kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

বড় দলগুলোতে ‘নির্বাচনী দ্বন্দ্ব’

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া   

২০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বড় দলগুলোতে ‘নির্বাচনী দ্বন্দ্ব’

ভোট মানেই উৎসব, হোক রাজনৈতিক দল আর আমজনতা। তবে সেই ভোটকে কেন্দ্র করে উৎসবের বদলে অন্তর্বিরোধ চাঙ্গা হয়ে ওঠে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজনৈতিক দলগুলোতে। বড় সব কটি দলেই বিরাজ করছে এই ‘নির্বাচনী দ্বন্দ্ব’। বিশেষত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে এই দ্বন্দ্ব সবচেয়ে বেশি।

জাতীয় সংসদসহ অন্যান্য নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের বিরোধিতা করায় জেলার চার নেতাকে অব্যাহতির দাবি জানিয়ে কেন্দ্রে চিঠি দিয়েছে জেলা আওয়ামী লীগ। এক ধাপ বেড়ে ওই চারজনের বহিষ্কারের দাবি করেছে সদর উপজেলা ও পৌর আওয়ামী লীগ। শুধু জেলা নয়, উপজেলা পর্যায়েও ক্ষমতাসীন দলটিতে অন্তর্বিরোধ রয়েছে। অপরদিকে অন্তঃকোন্দলে স্বস্তিতে নেই বিএনপিও। জেলা সদরসহ সর্বত্র নিষ্ক্রিয় হয়ে আছেন নেতাকর্মীরা। ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে অনেকের দল ছেড়ে যাওয়া।

আওয়ামী লীগ : মূলত সংসদ, জেলা পরিষদ, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরেই জেলা আওয়ামী লীগে নানা মাত্রার দ্বন্দ্ব চলছে। এই দ্বন্দ্বের কারণে জেলা, উপজেলা ও ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা পরাজিত হন। নির্বাচন-পরবর্তী এই দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসে।

জেলার আশুগঞ্জ আওয়ামী লীগ আহ্বায়ক মো. ছফিউল্লাহ ও যুগ্ম আহ্বায়ক হানিফ মুন্সীকেন্দ্রিক বিভক্তি দীর্ঘদিনের। এখন বিরোধ ছফিউল্লাহর সঙ্গে আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক আবু নাসের পক্ষের। উপজেলা সম্মেলন ঘিরে ছফিউল্লাহপন্থীরা কমিটি গঠনের কাজ শুরু করলেও মেয়াদ থাকায় এর বিরোধিতা করছেন আবু নাসেরের অনুসারীরা। ইউনিয়ন পর্যায়ে সম্মেলনের সময় পাল্টা সমাবেশের ঘটনাও ঘটেছে আশুগঞ্জে। দলীয় বিরোধের কারণে সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীই দিতে পারেনি।

নবীনগর উপজেলা আওয়ামী লীগে বর্তমান এমপি এবাদুল করিম বুলবুল ও সাবেক এমপি ফয়জুর রহমান বাদলের মধ্যে বিভক্তি রয়েছে। গত পৌরসভা নির্বাচনে দল মনোনীত প্রার্থী জয়লাভ করলেও আওয়ামী লীগ ঘরানার আরো তিন প্রার্থী মেয়র পদে লড়েছেন। 

নাসিরনগরে উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি রাফিউদ্দিন আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক এ টি এম মনিরুজ্জামানের পক্ষে ভাগ হয়ে আছেন নেতাকর্মীরা।

গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তৎকালীন চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামানকে বাদ দিয়ে রাফিউদ্দিনকে দলের মনোনয়ন দেওয়া হয়। বিদ্রোহী প্রার্থী মনিরুজ্জামানের সঙ্গে লড়ে ভোটে জয়ী হয়ে আসা রাফিউদ্দিন আবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের সংসদ সদস্য বি এম ফরহাদ হোসেন সংগ্রামের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত।

আখাউড়া ও কসবায় আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটি রয়েছে। দুই উপজেলায়ই সম্মেলনকেন্দ্রিক মতবিরোধ রয়েছে। তবে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের নেতৃত্ব ও নির্দেশনা মেনে চলতে নেতাকর্মীরা বদ্ধপরিকর।

বিজয়নগরে এবারের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী তানবীর ভূঁইয়া হেরে যান বিদ্রোহী প্রার্থী নাছিমা মুকাই আলীর কাছে। বাঞ্ছারামপুর উপজেলা আওয়ামী লীগে পদ ও সুবিধাবঞ্চিত অনেকের মাঝে ক্ষোভ থাকলেও প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কেউ কিছু বলেন না। সরাইল আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনে রয়েছে বিরোধ। এখানে দীর্ঘদিনের বিরোধ এখনো চলমান।

তবে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল-মামুন সরকারের মতে, দল এখন সংগঠিত। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকেন্দ্রিক দলে যেসব ঝামেলা সৃষ্টি হয়েছিল সেগুলো সমাধান করা হয়েছে।

বিএনপি : জেলা বিএনপিতে কোন্দল প্রকাশ্যে না হলেও ভেতরে ভেতরে জ্বালা রয়েছে। পাঁচবারের সংসদ সদস্য হারুন-আল রশিদ সংসদ নির্বাচন থেকে সরে আসার পর থেকেই দলে নির্বাচনকেন্দ্রিক বিরোধ চোখে পড়ে। স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন নিয়েও দলে বিরোধ রয়েছে।

বিএনপি সম্প্রতি বেশি করে আলোচনায় আসে সরাইল উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা ও পরবর্তী সময়ে বাতিল করা নিয়ে। এ নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়।

এদিকে পৌরসভা নির্বাচন ঘিরে নবীনগর উপজেলা বিএনপির বিরোধ বেশ স্পষ্ট ছিল। ১৪ অক্টোবর হয়ে যাওয়া নির্বাচনে বিএনপি থেকে পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাজি মো. শাহবুদ্দিনকে মেয়র পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়। তবে নবীনগর পৌরসভার প্রথম মেয়র উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাঈনউদ্দিন মঈনুও প্রার্থী হন। এ ছাড়া প্রার্থী হন সাবেক পৌর প্রশাসক মলাই মিয়া ও ফারুক আহমেদ।

বিরোধ চাঙ্গা আখাউড়া উপজেলা বিএনপিতেও। সংসদ নির্বাচনে বেশ কয়েকজন প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া নিয়ে দলের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। এসব বিষয়ে উপজেলা বিএনপি সভাপতি মোসলেম উদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক আবুল মুনসুর মিশন দুই মেরুতে অবস্থান করছেন।

কোন্দল রয়েছে আশুগঞ্জেও। উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু আসিফ আহমেদ ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেনে বিভক্ত দল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুস সাত্তারের পক্ষে একটি ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার পক্ষে আরেক পক্ষ সক্রিয়।

বিজয়নগর উপজেলা বিএনপিতে কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ বেশ বড় আকার ধারণ করে। বানানো হয় ‘বিএনপি রক্ষা কমিটি’। বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় দলের কার্যক্রমে রয়েছে শিথিল ভাব। কসবায় দলীয় কার্যক্রম তেমন একটা চোখে পড়ে না। এই দুই উপজেলায়ও নির্বাচনকেন্দ্রিক বিরোধ রয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপি সভাপতি হাফিজুর রহমান মোল্লা কচি অবশ্য দলে অন্তর্দ্বন্দ্বের বিষয়টি স্বীকার করতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘দলীয় কার্যক্রম চালাতে গিয়ে আমাদের নানামুখী বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। তার পরও আমাদের সাংগঠনিক অবস্থা অনেক ভালো। দলের মধ্যে কোনো ধরনের বিরোধ নেই।’

প্রধান দুই রাজনৈতিক সংগঠনের বাইরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জাতীয় পার্টির তেমন সাংগঠনিক ভিত নেই। জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে দলের একমাত্র আসনটি (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২) হাতছাড়া হওয়ায় সংগঠনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে তেমন কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রমও নেই।

জেলায় জামায়াতে ইসলামীর ভেতরগত কার্যক্রম এখনো বিদ্যমান। পুলিশি তৎপরতার কারণে তারা প্রকাশ্যে আসতে পারছে না।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী জেলায় জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়ে না।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা