kalerkantho

সোমবার। ২৭ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ মাঘ ১৪২৬। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

চিলের আকাশ-বিশ্রাম

বিপ্রদাশ বড়ুয়া

৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চিলের আকাশ-বিশ্রাম

সবার অতি পরিচিত ভুবন চিল ঢাকার আকাশে প্রায় সারা বছর রাজকন্যা ও যুবরাজ হয়ে ভেসে বেড়ায় গোপন সৌরভ ছড়িয়ে। দুজনের গায়ের রং খয়েরি হলেও দূর থেকে কালচে দেখায়। মনে হয়, ভাবনা-চিন্তাহীন আর কখন যে খাওয়া-দাওয়া করে সেই চিন্তাহীন। দুর্দান্ত অথচ নির্ভার চিন্তাহীন সৌন্দর্যের পাবকশিখা। বাংলার প্রায় সব বড়-ছোট শহরে দেখা গেলেও রাজধানীতেই সংখ্যায় গরিষ্ঠ। তীক্ষ চিঁ-হিঁ-হিঁ ডাক তরঙ্গময় ও বিষাদে মাখামাখি সুর-মধুর আবেদনশীল। আর মৃত-জীবিত প্রাণী থেকে শহর-নগরীর বর্জ্য খেয়ে পরিষ্কারকের ভূমিকা রাখে।

শকুনের চেয়ে আকার ও আয়তনে ছোট। পুকুর-নদী-বিল থেকে ছোঁ মেরে নির্ভুলভাবে শিকার ধরে নিতে চৌকস। আবার শহর-নগরীর ব্যস্ত রাজপথে নির্ভুলভাবে গাড়ির পাশ কাটিয়ে রাস্তায় পড়ে থাকা খাবার ঠোঁটে-পায়ের নখে তুলে নিতে ওস্তাদ। তারপর নিরাপদ জায়গায় গিয়ে আহার সমাপ্ত করে। আবার উড্ডীন অবস্থায়ও গিলে খেতে পারঙ্গম। শিকারি বড় পাখির এই দস্তুর।

পেট ভরে গেছে। তারপর গাছে বা পাঁচ-দশ তলা ভবনের কার্নিশে বা রমনা-সোহরাওয়ার্দী-বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার অবশিষ্ট পুরনো বৃক্ষের নির্জন ডালে বিশ্রাম-সুখসেবা নেয়। তবে চিল-জাতীয় বড় পাখার পাখি, যেমন বিশাল অ্যালবাট্রস পাখি বিশ্রাম নেয় ঊর্ধ্ব আকাশে পাখা মেলে, ভেসে বেড়ানোয়। যেমন অ্যালবাট্রসের, এতে তাদের শক্তি ক্ষয় হয় না, পাখসাট মারতে হয় না বলে। আমিও শেষ বিকেলে উত্তরের চার পাল্লার কপাট খুলে শ্বেত-শিমুলে সুকোমল দু-তিনটি বালিশে মাথা মহাশয়কে রেখে বিশ্রাম-সুখসেবা নিতে নিতে ওদের উপভোগ করি। ওরা কি জানে? ওদের কেউ কেউ নজরদারি করে!

স্বাস্থ্য ও কর্মোপলক্ষে অক্টোবর-নভেম্বর মাসের দীর্ঘ সময় কলকাতা থাকার কালে এই পারিয়া চিলের মায়া-সৌন্দর্যের খপ্পরে পড়ি। আমার পাশের পাঁচতলা ভবনের ওপর টেলি-যোগাযোগের টাওয়ারের লোহার কাঠামোর টানা দাঁড়ে বসে চিলরাণী সকাল থেকে সুমিষ্ট চিঁ-হিঁ-হিঁ ডাক পেড়ে আমাকে উতল করে তোলে। ভাদ্রের পচা গরমে ওদের আক্ষেপ-অসোয়াস্তি নেই। নিয়মিত বিরতিতে গান বা সংগীতবার্তা দিয়েই চলেছে। খুব কাছাকাছি আর এমন কোনো চিলকন্যার গান নেই। উত্তর ও পূব দিকে নেই। হ্যাঁ, অদূরে পশ্চিমে আছে একজনার। সে এক লপ্তে ডাকে পাক্কা তেরো বার। হাতের আঙুলে

বারবার হিসাব করে নিলাম। নিখুঁত তেরো। পূব দিকের অন্য কন্যা পাঁচবার ডাকছে এক লপ্তে। আমি দ্বন্দ্বে পড়ে হাবুডুবু। ছেলেবেলায় আমার গ্রামের বাড়ির উত্তর-পূব কোণের বিশাল শিমুল তুলো বৃক্ষে শকুন বসে থাকত বিশ্রাম নিতে। ওদের বিষ্ঠার গন্ধে দূর থেকে ওদের দেখতাম। কোনো আশ্রয়প্রার্থী পশু-পাখি আমাদের ভিটেয় ছিল নিরাপদ। ভিটেয় শণ ও লেবু বাগানে ছিল শেয়ালের টাট্টিখানা। বন-বিড়ালও আসত বলে আমাদের বছর-কাবারি তিন স্থায়ী চাষিকর্মী বলত। ওদিকে জোড়া পুকুর পাড়ের শতবর্ষীপ্রায় আমগাছে ডাকত কুরকাল-চিল। চিলের ডাকে আছে করুণ এক সুরমূর্ছনা, মাদকতা, প্রেম-ভালোবাসার বাসনা-সৌকর্য।

কেন এত অঙ্ক কষা! আসলে চিলের ডাকে আছে নিবিড় করুণ কান্নার আবেশ, মানুষের দৃষ্টিতে। আর মাদকতা, ভালোবাসার বাসনা-সৌকর্য। মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভবনের পুকুরে শীতে আসে পরিযায়ী পাখি। ওরা সন্ধ্যেয় খাবার খুঁজতে চলে যায় কোনো বিলে। খুব ভোরে ফিরে আসে। ওদের আসা-যাওয়া চলে আমার আস্তানার মাথার ওপর দিয়ে আকাশ-পথে। সেও এক আশ্চর্য মধুর চলমান সংগীত ওরা যেতে-আসতে ফেলে রেখে যায়। একদিন মতিঝিলের সাততলা ভবনে কর্মোপলক্ষে যেতে হয়। তখন শীতের পরিযায়ী পাখিদের দেখি। পুকুরের পানির ওপর দিয়ে এপার-ওপার টানা দড়ি দিয়েও অতিথি বা পরিযায়ী পাখিদের খাবার দেওয়া হয় মাঝ পুকুর অঞ্চলে। পাখিদের প্রতি এই আতিথেয়তায় মন ভরে গেল। সে দশ-কুড়ি বছর আগের কঠিন সময়ে।

বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে চাকরি করার সময় কিছু দুর্লভ গাছ দেশের শিল্পী-সাহিত্যিকদের হাতে রোয়ার উদ্যোগ নিই। একদিন বাগানের মালি সালাউদ্দিনসহ ডিসেম্বরের প্রথম দিকে তমালগাছের যত্ন নিতে গিয়ে দেখি পশ্চিম পাশে বিশাল অশ্বত্থ গাছে চিল বাসা করছে কাঠিকুঠি দিয়ে। কিন্তু শিশু একাডেমির বাগান থেকে ঢিল নেওয়ার কী দরকার পড়ল ভেবে আমি সমস্যায় পড়ে গেলাম। পাখিদের প্রাতঃস্মরণীয় ড. সলিম আলীর বই পড়ে কূল পেলাম না। পরে বুঝতে পারলাম ঝড়ে বাতাসের তোপে ভারসাম্য রক্ষার জন্য বাসাকে ভারী করার জন্য এই ব্যবস্থা। কখনো বা ইটের টুকরোও নিতে পারে। গাছের মরা ডাল ও কাঠিকুঠি দিয়ে বাসা করলে জোরে বয়ে যাওয়া হাওয়া ওই কাঠিকুঠির ফাঁক দিয়ে অনেকখানি বেরিয়ে যায়। এতে বাসা রক্ষা পায়। মালি সালাউদ্দিন এ কথা অনেক কথার মধ্যে ভুলে গিয়েছিল বোধ করি। কাকের বাসা নিচু গাছে বলে এত বিপদে পড়ে না। তাও কাক লোহার তার ইত্যাদি দিয়ে বাসার বুনট করে শক্ত। শালিকের বাসা হয় আরো নিচু ডালে। এরা প্রত্যেকেই ঝড়-বৃষ্টি ইত্যাকার সব দিক খেয়ালে রেখে বাসা বোনে।

চিল নারীর বিষণ্ন ওই তেরো ও পাঁচটি প্রেম-কাতর আমন্ত্রণের কথা এখনো শুনতে পাই শ্রেষ্ঠ গানের মতো। ওই বিষাদখিন্ন ডাক ওর কাছে প্রেমকাতরতা আর আমার কাছে মনে হয় খাণ্ডবদাহ।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা