kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

দখল চাঁদাবাজি মাদকে বিপুল বিত্ত মিনার

হায়দার আলী   

১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



দখল চাঁদাবাজি মাদকে বিপুল বিত্ত মিনার

রূপসার বাগমারা ও জাবুসা বিলের পানি নিষ্কাশনের দুটি খাল দখল করে মৎস্য ঘের, নদীর চর দখল করে একাধিক ডকইয়ার্ড, সরকারি জমি দখল করে মাছের ডিপো, মৎস্য শিল্পাঞ্চলের কম্পানি মালিক ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি, অস্ত্র-মাদকের কারবার করে বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক বনে গেছেন মিনা কামাল।

রূপসা নদীর পূর্ব পারে চররূপসায় তাঁর কিছু জমি কেনা থাকলেও প্রায় সাড়ে চার বিঘা জমির ওপর চান-তারা ডকইয়ার্ডটি জোর করে দখলে নিয়েছেন মিনা কামাল। ডকইয়ার্ডটির প্রকৃত মালিক ছিলেন বাবলা শেখ ও তাঁর আত্মীয়রা। সেই বাবলা শেখের ছেলে রুহুল আমিন শেখ বর্তমানে মিনা কামালের অধীনে একজন সামান্য কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন।

একই নদীর জাবুসা এলাকায় ইউনিক মাছ  কম্পানির সামনে নদীর চরের প্রায় তিন বিঘা জমি দখল করে স্ত্রীর নামে আসমা ডকইয়ার্ড বানিয়েছেন মিনা কামাল। বাগমারা এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নদীর জমি দখল করে শুধু ডকইয়ার্ডই বানায়নি, অন্যের ডকইয়ার্ড দখল করেও মালিক বনে গেছেন মিনা কামাল। তার রাজ্যে সবাই অসহায়। প্রশাসনও ভয়ে কিছু বলতে পারে না।

মর্ডান সি ফুডের সামনে রেলওয়ের জমি দখল করে নিজের ছেলের নামে মাছের ডিপো জুয়েল ফিস মার্কেট, পাশের লক্ষ্মীপুর সি ফুড লিমিটেডের নামে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের জমি দখল করে ছেলের নামে আরেকটি ফিস মার্কেট নির্মাণ করেছেন মিনা কামাল। প্রশাসন বাধা দেওয়ার সাহস পায়নি।

রূপসা চিংড়ি বণিক সমিতির সভাপতি আব্দুল মান্নান শেখ বলেন, ‘দেখুন মিনা কামালের ভালো দিকও আছে, খারাপ দিকও আছে। ইয়াসিন হত্যাসহ কয়েকটি ঘটনায় তাঁর নাম আছে। আর চাঁদাবাজির কথা আমি কী বলব! আপনারা আমাদের চেয়ে বেশি জানেন। দয়া করে এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলুন। আমি রাজনীতি করি, এ বিষয়ে এর বেশি কিছু বলতে চাইছি না।’

জিম্মিদশায় মাছ কম্পানিগুলো : রূপসা উপজেলার ২৫টি মাছ কম্পানি এবং ৫০টির বেশি মাছ ডিপো ঘিরে মিনা কামালের চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য। বিশেষ করে হিমায়িত চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ করে ওজন বাড়িয়ে কম্পানিগুলোকে কিনতে বাধ্য করেন মিনা কামাল। এ ধরনের মাছ কিনতে অস্বীকার করলে কম্পানি মালিক ও কর্মচারীদের নানা ধরনের হুমকি এবং মারধর করা হয়। একই সঙ্গে কম গ্রেডের মাছ বেশি গ্রেডে কিনতে বাধ্য করা হয় কম্পানিগুলোকে। মিনা কামালের ডিপোতে বাকিতে মাছ বিক্রি করতে বাধ্য করা হয় ব্যবসায়ীদের। আবার বিক্রি করা মাছের দাম না পেয়ে শতাধিক ব্যবসায়ী পথে বসেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

মাছ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এরশাদ শিকদারের চেয়ে ভয়ংকর এই মিনা কামাল। তাঁর নির্দেশে চলে রূপসা এলাকা। দুই শতাধিক মানুষ নির্যাতনের শিকার হলেও কেউ বিচার পায়নি। প্রতিদিন কোনো না কোনোভাবে মিনা কামালের সন্ত্রাসী বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন মাছ ব্যবসায়ীরা।

নিজের দোকান ঘরের জমি দখলের প্রতিবাদ করায় চিংড়ি ব্যবসায়ী ইসরাইল হোসেনকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে মিনা কামাল ও তাঁর সন্ত্রাসী বাহিনী। ওই সময় বাসস্ট্যান্ড পুলিশ ফাঁড়ির একজন এসআই প্রতিবাদ করতে গেলে তাঁকেও লাঞ্ছিত করা হয়।

সব দলের সঙ্গে সখ্য : মিনা কামালের বড় ভাই মহিউদ্দিন শেখ ইউনিয়ন বিএনপির নেতা। বিএনপি আমলে রূপসা-বাগেরহাট বাস-মিনিবাস মালিক সমিতি দখল করে মালিকদের কোটি কোটি টাকা আত্মসাত করার অভিযোগ আছে মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে। সাধারণ মানুষের জমি দখলের পাশাপাশি নিজের স্বজনদের জমি দখলের অভিযোগে বহিষ্কারও হয়েছিলেন মহিউদ্দিন।

মিনা কামালের ছোট ভাই মাসুম শ্রমিকদলের নেতা ও একাধিক মামলার আসামি। আরেক ভাই মাজারুল রূপসার রামনগরের একটি মাছ কম্পানির পাহারায় থাকা আনসারদের আটটি রাইফেল লুট মামলার আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার হন। আর মিনা কামাল ক্ষমতাসীন দলের কোনো পদে না থাকলেও নিজেকে পরিচয় দেন যুবলীগের নেতা হিসেবে।

আওয়ামী লীগ-বিএনপি যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, মিনা কামাল ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকেন সব সময়। জেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার নাম ভাঙিয়ে একের পর এক অপকর্ম করে যাচ্ছেন মিনা কামাল। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নিজেকে যুবলীগ নেতা দাবি করে ২০১১ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে সন্ত্রাসী তালিকা থেকে নিজের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন করেছিলেন মিনা কামাল। খুলনার প্রভাবশালী কয়েকজন নেতার সুপারিশসহ ওই আবেদনপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল মন্ত্রণালয়ে।

কোটি টাকার বাড়ি-গাড়ি : রূপসার বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন সড়কে মর্ডান সি ফুডের উত্তর পাশে রেলওয়ের বিশাল জমি দখল করে দুই কোটি টাকা ব্যয়ে দ্বিতল ভবন নির্মাণ করে মাছের ডিপো বানিয়েছেন মিনা কামাল। রূপসা নদীর চর দখল করে বানিয়েছেন দুটি ডকইয়ার্ড। কর্তৃপক্ষের অনুমতি, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে এই ডকইয়ার্ড। ১০ বছর আগেও মিনা কামালের পারিবারিক বসতভিটার ওপর ছিল তিন কক্ষের একটি ঘর। এখন দুই কোটি টাকা ব্যয়ে মাছের ডিপো, কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি আলিশান ভবন নির্মাণ করেছেন মিনা কামাল। কোটি টাকা দামের দুটি বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করেন তিনি। বাহিনীর সদস্যদের দেওয়া হয়েছে অর্ধশত মোটরসাইকেল। এই সন্ত্রাসী বাহিনী মিনা কামালের চলাচলের পথে আগে-পিছে সাইরেন বাজিয়ে তাঁকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যায়।

খাল-বিল দখলে সর্বস্বান্ত সাধারণ কৃষক : সমবায়ের ভিত্তিতে মৎস্য ঘের করার কথা বলে রূপসা উপজেলার বাগমারা ও জাবুসা বিলের সরকারি তিনটি বিশাল খাল (মদনার খাল, শুকুরমারী খাল ও গুপিয়ার খাল) সমবায় সমিতির নামে ইজারা নেওয়া হয়। কিন্তু অস্ত্রের মুখে খাল তিনটি দখল করে নেয় মিনা কামাল ও তাঁর সন্ত্রাসী বাহিনী। এক যুগ ধরে খাল তিনটির নিয়ন্ত্রণ মিনা কামালের হাতে থাকায় সাধারণ কৃষকরা এখন নিঃস্ব।

বিলের জমির মালিক এমন কয়েকজন কৃষক জানান, মিনা কামাল স্লুুইচ গেট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অসময়ে নদীর লবণ পানি বিলে উঠিয়ে জমির ফসল, ছোট ছোট পকেট মৎস্য ঘের ও পুকুরগুলো ডুবিয়ে দেন। পরে সুবিধামতো পানি নদীতে নামিয়ে মাছগুলো খালে নিয়ে নিঃস্ব করেন সাধারণ কৃষকদের। এমনকি বাগমারা ও জাবুসা বিলের কৃষকদের চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় পানিও দেওয়া হয় না।

এ ছাড়া সওজ অধিদপ্তরের বিশাল দিঘি (সিঅ্যান্ডবি বড় পুকুর) দখল করে মাছ চাষ করছেন মিনা কামাল। ইউপি চেয়ারম্যান থাকাকালীন সিঅ্যান্ডবির পুকুরটি দখলে নেন তিনি। সাধারণ কৃষকদের মিঠা পানির চাষাবাদের জন্য এলজিইডি থেকে প্রায় শত কোটি টাকা ব্যয়ে রূপসার বাগমারা ও জাবুসা বিলের খননকাজও হয়। বিল ব্যবস্থাপনার একটি কমিটিও আছে।

জাবুসা বিল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি সাবেক চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান। কিন্তু মিনা কামাল ও তাঁর বাহিনীর ভয়ে ব্যবস্থাপনা কমিটির কেউ মুখ খুলছে না।

রূপসা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আলী আকবর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মিনা কামালের বিরুদ্ধে মামলার অভাব নেই। অনেকেই নির্যাতনের শিকার হয়েছে। কিন্তু তাঁর বিষয়ে কথা বললে তো আমাদের ওপর বিপদ নেমে আসবে। আপনারা খোঁজ নিয়ে দেখুন, এলাকার সাধারণ মানুষ কী বলে।

ইয়াছিন হত্যা মামলার তদারকি কর্মকর্তা ছিলেন খুলনা জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পরিদর্শক তরফদার মো. রোকনুজ্জামান রোকন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইয়াছিন হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন মিনা কামাল। তাঁর বিরুদ্ধে ইয়াছিন হত্যা মামলার চার্জশিটও দেওয়া হয়েছিল। শুধু ইয়াছিনই নয়, ১২ থেকে ১৫টি হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি মিনা কামাল। রূপসা এলাকার ভয়ংকর এক সন্ত্রাসী সে, তাঁর সঙ্গে ২০ থেকে ২৫ জনের একটি সন্ত্রাসী বাহিনী রয়েছে।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মোস্তফা কামাল ওরফে মিনা কামাল গত রবিবার ফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বেশির ভাগই মিথ্যা মামলা। ডক ইয়ার্ডের মালিক আমি, কোনো কিছু ঘটলেই আমার নামে মামলা হয়, এখন আমি কী করব? সবই মিথ্যা অভিযোগে আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়।’ নদীর জমি দখল করে ডক ইয়ার্ড বানানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নদীর জমি তো বেশির ভাগই দখলে থাকে। শুধু আমি নই, সবার দখলেই আছে। আমার বাবার ৫০০ বিঘা জমি আছে।’

আওয়ামী লীগের নেত্রী রেখা বেগমকে পেটানোর অভিযোগ প্রসঙ্গে মিনা কামাল বলেন, ‘হ্যাঁ আমি মারছি, উপরের নির্দেশ পেয়েই আমি মারছি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা