kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

মৌসুমের শুরুতেই তিস্তার বুকজুড়ে চর, ঘোষণা হচ্ছে বালুমহাল

সেচের অভাবে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে ► হুমকির মুখে পড়েছে জীববৈচিত্র্য

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

২৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মৌসুমের শুরুতেই তিস্তার বুকজুড়ে চর, ঘোষণা হচ্ছে বালুমহাল

‘বন্যা আর মরুভূমি করি ভারত হামাক মারি ফেলবার চায়। দুঃখ একটাই, দ্যাশ স্বাধীনের ৪৮ বছর পার হইল; কিন্তু বাঁচি থাকতে তিস্তার পানি চুক্তি দেকি যাবার পাইনো না।’

ক্ষোভ প্রকাশ করে কথাগুলো বলছিলেন রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার কোলকোন্দ ইউনিয়নের বিনবিনা চরের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব মনছুর আলী। এমনি করে শুকনো মৌসুমের শুরুতেই ধু-ধু বালুচরে পরিণত হওয়া তিস্তা নদীর পারের লাখো মানুষ হতাশ। তবে ড্রেজিং করার লক্ষ্যে তিস্তার চরকে এ বছর বালুমহাল ঘোষণা করতে যাচ্ছে রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড।

৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ খরস্রোতা তিস্তা নদী সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলের দার্জিলিং-জলপাইগুড়ি হয়ে বাংলাদেশের লালমনিরহাট, রংপুর হয়ে কুড়িগ্রামের চিলমারীর ভেতর দিয়ে ১২৪ কিলোমিটার অতিক্রম করে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে। হাজার বছর ধরে এই নদী ঘিরে গড়ে উঠেছে রংপুর অঞ্চলের মানববসতি ও সভ্যতা, ভাটিয়ালি আর ভাওয়াইয়া গান। তিস্তার পানি এখন উজানে ভারতের হাতে বন্দি। পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়ায় তিস্তা এখন এ অঞ্চলের মানুষের দুঃখ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রবাহহীন তিস্তার বুক জুড়ে জেগে উঠেছে বিস্তীর্ণ চর। হুমকির মুখে পড়েছে জীববৈচিত্র্য।

সরেজমিনে দেখা যায়, হাজার হাজার পরিবার যারা তিস্তা নদীকে ঘিরে গড়েছিল বসতি ও জীবন, তারা এখন পুরোপুরি বেকার। শুধু তিস্তায় পানি না থাকার কারণে এই অঞ্চলের ধরলা, ঘাঘট, যমুনেশ্বরী, আখিরা, দুধকুমার, বুড়ি তিস্তাসহ প্রায় ৩৩টি ছোট-বড় নদ-নদী ও শাখা খালগুলো ভরাট হয়ে গেছে। রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার জয়রামওঝা চরের বাসিন্দা দুলাল মিয়া জানান, আগে তাঁরা তিস্তার চরে গম, ভুট্টা, কাউন,

চিনাবাদাম, আলুসহ নানা ফসল ফলাতেন। নদীর পানিতে সেচ সুবিধা থাকায় উৎপাদন খরচ কম হতো। কিন্তু কয়েক বছর ধরে তিস্তা শুকিয়ে যাওয়ায় চাষাবাদ নিয়ে বেকায়দায় পড়েছেন তাঁরা।

পানির অভাবে তিস্তার ছোট-বড় শতাধিক খেয়াঘাট বন্ধসহ নৌ যোগাযোগে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। জয়রামওঝা এলাকার বাসিন্দা মৎস্যজীবী আব্দুস সামাদ ও মজিবর ঘাটিয়ালসহ সংশ্লিষ্টরা জানান, এক মাস ধরে তাঁরা বলতে গেলে বেকার। এ অবস্থায় তাঁরা পেশা বদল করতে বাধ্য হয়েছেন।

গঙ্গাচড়ার লক্ষ্মীটারি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী জানান, কয়েক বছর ধরে তিস্তার বেহালে নানামুখী সমস্যায় পড়েছে নদীপারের মানুষ। বছরের অর্ধেক সময় নদীতে পানি না থাকায় মৎস্যজীবীরা বেকার হয়ে পড়ে। চরাঞ্চলের জমিতে আলুসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ করেও পানির অভাবে সেচ দিতে না পেরে কৃষকরা লোকসান গুনছে। খেয়াঘাটগুলো বন্ধ হওয়ায় মাঝি-মাল্লারাও বেকায়দায় পড়েছে। পানির স্তর নেমে যাওয়ায় গাছপালা মরে যাচ্ছে। চরাঞ্চলজুড়ে প্রায় মরুভূমির সৃষ্টি হয়েছে। নলকূপ কিংবা মাটির কুয়ায় ঠিকমতো পানি উঠছে না। এতে বিশুদ্ধ পানিরও সংকট দেখা দিয়েছে।

তিস্তায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রুহুল আমিন বলেন, ধু-ধু মরুভূমিতে পরিণত হওয়া তিস্তার পানিচুক্তি হওয়াটা জরুরি। নদীর বুকজুড়ে জেগে ওঠা চরে ড্রেজিং করা দরকার। তাতে নদী তীরবর্তী কৃষকরা সেচ সুবিধা পাবে।

এদিকে বর্ষা শেষ হতে না হতেই তিস্তায় জেগে উঠেছে চর। গঙ্গাচড়া এলাকায় ড্রেজিং করার লক্ষ্যে তিস্তার চরকে বালুমহাল ঘোষণা করতে যাচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, এর আগে তিস্তার চার কিলোমিটার অংশ ড্রেজিং করা হলেও অনেকটাই ভরাট হয়ে গেছে। এ কারণে নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী তিস্তার চরাঞ্চলকে বালুমহাল ঘোষণা করা হবে। টেন্ডারের মাধ্যমে বিক্রি করা হবে তিস্তার বালু। তাতে নদী সচল থাকবে, আসবে রাজস্বও।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা