kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৭ রবিউস সানি ১৪৪১     

সেন্ট মার্টিনস রক্ষার প্রতিশ্রুতি কাগজেই

চরম ঝুঁকিতে জীববৈচিত্র্য

আরিফুর রহমান   

২৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সেন্ট মার্টিনস রক্ষার প্রতিশ্রুতি কাগজেই

দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ, জীববৈচিত্র্যে ভরপুর, সামুদ্রিক কাছিমের প্রজননকেন্দ্র সেন্ট মার্টিনস এখন অনেকটা বিপন্ন। পর্যটকদের পদভারে, শব্দদূষণে, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণে, জেনারেটরের বিকট শব্দে, পর্যটকদের ফেলা আবর্জনায়, স্পিডবোট ও রাতের আলোর ঝলকানিতে দ্বীপটি মরমর অবস্থায়। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় পাঁচ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই সেন্ট মার্টিনসকে রক্ষায় শেষ চেষ্টা হিসেবে সরকারের সব সংস্থার মতামত নিয়ে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল দ্বীপটির জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এখানে শুধু দিনের বেলায় পর্যটকরা যেতে পারবে, রাতে দ্বীপে অবস্থান করতে পারবে না। ছেড়াদ্বীপে পর্যটকসহ সবার যাতায়াত সম্পূর্ণ বন্ধ হবে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুটি জাহাজ টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিনসে যেতে পারবে। এক দিনে ৫০০ জনের বেশি পর্যটক দ্বীপে যাওয়া-আসা করতে পারবে না। চলতি বছরের ১ মার্চ থেকে সরকারের এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে এক আন্ত মন্ত্রণালয় সভায় সরকারের নীতিনির্ধারকদের উপস্থিতিতে এসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল; কিন্তু কার্যকর হয়নি সরকারের এই সিদ্ধান্ত। ১ নভেম্বর থেকে যথারীতি আগের মতো প্রতিদিন জাহাজ ভর্তি কয়েক হাজার পর্যটক সেন্ট মার্টিনসে যাওয়া-আসা করছে। রাত যাপন করছে। জাহাজ যাচ্ছে দুইয়ের অধিক। ছেড়াদ্বীপেও পর্যটক যাচ্ছে প্রতিদিনই। দ্বীপে যাওয়ার পথে সাগরে আবর্জনা ফেলা হচ্ছে।

আন্ত মন্ত্রণালয় সভায় সব পক্ষ ঐকমত্যে পৌঁছার পরও কেন সিদ্ধান্তগুলো কার্যকর হয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মনজুরুল হান্নান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সেন্ট মার্টিনস দ্বীপের হোটেল-মোটেল মালিকদের অতিলোভের কারণে এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর হচ্ছে না। দ্বীপে রাত যাপন না করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ব্যবসায়ীরাই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা তাদের লিখিত দিয়েছি। কিন্তু কিছুতেই কাজ হচ্ছে না।’ মনজুরুল হান্নান খান বলেন, ‘পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের একার পক্ষে সেন্ট মার্টিনস রক্ষা সম্ভব নয়। আমরা চাইলেই কোনো অভিযান পরিচালনা করতে পারি না। সেন্ট মার্টিনস রক্ষায় সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। সবার সহযোগিতা না পেলে এসব আইন-কানুন, কর্মপরিকল্পনা কিছুই বাস্তবায়িত হবে না।’

তথ্য বলছে, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ডসহ বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে সেন্ট মার্টিনস দ্বীপের জীববৈচিত্র্য, প্রতিবেশ সুরক্ষা এবং টেকসই পর্যটন উন্নয়নে একটি কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছিল পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। সেই কর্মপরিকল্পনায় স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি বেশ কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু একটি সিদ্ধান্তও কার্যকর হয়নি। পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে সংগ্রহ করা কর্মপরিকল্পনা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সেন্ট মার্টিনস দ্বীপে নতুন করে কোনো রাস্তা ও হোটেল নির্মাণ করতে দেওয়া হবে না। দ্বীপের সৈকতে, সমুদ্র এবং নাফ নদে যাওয়া-আসার পথে সব ধরনের প্লাস্টিক বা প্যাকেজিং বর্জ্য ফেলা নিষিদ্ধ করা হবে। জাহাজ থেকে পর্যটকরা পাখিকে চিপস বা অন্য কোনো খাবার দিলে তা সমুদ্রে পড়ে—এটা বন্ধ করতে হবে। সৈকতে মোটরসাইকেল ও সাইকেল চালানো এবং দ্বীপের চারপাশে স্পিডবোট সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হবে। দ্বীপের সমুদ্রসৈকতে জিও ব্যাগ স্থাপন পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে হবে। কর্মপরিকল্পনায় আরো বলা ছিল, দ্বীপের সৈকতে রাতে কোনো প্রকার আলো জ্বালানো যাবে না। প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুটি জাহাজ এবং ৫০০ জনের বেশি পর্যটক দ্বীপে যাওয়া-আসা করতে পারবে না। দ্বীপের মধ্যে সৃষ্ট সব ধরনের কঠিন বর্জ্য পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। দ্বীপের ভেতর সব অবৈধ স্থাপনা বন্ধ করতে হবে। দ্বীপে কোনোভাবেই জেনারেটর চালানো যাবে না। শুধু সৌরশক্তি ব্যবহার করা যাবে। কর্মপরিকল্পনায় আরো বলা হয়েছে, সেন্ট মার্টিনসে ভ্রমণের ক্ষেত্রে ট্যুরিস্ট ফি আরোপ করা হবে। জমি ক্রয়-বিক্রয় পুরোপুরি বন্ধ থাকবে। দ্বীপে যেতে অনলাইন নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা হবে। অবৈধ হোটেল-মোটেল উচ্ছেদ করে সেন্ট মার্টিনসের ভূমির মালিকানা সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। একই সঙ্গে দ্বীপে বসবাসকারীদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

সেন্ট মার্টিনস দ্বীপ রক্ষায় এক বছর আগে তৈরি করা কর্মপরিকল্পনার কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে, তা জানতে কথা হয় সেন্ট মার্টিনসে যাওয়া একটি বেসরকারি টেলিভিশনে কর্মরত আবদুল কাইয়ুম তুহিনের সঙ্গে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরাও শুনেছি, সেন্ট মার্টিনসে রাতে অবস্থান করা যাবে না। কিন্তু দেখা গেছে, পর্যটকরা রাত্রি যাপন করছে। নতুন নতুন হোটেল-মোটেল নির্মাণ কাজ চলছে সবার চোখের সামনে। ছেড়াদ্বীপেও পর্যটক যাচ্ছে। বিভিন্ন হোটেলে রাতের বেলায় জেনারেটর চলছে। দ্বীপের উত্তর পাশে আবর্জনায় ভরা।’ তিনি বলেন, যে যেভাবে পারছে, দ্বীপের পরিবেশ নষ্ট করছে। 

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হুমায়ুন কবীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা চেয়েছি সেন্ট মার্টিনসে পর্যটক সীমিত করতে। পর্যটককে নিবন্ধন করেই দ্বীপে যেতে হবে। রাতে যদি কোনো পর্যটক দ্বীপে থাকতে চায়, সে জন্য আলাদা ফি দিতে হবে।’ এসব বাস্তবায়ন করতে পারলে একটা সময় পর্যটকরা যেতে নিরুৎসাহ হবে বলে তিনি মত দেন। আর গেলেও সব শর্ত মেনেই সেখানে যেতে হবে। তাহলে সব কুলই রক্ষা হবে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা