kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

খোদ জেলা পুলিশই জটিলতার আবর্তে

জুয়ার আসরের খোঁজ দিতে হচ্ছে মন্ত্রী-এমপিদের এসপি বললেন, পরিস্থিতি এখন অনেক ভালো

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া   

২১ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



খোদ জেলা পুলিশই জটিলতার আবর্তে

মাদক-জুয়া, চুরি-ছিনতাই, সড়ক ডাকাতি, দখলবাজি—ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাজুড়েই এমন নানা ঘটনার বিস্তার আছে। তার পরও সার্বিকভাবে জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে। তবে মাদক উদ্ধারের পর জব্দতালিকায় কম দেখানো, ব্যবসায়ীকে আটক করে মুক্তিপণ আদায়, মারধর করে ইয়াবা দিয়ে স্কুলের নৈশপ্রহরীকে ফাঁসানোর চেষ্টা—এমন নানা অভিযোগ ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশের বিরুদ্ধে। এমনকি জেলার যততত্র ছড়িয়ে থাকা জুয়ার আসরগুলোর খোঁজও দিতে হচ্ছে খোদ মন্ত্রী-এমপিদের। আবার দায়িত্ব পালনে কড়াকড়ি আরোপ করায় পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বিরাজ করছে এক ধরনের অসন্তোষ।

আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে জেলায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত ঘটনা ছিল ১৩ আগস্ট রাতে সদর হাসপাতালের সামনে সাবেক প্রতিমন্ত্রী হারুণ আল রশিদের জায়গার সীমানাপ্রাচীর ভেঙে দখলবাজি। এর আগে ১৫ জুলাই আখাউড়া পৌর এলাকার লাল বাজারে ব্রিটিশ টোব্যাকোর অফিসে পিস্তল ঠেকিয়ে সাড়ে আট লাখ টাকা ছিনতাই হয়। দুটি ঘটনারই কিনারা করতে পারেনি পুলিশ।

জেলার সর্বত্র মোটরসাইকেল চুরির ঘটনা বেড়েছে। বিশেষ করে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার বিভিন্ন অফিস ও মার্কেটের সামনে থেকে অহরহ মোটরসাইকেল চুরি হয়ে যাচ্ছে। ছিঁচকে চুরি তো আছেই। কিন্তু চুরি হওয়া মোটরসাইকেল উদ্ধার এবং অন্যান্য ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশের তৎপরতা নজরে পড়ে না।

আশুগঞ্জে গত ৬ এপ্রিল ভানু চন্দ্র দাস নামের এক গ্রাম পুলিশকে গুলি করে হত্যা রহস্যের কিনারা হয়নি। কসবায় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য শওকত হোসেন জসিম খুনের ঘটনার তিন মাসেও জড়িতরা ধরা পড়েনি।

তবে জেলার আলোচিত কিছু হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে সাফল্য দেখিয়েছে পুলিশ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আল-মামুন সরকারও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন।

যত্রতত্র জুয়ার আসর : যত্রতত্র জুয়ার আসর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আইন-শৃঙ্খলা প্রশ্নে একটি বড় সমস্যা। জেলা সদর, কসবা, আখাউড়া ও সরাইল উপজেলায় ১৫ থেকে ২০টি চিহ্নিত জুয়ার আসর রয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলার বিশ্বরোড মোড়, পৌর এলাকার কে দাস মোড়, পৈরতলা, মধ্যপাড়া, মেড্ডা, জগত্বাজারে একাধিক ক্লাবে জুয়ার আসর বসে। এ ছাড়া প্রভাবশালীদের বাড়িতেও বসানো হয় জুয়ার আসর।

বিজয়নগর উপজেলায় জুয়ার আসর সবচেয়ে বেশি। সেখানকার চম্পকনগর এলাকায় বসে জুয়ার সবচেয়ে বড় আসর। এ ছাড়া হরষপুর, চতুরপুর, কালীবাজার, আউলিয়াবাজার, সিঙ্গারবিল এলাকায় জুয়ার আসর রয়েছে। সরাইলে জুয়ার আসর রয়েছে উচালিয়াপাড়া মোড়, পাকশিমুলসহ বিভিন্ন এলাকায়। আখাউড়ার লাল হোসেন ইনস্টিটিউট (রেলওয়ে ক্লাব) ও রেলওয়ে শ্রমিক লীগের কার্যালয়ে বসে সবচেয়ে বড় জুয়ার আসর। ওই দুটি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ই রেলওয়ে থানা সংলগ্ন।

এসব জুয়ার আসর বন্ধে পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। এমনকি কোথায় কোথায় জুয়া চলে সেই তথ্য দিতে হচ্ছে খোদ মন্ত্রী-এমপিকে। যেমন আখাউড়ায় চলা জুয়ার আসর সম্পর্কে পুলিশকে তথ্য দিয়ে অভিযানের কঠোর নির্দেশনা দেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। পরে পুলিশের অভিযানে একটি আসর থেকে নগদ টাকাসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৬ জুয়াড়িকে।

আবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর আওয়ামী লীগের সম্মেলনে বড় দুটি জুয়ার আসরের উল্লেখ করে পুলিশকে অভিযান চালানোর নির্দেশনা দেন স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী।

সদর থানার ওসি সেলিম উদ্দিন এ ব্যাপারে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্দেশনা অনুযায়ী অভিযান চালানো হয়েছে। রশিদ মার্কেটের জুয়ার আসর দীর্ঘদিন ধরেই বন্ধ। আর পিয়ারা মিয়ার টাওয়ারে অভিযান চালিয়েও জুয়ার আসর পাওয়া যায়নি। অন্যান্য জুয়ার আসরের বিষয়ে পুলিশ সতর্ক রয়েছে।’

পুলিশও জড়াচ্ছে অপরাধে : বছর দুয়েক আগে মাদক জব্দ করার পর কম দেখানোর অভিযোগ উঠায় কসবা থানার পুলিশের এসআই শ্যামল মজুমদার ও মনির হোসেন, এএসআই ফারুক ও সালাউদ্দিন, কনস্টেবল শাহজাহান ও কাসেম সাময়িক বরখাস্ত হন।

এ ছাড়া জাকির হোসেন নামের এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনায় সদর থানার এসআই রফিকুল ইসলাম ও কনস্টেবল শরীফুলের বিরুদ্ধে মামলা হয়। পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তার করে আদালতের নির্দেশে জেলহাজতে পাঠায়।

সর্বশেষ গত ১৪ নভেম্বর সদর থানা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে পালাতে গিয়ে ধরা পড়েন হাইওয়ে পুলিশে কর্মরত জামিরুল ইসলাম। পরে তাঁকে হাইওয়ে পুলিশে হস্তান্তর করা হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চাকরিকালে এক দপ্তরিকে মারধরসহ নানা কারণে বিতর্কিত এই পুলিশ সদস্য গত ৫ আগস্ট প্রত্যাহার হওয়ার পর রাঙামাটির বরকল থানায় যোগ দেন। ১১ নভেম্বর তিনি হাইওয়ে পুলিশের সদর দপ্তরে যোগ দেন।

থানার পুলিশ সূত্র জানায়, জামিরুল ১৪ নভেম্বর রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এসে সদর থানা থেকে একটি মোটরসাইকেল নিয়ে বেরিয়ে যেতে চান। এ সময় থানার গেটে থাকা কনস্টেবল সালাউদ্দিন তাঁকে বাধা দেন।

সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আতিকুর রহমান জানান, মোটরসাইকেলটি নিজের বলে দাবি করলেও জামিরুল এর সপক্ষে কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে।

পুলিশেই অস্থিরতা : পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে গত ২৮ জুলাই মোহাম্মদ আনিসুর রহমান যোগদানের পর থেকে বেশ কড়াকড়ি জেলা পুলিশে। জানা গেছে, জেলা পুলিশ লাইনে মোবাইল ফোন ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। অনেকের ফোন নিয়ে নেওয়া হয়েছে। সড়কে তল্লাশির ছবি সঙ্গে সঙ্গে পাঠিয়ে দিতে হচ্ছে পুলিশের যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে। অন্যান্য দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও নজরদারি রাখা হচ্ছে। আর এসব নিয়ে জেলা পুলিশ লাইনে এক ধরনের অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অনেকেই অন্যত্র বদলির আবেদন করছেন।

তবে জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার (ডিআইও ওয়ান) ওসি ইমতিয়াজ আহমেদ পুলিশে অসন্তোষের বিষয়টি অস্বীকার করেন। অতিরিক্ত হারে বদলির আবেদন করার তথ্যও সঠিক নয় বলে জানান তিনি।   

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হেডকোয়ার্টার্স) আবু সাঈদ বলেন, ‘শৃঙ্খলা ঠিক রাখতে কিছু বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারের কারণে অনেক পুলিশ সদস্য স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। তাই ফোন ব্যবহারে কড়াকড়ির নির্দেশনা রয়েছে। তবে এসব কারণে অস্বাভাবিক হারে বদলি হওয়ার ইচ্ছা পোষণের তথ্য সঠিক নয়।’

পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান বলেন, ‘শৃঙ্খলা মানতে পুলিশকে নির্দেশনা দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। পুলিশ শৃঙ্খলার মাধ্যমে চললে দায়িত্ব পালনে সহায়ক হয়। সেই চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে পুলিশ। সব মিলিয়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন অনেক ভালো।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা