মাণ, জজ আদালত ভবনগুলোর ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ, অতিরিক্ত জেলা জজদের গাড়ির সুবিধা, বিচারকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো (জুডিশিয়াল পে স্কেল) বাস্তবায়ন, জাতীয় আইন সহায়তা কার্যক্রম জোরদার করা, সুপ্রিম কোর্টের ডায়েরি ও দৈনন্দিন কার্যতালিকা (কজলিস্ট) অনলাইনে আনা, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি জোরদার করা এই সরকারের উল্লেখযোগ্য সাফল্য।

এর পরও মৌলিক কিছু দাবি রয়েছে বিচারকদের। আজ শনিবার জাতীয় বিচার বিভাগীয় সম্মেলনে ওই দাবিগুলোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আসবে বলে আশা করছেন সারা দেশে নিয়োজিত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা।

গত ২০ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট জাতীয় বিচার বিভাগীয় সম্মেলন-২০১৯ অনুষ্ঠানের তারিখ জানিয়ে বলেছেন, রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে সম্মেলনে থাকবেন। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বিশেষ অতিথি থাকবেন। এ ছাড়া একাধিক মন্ত্রী ও বিচারপতি উপস্থিত থাকবেন। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন সভাপতিত্ব করবেন।

ঢাকায় কর্মরত একজন বিচারক নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা গণমাধ্যমে কথা

 বলতে পারি না। আন্দোলন করতে পারি না। আমাদের দাবিদাওয়া পেশ করা যায় না কোথাও। আমরা সম্মেলনের দিকে তাকিয়ে থাকি।’

একাধিক বিচারকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা মনে করেন প্রতিটি সম্মেলনেই বিচার বিভাগের সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। ২০১৫ সালে বিচার বিভাগের জন্য পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ওই পরিকল্পনা সব বাস্তবায়িত হয়েছে কি না বা বাস্তবায়নের অন্তরায় কী, তা নিয়ে সম্মেলনে আলোচনা হতে পারে। তার মধ্যে বিচার বিভাগের কিছু মৌলিক সমস্যা সমাধানের ঘোষণা বিচারকরা আশা করেন।

সহকারী জজদের স্টেনো টাইপিস্ট : সারা দেশে ৩৭ লাখেরও বেশি মামলা এখন বিচারাধীন। এই মামলাগুলোর বেশির ভাগই সিনিয়র সহকারী জজ ও সহকারী জজ আদালতে। তাঁদের কোনো স্টেনো টাইপিস্ট নেই। কাজেই প্রতিটি মামলার রায় ও আদেশ তাঁদের নিজ হাতে লিখতে হয় বা কম্পোজ করতে হয়। এ কারণে ঝুলে থাকে অনেক আদেশ ও রায়।

এজলাস সমস্যা : দেশের বিভিন্ন জেলায় মুখ্য বিচার বিভাগীয় হাকিম (চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট) আদালত ভবন করা হলেও এখনো অনেক জেলায় কাজ শুরু হয়নি। সেসব জেলায় এজলাস সংকট রয়েছে। এক এজলাসে ভাগাভাগি করে দইু-তিনজন বিচারককে বিচারকাজ পরিচালনা করতে হচ্ছে। ঢাকার জজ আদালতেই বেশ কয়েকটি এজলাস রয়েছে যেখানে দুজন বিচারক বিচারকাজ পরিচালনা করেন। বিচারকদের খাসকামরা নেই। স্টোররুম বা অন্য কোনো কক্ষ খাসকামরা হিসেবে ব্যবহার করছেন তাঁরা। ঢাকার মুখ্য বিচার বিভাগীয় হাকিম আদালতে প্রতিটি এজলাসে দুজন করে বিচারক কাজ করেন। এ রকম দেশের অনেক জেলায়ই বিচারকদের পৃথক এজলাস নেই।

বিচারক সংকট : বর্তমানে জজ আদালতগুলোতে পাঁচ শ্রেণির বিচারক আছেন। জেলা ও দায়রা জজ, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, যুগ্ম জেলা জজ ও সহকারী দায়রা জজ, সিনিয়র সহকারী জজ এবং সহকারী জজ। অতিরিক্ত জেলা জজ থেকে সহকারী জজরা মুখ্য বিচার বিভাগীয় হাকিম, অতিরিক্ত মুখ্য বিচার বিভাগীয় হাকিম, জ্যেষ্ঠ বিচার বিভাগীয় হাকিম ও বিচার বিভাগীয় হাকিমের দায়িত্ব পালন করছেন। সারা দেশে বিচারকদের যে পরিমাণ পদ রয়েছে সে তুলনায় মামলার পরিমাণ বেশি। আবার বিভিন্ন জেলায় মামলার সংখ্যানুপাতে বিচারক নেই। মামলার সংখ্যানুপাতে বিচারক নিয়োগ দেওয়ার দাবি বিচারকদের।

পদোন্নতি : বর্তমানে জেলা জজ, অতিরিক্ত জেলা জজ, যুগ্ম জেলা জজ পর্যায়ে বেশ কিছু পদ খালি আছে। অথচ পদোন্নতি দিয়ে এ খালি পদগুলো পূরণ করা হচ্ছে না।

চাকরির বয়স বাড়ানো হয়নি : বিচারকদের দাবিগুলোর মধ্যে বয়স বাড়ানোর দাবিটি অন্যতম। দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়টি ঝুলে রয়েছে। উচ্চ আদালতের বিচারকদের চাকরির বয়স বাড়ানো হলেও নিম্ন আদালতের বিচারকদের ক্ষেত্রে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এ বিষয়টি নিয়ে বিচারকরা ক্ষুব্ধ বলে জানা গেছে।

নিরাপত্তাহীনতা : ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারা দেশের আদালত এলাকায় বোমা হামলা এবং পরবর্তী সময়ে ঝালকাঠিতে জঙ্গি বোমায় দুই বিচারক নিহত হওয়ার পর বিচারকরা জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে সরকারের কাছে নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু সব দাবি এখনো পূরণ হয়নি। জেলা জজ পদমর্যাদার বিচারকরা গানম্যান পেলেও অতিরিক্ত জেলা জজ ও অন্য বিচারকরা এখনো পাননি।

বাসস্থান সমস্যা : প্রতিটি জেলায় কর্মরত সব বিচারকের জন্য একই স্থানে বাসস্থানের ব্যবস্থা করার দাবি ছিল তাঁদের। কিন্তু এখনো এই দাবি পূরণ হয়নি। তাঁরা বলছেন, এক স্থানে সবার বাসা হলে নিরাপত্তা ও বিচারকদের যাতায়াত—দুটো ক্ষেত্রেই সুবিধা হবে। বিচার বিভাগ পৃথককরণসংক্রান্ত মাসদার হোসেন মামলায় সুপিম কোর্ট বিচারকদের বাসস্থান নির্মাণের নির্দেশ দিলেও এখনো সব বিচারকের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা হয়নি বলে জানা গেছে। বিচারকরা বিভিন্ন কাজে ঢাকায় এলে তাঁদের আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বা হোটেলে উঠতে হয়। ঢাকায় ডরমেটরি না থাকায় তাঁরা ঢাকায় এসে নিরাপদে থাকতে পারেন না। অনেক বিচারকের দাবি, ঢাকায় তাঁদের জন্য একটি ডরমেটরি নির্মাণ করা হোক।

যানবাহন সমস্যা : আগে জেলা জজ পদমর্যাদার বিচারকরা গাড়ি পেতেন। সম্প্রতি অতিরিক্ত জেলা জজদের গাড়ি দেওয়া হয়েছে। অন্য বিচারকদের গাড়ি নেই। অথচ ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে কর্মরত বিচারকদের বিভিন্ন কাজে দায়িত্ব পালন করতে যেতে হয়।

বিচার বিভাগীয় প্রশিক্ষণ একাডেমি : সুষ্ঠু ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য বিচারকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই বলে তাঁরা মনে করেন। তাঁরা বলছেন, আদালত প্রশাসনে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিচারকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, বিচারব্যবস্থায় তথ্য-প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার, মামলা ব্যবস্থাপনা, প্রচলিত আইন-কানুন সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা অর্জনের জন্যই বিচারকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব থাকায় বিচার বিভাগের বিভিন্ন আদেশ ও কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনার জন্ম হয়। এ ধরনের সমালোচনা দূর করা ও বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা বাড়াতে ‘জাতীয় বিচার বিভাগীয় একাডেমি’ স্থাপনের প্রস্তাব সুপ্রিম কোর্ট থেকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে আশাব্যঞ্জক সাড়া পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট ঘোষণার দাবি রয়েছে বিচারকদের। এ ছাড়া সমতার ভিত্তিতে বিদেশে প্রশিক্ষণে পাঠানোরও দাবি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা