kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

ভাষাসৈনিক রওশন আরা বাচ্চু আর নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ভাষাসৈনিক রওশন আরা বাচ্চু আর নেই

১৯৫২ সালে মেয়েদের প্রকাশ্যে সভা-সমিতি করা অনেক কঠিন ছিল। মেয়েদের বাইরে বেরোনোর ক্ষেত্রেও ছিল নানা বিধি-নিষেধ। ওই সময়টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রওশন আরা বাচ্চু প্রবল সাহস নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ভাষা আন্দোলনে। বাঙালির গৌরবোজ্জ্বল ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস রচনায় মেয়েদের মধ্যে যাঁরা ছিলেন সামনের সারিতে, তাঁদের অন্যতম রওশন আরা বাচ্চু। সেই বায়ান্নর অকুতোভয় যোদ্ধা ও ভাষাসংগ্রামী রওশন আরা বাচ্চু আর নেই। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।

রওশন আরা বাচ্চুর মেয়ে তাহমিদা বাচ্চু বলেন, ‘মা বেশ কয়েক দিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভোরে তিনি মারা যান।’

ভাষাসৈনিক রওশন আরা বাচ্চুর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদসহ আরো অনেকে। এ ছাড়া তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ২১ ফেব্রুয়ারি যেসব ছাত্রনেতা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে ছিলেন, তাঁদের অন্যতম ছিলেন রওশন আরা বাচ্চু। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির রচিত ‘ভাষা আন্দোলন ও নারী’ গ্রন্থে রওশন আরা বাচ্চু ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনা সম্পর্কে বলেন, “তখন বেলা ১০/১১টা। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রী আমতলায় জমায়েত হয়েছেন। গাজীউল হকের সভাপতিত্বে ছাত্রসভা শুরু হয়েছে। তুমুল বিক্ষোভের মধ্যে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের তর্কবিতর্ক চলছে। শেষ পর্যন্ত ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সপক্ষে বিপুলসংখ্যক ছাত্র-ছাত্রীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে মেনে নেওয়া হলো।

সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গের মতো ছাত্র-ছাত্রীরা বিক্ষোভে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ এই স্লোগানে বেরিয়ে যাচ্ছিল। সাফিয়া আপা, হালিমা আপা ও আমি প্রথম দলে গেটের কাছে আসি এবং প্রত্যেকটি ছাত্রী যাতে মিছিলে যোগ দিতে পারে সেই সুযোগ সৃষ্টিতে সাহায্য করি এবং তৃতীয় দলের সঙ্গে কর্ডন ভেদ করে মিছিলে যোগ দিই। আপসহীন বিক্ষুব্ধ ছাত্র-ছাত্রীদের ধাক্কায় পুলিশের কর্ডন ভেঙে যায়। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ। কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জের মধ্যেই অ্যাসেম্বলি হলের দিকে ছুটে যাচ্ছিলাম।”

গতকাল বিকেলে ভাষাসৈনিক রওশন আরা বাচ্চুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে তাঁর শ্রদ্ধানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে রওশন আরা বাচ্চুর মরদেহ নিয়ে আসা হয় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। এর আগে অ্যাপোলো হাসপাতাল থেকে তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় মোহাম্মদপুরে।

বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে রওশন আরা বাচ্চুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, জাতীয় অধ্যাপক ভাষাসংগ্রামী অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, লোকগবেষক শামসুজ্জামান খান, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী, ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেল, প্রাবন্ধিক মোনায়েম সরকার প্রমুখ। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করে বাংলা একাডেমি ও লেখিকা সংঘ।

আনিসুজ্জামান বলেন, ‘১৯৫২ সালে তিনি ভাষাসংগ্রামী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছিলেন। এত বছর বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর মমতা ও সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের দাবি জানিয়েছিলেন। আমি তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করি।’

অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, রওশন আরা বাচ্চু অত্যন্ত সাহসী নারী ছিলেন। ভাষা আন্দোলন থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলা ভাষার প্রশ্নে তিনি সর্বদা সোচ্চার ছিলেন।

বাংলা একাডেমি থেকে তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে। সেখানে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর পশ্চিম মনিপুরীপাড়ার বাসায়। বাদ মাগরিব সেখানকার বায়তুল আমান জামে মসজিদে তাঁর দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর রাতেই তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে সিলেটের কুলাউড়া থানার উছলাপাড়া গ্রামে তাঁর নিজ বাড়িতে। সেখানে আজ বুধবার সকালে তাঁর দাফন সম্পন্ন হবে।

রওশন আরা বাচ্চু ১৯৩২ সালের ১৭ ডিসেম্বর সিলেটের কুলাউড়া থানার উছলাপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম এ এম আরেফ আলী ও মায়ের নাম মনিরুন্নেসা খাতুন।

১৯৪৭ সালে পিরোজপুর গার্লস স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে ১৯৪৮ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন রওশন আরা। এরপর ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে অনার্স করে ১৯৬৫ সালে বিএড এবং ১৯৭৪ সালে ইতিহাসে এমএ পাস করেন।

পেশাগত জীবনে তিনি শিক্ষকতা করতেন। যুক্ত ছিলেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে; যার মধ্যে রয়েছে ঢাকার আনন্দময়ী স্কুল, লিটন অ্যাঞ্জেলস, আজিমপুর গার্লস স্কুল, নজরুল একাডেমি, কাকলী হাই স্কুল এবং আলেমা একাডেমি। ২০০০ সালে তিনি বিএড কলেজের অধ্যাপক হিসেবে অবসরগ্রহণ করেন।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা