kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

উৎপাদন বাড়ায় খাওয়া কমায় চাল উদ্বৃত্ত

তৌফিক মারুফ   

১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



উৎপাদন বাড়ায় খাওয়া কমায় চাল উদ্বৃত্ত

দেশে মানুষের ভাত খাওয়ার প্রবণতা কমেছে। কমছে চালের চাহিদা। অন্যদিকে বাড়ছে উৎপাদন। ফলে চাল থেকে যাচ্ছে উদ্বৃত্ত। এই চাল দিয়ে কী হবে, তা নিয়ে ভাবনায় পড়েছে খাদ্য অধিদপ্তর। পরিকল্পনা করা হচ্ছে প্রক্রিয়াজাত খাবার তৈরিতে ব্যবহারের জন্য।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে গত অর্থবছরে (গত বছরের জুলাই থেকে-চলতি বছরের জুন পর্যন্ত) দেশে মোট চার কোটি ৪৪ লাখ টন দানাদার খাদ্য উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে চাল তিন কোটি ৮৬ লাখ টন, গম ১১ লাখ টন ও ভুট্টা ৪৭ লাখ টন। এ ছাড়া চলতি অর্থবছরে (২০১৯-২০) এরই মধ্যে ৩০ লাখ টন আউশ চাল উৎপাদিত হয়েছে, এক কোটি ৫৪ লাখ টন আমন চাল সংগ্রহের কাজ শুরু হয়েছে। এর পরই আবার আসবে দেশের সর্বোচ্চ উৎপাদন হওয়া দানাদার খাদ্যশস্য হিসেবে দুই কোটি চার লাখ টন বোরো চাল। যার মধ্য থেকে কয়েক বছর ধরেই উদ্বৃত্ত থেকে যাচ্ছে চাল, গত বছরও প্রায় ২০ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থেকে যায় বলে কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন সরকারের কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরিচালক ড. মো. নুরুল ইসলাম।

খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম গতকাল রবিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একদিকে মানুষের ভাত খাওয়ার প্রবণতা কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে উৎপাদন বাড়ছে। সব মিলিয়ে চাল বেশি হয়ে ন যাচ্ছে। চাল বা চালের দাম নিয়ে যখন কোনো অস্থিরতার কথা শুনি, তখন এর কারণ আমরা ভেবে পাই না। বরং আমরা তো ভাবনায় আছি উদ্বৃত্ত চাল কিভাবে ব্যবহার করব, তা নিয়ে। এই আজও (রবিবার) ১৫ লাখ টন চাল মজুদ আছে আমাদের কাছে। এখন আবার নতুন চাল উঠছে, সেখান থেকেও তো উদ্বৃত্ত হবে। তখন এত উদ্বৃত্ত চাল রাখার জায়গা কোথায় পাব, তা নিয়েই টেনশনে আছি।’

এত চাল উদ্বৃত্ত থাকা সত্ত্বেও আমদানির প্রশ্ন ওঠে কেন জানতে চাইলে মহাপরিচালক বলেন, ‘সেটা ভিন্ন বিষয়। গত বছর কোনো চাল আমদানি করা হয়নি। এর আগের বছর বন্যার প্রভাবে কিছু পরিমাণ চাল আনা হয় প্রাইভেট বা বাণিজ্যিকভাবে অতিরিক্ত সর্তকতা হিসেবে। কিন্তু তখনো আমাদের চালের কোনো ঘাটতি ছিল না। এখন আমরা পরিকল্পনা করছি উদ্বৃত্ত চাল কিভাবে অন্য কাজে লাগানো যায়। বিশেষ করে অন্য খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।’

খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, ভাত খাওয়ার প্রবণতা কমার বিপরীতে সবজি, মাছ ও ডিম খাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। মাছের চাহিদা তো অনেকটাই বেড়েছে।

অন্য গবেষকরাও জানান, ভাত থেকে ক্রমেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে সচেতন মানুষ। বিপরীতে মুরগির মাংস, গম ও ভুট্টার চাহিদাও বেড়েছে। গরুর মাংস খাওয়ার প্রবণতাও কমেছে আগের তুলনায়। এই পরিবর্তনকে স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিক থেকে খুবই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন খাদ্য, পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্যবিদরা। যদিও তেলের ব্যবহার বেড়েছে বলে তথ্যে উঠে এসেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট সূত্র থেকে জানা গেছে, চলতি বছরে এ ইনস্টিটিউটের আওতায় একটি গবেষণাকাজ করা হয়েছে খাদ্যগ্রহণ প্রবণতার ওপর। কাজটি শেষ হলেও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, প্রস্তুতি চলছে। এ গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রটোকল অনুসারে একজন মানুষের ক্যালরি গ্রহণের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫৫-৬৫ শতাংশ নেওয়া প্রয়োজন দানাদার শস্য থেকে। বাকিটা আসে অন্য খাদ্য থেকে। দানাদার শস্যের ভেতর চাল ছাড়া গম-ভুট্টাসহ আরো কিছু শস্য রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ভাতের প্রবণতা কমেছে, বেড়েছে অন্যগুলোর চাহিদা। সবজি খাওয়া বাড়লেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেকের কম। জনপ্রতি দানাদার খাদ্য নেয় প্রতিদিন ৪০৫ গ্রাম আর সবজি নেয় মাত্র ১৬৮ গ্রাম। আগে দানাদার আরো বেশি নিত। আর সবজি গ্রহণ আরো কম ছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ গবেষণার সঙ্গে অনেকটাই মিল পাওয়া যায় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও পর্যবেক্ষণ ইউনিটের পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট ২০১৯-এর। ওই প্রতিবেদনে ১৯৯৫-৯৬ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়। এতে দেখা গেছে ১৯৯৫-৯৬ সালে দেশের প্রতিজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ গড়ে দৈনিক ৪৬৪ গ্রাম ভাত খেত। ১৯১৬ সালে সেটা নেমে আসে ৩৬৭ গ্রামে। ১৯৯৫-৯৬ সালে প্রতিজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ গড়ে দৈনিক ৪৩ দশমিক ৮ গ্রাম মাছ খেত। ১৯১৬ সালে সেটা উঠে এসেছে ৬২ দশমিক ৬ গ্রামে। ডিম খাওয়ার প্রবণতা ১৯৯৫-৯৬ সালে ছিল জনপ্রতি মাত্র ৩ দশমিক ২ গ্রাম, ১৯১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৬ গ্রামে। ওই তথ্যানুসারে জাতীয়ভাবে আমাদের দেশের মানুষ ৬৫ শতাংশ ক্যালরি নেয় ভাত খেয়ে। গ্রামে এই হার আগে প্রায় শত ভাগ থাকলেও এখন তা নেমে এসেছে ৭০ শতাংশে, আর শহরে আরো কমে তা এসেছে ৫৯ শতাংশে। যা মাত্র কয়েক বছর আগেও ছিল ৮০ শতাংশের ওপরে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. নাজমা শাহীন কালের কণ্ঠকে বলেন, মানুষ এখন অনেক বেশি স্বাস্থ্যসচেতন হয়েছে। শহরে অনেকেই মাত্র এক বেলা ভাত খায়, বাকি দুই বেলা রুটি বা অন্য খাবার। রুটির ভেতরও এখন বাজারে যে সাদা আটা পাওয়া যায় এর সবটাই শুধু গম নয়, ভুট্টারও মিশ্রণ রয়েছে। অন্যদিকে সবজি ও ফল খাওয়ার প্রবণতা বাড়লেও এখনো দিনে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ৪০০ গ্রামের চাহিদা পূরণ হচ্ছে না, হচ্ছে মাত্র ২০০ গ্রামের মতো। অর্থাৎ ২০০ গ্রাম সবজি-ফলের ঘাটতি রয়েই যাচ্ছে।

দৈনিক ক্যালরি নিয়ে আমাদের দেশে হিসাবে গরমিলের কথা জানিয়ে এ পুষ্টি বিশেষজ্ঞ বলেন, সরকারি হিসাবে দুই হাজার ৪৩০ গ্রাম ক্যালরির প্রয়োজনের কথা বলা হয়। ওই হিসাবে প্রায় ২০০ গ্রাম ঘাটতির তথ্যও অনেক সময় দেখি। কিন্তু এ তথ্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ ক্যালরির গড় হিসাব করা যায় না। বয়স, ওজন, বিএমআই, খাদ্যাভ্যাসসহ আরো অনেক কিছুর ওপর ক্যালরি গ্রহণের মাত্রা নির্ভর করে।

তেলের ব্যবহার সম্পর্কে ড. নাজমা শাহীন বলেন, ‘আমাদের দেশে আগের চেয়ে তেল খাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে দেখতে পেয়েছি, যাদের তেল কম খাওয়া দরকার তারা খাচ্ছে বেশি, আর যাদের বেশি খাওয়া দরকার তারা খাচ্ছে কম। এই প্রবণতা বিপজ্জনক। কারণ তেলের কারণেই অনেক ধরনের জটিল রোগের জন্ম হচ্ছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা