kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

আইনের প্রতিবাদে পরিবহন ধর্মঘট

তাণ্ডব চালিয়ে রেহাই মেলায় বেপরোয়া শ্রমিক নেতারা

► গাবতলীতে হামলায় পাঁচ মামলার চারটির তদন্ত হিমাগারে
► হত্যা মামলায় আসামি শনাক্ত হয়নি জানিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন
► পরিবহন শ্রমিকদের উসকানি দিচ্ছেন নেতারা

এস এম আজাদ   

২০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



তাণ্ডব চালিয়ে রেহাই মেলায় বেপরোয়া শ্রমিক নেতারা

সড়ক দুর্ঘটনায় চলচ্চিত্র পরিচালক তারেক মাসুদ ও সাংবাদিক মিশুক মুনীরের মৃত্যুসহ দুটি ঘটনায় দায়ী বাসচালককে দণ্ড দিয়ে আদালতের রায়ের প্রতিবাদে ২০১৭ সালে ধর্মঘটের নামে রাজধানীর গাবতলীতে তাণ্ডব চালিয়েছিল পরিবহন শ্রমিকরা। সেই তাণ্ডবের শিকার হয়ে একজন নিহত হওয়া ছাড়াও আহত হয় শতাধিক।

গাবতলীর ওই ঘটনায় পাঁচটি মামলা হলেও গত আড়াই বছরে নাশকতার নেপথ্যে কারা তা বের করতে পারেনি পুলিশ। চারটি মামলার তদন্ত স্থবির হয়ে আছে।

হত্যা মামলাটির আসামি শনাক্ত হয়নি উল্লেখ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। অথচ ঘটনার পর সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ও গ্রেপ্তার সাত আসামির তথ্যে জানা যায়, বাংলাদেশ আন্ত জেলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি তাজুল ইসলাম তাজু, সাধারণ সম্পাদক আহম্মদ আলী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুস ছাত্তার ও বালুরঘাট ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সাদেক হোসেন তুফানসহ কিছু শ্রমিক নেতা এই নাশকতায় নেতৃত্ব দেন। নেপথ্যে ছিলেন পরিবহন খাতের শীর্ষস্থানীয় নেতারা। এসব শ্রমিক নেতা দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে ঘুরলেও গ্রেপ্তার হননি। এখন তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, তাজুল, তুফানসহ আসামি শ্রমিক নেতারা জামিনে আছেন।

এদিকে নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইনের প্রতিবাদে পরিবহন শ্রমিকরা এবার ধর্মঘট ডেকেছেন। প্রশাসন ও মানবাধিকার বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিবহন শ্রমিকদের ব্যবহার করে সুবিধা ভোগ করা নেতারা শ্রমিকদের আইন অমান্য করতে উসকানি দিচ্ছেন। পরিবহন খাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বারবার রেহাই পেয়ে যাওয়ায় এসব শ্রমিকনেতা বেপরোয়া। আদালতের রায়ের প্রতিবাদ করে গাবতলীতে নাশকতা চালানোর ঘটনায় সঠিক তদন্ত ও বিচার হলে সংশ্লিষ্টরা বর্তমানের এমন কর্মসূচি দেওয়ার সাহস পেতেন না।

সাভারে ট্রাকচাপা দিয়ে এক নারীকে হত্যার দায়ে ২০১৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকার এক আদালত ওই ট্রাকের চালক মীর হোসেনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এর আগে তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরসহ পাঁচজনের মৃত্যুর মামলায় বাসচালক জামির হোসেনের যাবজ্জীবন হয়। এসব ঘটনার প্রতিবাদে পরিবহন ধর্মঘটের নামে ২০১৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ও ১ মার্চ গাবতলীতে শ্রমিকরা তাণ্ডব চালান। এতে শাহীনুর নামে এক চালকের সহকারী নিহত হয়। এসব ঘটনায় দারুস সালাম থানায় হত্যা ও বিশেষ ক্ষমতা আইনেসহ পাঁচটি মামলা করা হয়। মামলাগুলোর এজাহারে ৭৯ জনের নাম উল্লেখসহ আড়াই হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।

শাহীনুর হত্যা মামলায় পুলিশ ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি আসামির নাম-ঠিকানা পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে আদালতে ফাইনাল রিপোর্ট দেয়। মামলাটির তদন্ত করেন দারুস সালাম থানার তৎকালীন এসআই মজিবুর রহমান। তিনি এখন মিরপুর মডেল থানায় কর্মরত। তিনি বলেন, ‘শাহীনুর খুনের ঘটনায় আসামি শনাক্ত করা যায়নি। নাম-ঠিকানাও পাওয়া যায়নি।’

দুটি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই যোবায়ের এবং একটি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান সম্প্রতি দারুস সালাল থানা থেকে বদলি হয়ে গেছেন। তদন্ত সম্পর্কে জানতে চাইলে দারুস সালাম থানার পরিদর্শক (তদন্ত) দুলাল হোসেন বলেন, ‘নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করে তদন্ত শুরু হয়েছে। এখনো চার্জশিট বা প্রতিবেদন দেওয়ার মতো অগ্রগতি হয়নি। এজাহারের আসামিরা জামিনে আছেন।’

তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ঘটনার পরই সাত শ্রমিককে গ্রেপ্তার শেষে রিমান্ডে নেওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা ঘটনায় জড়িত হিসাবে তাজুল, তুফানসহ কয়েকজন পরিবহন নেতার নাম বলেন। সভাস্থল থেকে জব্দ করা সিসি ক্যামেরার ফুটেজেও এসব আসামিকে নির্দেশনা দিতে দেখা গেছে।

দারুস সালাম থানার আগের পরিদর্শক (তদন্ত) ফারুকুল আলম (বর্তমানে কাফরুল থানায়) বলেন, ‘আমরা কিছু ফুটেজ থেকে হামলাকারীদের ছবি পেয়েছিলাম। এগুলো নিয়ে কাজ চলছিল।’

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আব্দুল কাইউম কালের কণ্ঠকে বলেন, তদন্ত ঠিকমতো হয় না বলেই পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে পারছে না সরকার। এখন কথা বলার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তাঁরা বেপরোয়া বলেই জনগণকে কষ্ট দিয়ে কর্মসূচি ডেকেছেন।’

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন বলেন, ‘আমাদের দেশে পরিবহন মালিক-শ্রমিক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। শ্রমিকরা মরলেও কিছু হয় না। কারণ তাঁদের দিয়ে মালিকের স্বার্থ রক্ষা করেন শ্রমিক নেতারা। দেশে বাজার নিয়ে এমন একটা পরিস্থিতির মধ্যে কার স্বার্থে তাঁরা ধর্মঘট ডাকলেন তা খতিয়ে দেখা দরকার।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা