kalerkantho

মঙ্গলবার । ৭ আশ্বিন ১৪২৭ । ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৪ সফর ১৪৪২

ফোক ফেস্ট

প্রশান্তির পরশ ছড়িয়ে পর্দা নামল উৎসবের

নওশাদ জামিল   

১৭ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রশান্তির পরশ ছড়িয়ে পর্দা নামল উৎসবের

রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে গতকাল ফোক ফেস্টের শেষ দিনে আসর মাতায় পাকিস্তানের সুফি ঘরানার ব্যান্ডদল জুনুন। ছবি : তারেক আজিজ নিশক

লোকগান ও নৃত্যের মায়াজাল ছড়ানো বিশাল আয়োজনে আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উৎসবের শেষ দিন ছিল গতকাল শনিবার। সমাপনী দিন যেন পরিণত হয় জনারণ্যে। স্টেডিয়ামের এক কোণে বিশাল মঞ্চ। আর সামনে মগ্ন দর্শক-শ্রোতা। মাঠের চারদিক পরিপূর্ণ। গ্যালারিতেও মানুষ আর মানুষ। মরমি সুর ও বাণীতে আপ্লুত হয় অসংখ্য মানুষ।

এ সুরের মূর্ছনায় কেটে গেল তিনটি রাত। যান ও জনজটের শহর ঢাকায় বয়ে গেল প্রশান্তির পরশ। লোকজ গানের পথরেখায় নাগরিক জীবন খুঁজে ফিরেছে মাটির ঘ্রাণ। নিজ দেশের মাঠ-ঘাটে ছড়িয়ে থেকে পল্লী গানের সঙ্গে শোনা হয়েছে ভিন দেশের বিচিত্র আঙ্গিকের লোকসংগীত। প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা করে তিন দিনে ১৮ ঘণ্টার সেই সুরভ্রমণ শেষ হলো গতকাল। তিন দিনে শহরের লক্ষাধিক শ্রোতা উপভোগ করেছে দেশ-বিদেশের শিল্পীতে সজ্জিত এই লোকসংগীত আসর। প্রশান্তির পরশ ছড়িয়ে পর্দা নামল সংগীতপ্রেমীদের উৎসবের।

মালেক কাওয়ালের কাওয়ালি গানের মাধ্যমে সূচনা হওয়া আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উৎসরের সমাপনী আসর মাতিয়েছে পাকিস্তানের সুফি ঘরানার ব্যান্ডদল জুনুুন। উপমহাদেশের বিখ্যাত লোকগানের দলটির পরিবেশনা ছিল এ দিনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। তাদের গানে আলোড়িত হয়েছে শহরের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসা সুরপিপাসুরা। সুন্দরের প্রতিচ্ছবিময় ফোক ফেস্টের তৃতীয় দিনে শ্রোতার হৃদয় রাঙিয়েছে রাশিয়ার নিও ফোক ঘরানার ব্যান্ডদল সাত্তুমা। চড়া কণ্ঠের আশ্রয়ে লালনের গানে ভালোলাগার অনুভব ছড়িয়েছেন দেশের শিল্পী চন্দনা মজুমদার। ছয় দেশের শতাধিক শিল্পীর অংশগ্রহণে সজ্জিত উৎসবের যবনিকা টেনেছেন বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও রাশিয়ার শিল্পীরা।   

সমাপনী রাতের উৎসবের সূচনা হয় আধ্যাত্মবাদের বার্তাবহ  কাওয়ালি গানের আশ্রয়ে। প্রথম পরিবেশনা নিয়ে মঞ্চে আসেন বাংলা লোকগানের জনপ্রিয় শিল্পী আব্দুল মালেক কাওয়ালি। তাঁর গানের কথায় উচ্চারিত হয় স্রষ্টার গুণগান। মহীন কাওয়ালের এই শিষ্যর প্রথম গানের শিরোনাম ছিল ‘ইশকে নবী দিল মে’। এরপর শিল্পী একে একে গেয়ে শোনান ‘গাওসুলে আজম মাইজভাণ্ডারি’, ‘ইশকে আজম রাসুলে আজম’ ‘খাজাজি ম্যায় হু’ ও ‘বাবা মওলানা মওলানা মওলানা’।

দ্বিতীয় পরিবেশনায় শ্রোতারা শুনেছে রাশিয়ার লোকসংগীত। মিষ্টি সুরের হৃদয়গ্রাহী কয়েকটি পরিবেশনা উপস্থাপন করে দেশটির কারেলিয়া অঞ্চলের সর্বোচ্চ জনপ্রিয় ব্যান্ডদল সাত্তুমা। রাশিয়ার মেঠোপথের গন্ধমাখা গানের সঙ্গে দলটির পরিবেশিত যন্ত্রসংগীতও ছিল দারুণ উপভোগ্য। ভাষার দূরত্বকে ছাপিয়ে সাত্তুমার মেলোডিনির্ভর গানগুলো স্পর্শ করেছে শ্রোতার অন্তর।  শ্রোতার ভালোলাগার সেই সুবাদে ঝড়ে পড়েছে কয়েক দফা করতালি। এই দলের কণ্ঠসংগীতে ছিলেন দিমিত্রি দেমিন। বাঁশিতে সুর ছড়িয়েছেন ভ্লাদিসলে দেমনি। বেহালা বাজিয়েছেন পারসুয়েভ। ড্রামে শব্দধ্বনি তুলেছেন জারফ্রেমভ। পারিবারিক এই ব্যান্ডটির যাত্রা শুরু ২০০৩ সালে। 

নিও ফোক ঘরানার গান নিয়ে হাজির হওয়া সাত্তুমা ট্যুর করেছে ইউরোপের নানা প্রান্তে। মঞ্চে নানা ধরনের ইন্সট্রুমেন্ট বাজিয়ে এক অদ্ভুত মূর্ছনায় দর্শককে আবিষ্ট করে রাখেন সাত্তুমার সদস্যরা। রাশিয়া, আমেরিকা, ফিনল্যান্ড, স্ক্যান্ডিনেভিয়া, এস্তোনিয়া এবং জার্মানির বিভিন্ন অঞ্চলে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে দলটি।  

রাশিয়ার লোকগানের সুর শেষে সংগীতানুরাগীরা শুনেছে দেশের লোকসংগীত। সমাপনী রাতে তৃতীয় পরিবেশনাটি উপস্থাপন করেছেন কুষ্টিয়ার গড়াই নদীর পারে জন্ম নেওয়া লালনসংগীত শিল্পী চন্দনা মজুমদার। মঞ্চে এসেই তিনি গাইলেন সাধক লালন সাঁইজির ‘জগত মুক্তিতে ভোলালেন সাঁই’। এরপর তিনি গান আরেকটি লালন সংগীত ‘ধন্য ধন্য বলি তারে’। দোতরা, ঢোলক আর বাঁশি—বাংলার লোকজ বাদ্যযন্ত্রের অপূর্ব ধুনে চন্দনার সুর কণ্ঠে তুলে নিলেন মাঠভর্তি দর্শক। লালনের এই গানের প্রতিটি কলিই যে তাদের জানা! সমস্বরে গেয়ে বাংলার লোকসংগীত এই সাধককে স্বাগত জানাল তারা। চন্দনা তখন বলেন, ‘আমি কিন্তু আপনাদের পছন্দের গানগুলো করছি, আপনাদের অনুরোধের গানই করছি।’ চন্দনা ধরলেন আরো একটি লালনসংগীত ‘সে কি চেনে মানুষ রতন’। আর্মি স্টেডিয়ামের গ্যালারির দর্শক তখন সব উঠে দাঁড়িয়েছে, ছন্দে-তালে তারাও কণ্ঠ মেলাল এ গানে। গীতিকবি বিজয় সরকারের ‘তুমি জানো নারে প্রিয়’ গানটি চন্দনা মজুমদার কণ্ঠে তুলতেই সুর জাগল স্টেডিয়ামের প্রতিটি কোণে। এরপর তিনি শোনান ফকির কালা শাহ্র ‘লোহারে বানাইল কাঞ্চা সোনা’। শেষে তিনি শোনান ‘মনপুরা’ সিনেমার ‘যাও পাখি বলো তারে’।

সব শেষে মঞ্চে আসে সমাপনী রাতের সবচেয়ে আকর্ষণ পাকিস্তানি সুফি ধারার ব্যান্ডদল জুনুন। নিজেদের জনপ্রিয় গানের আশ্রয়ে উপমহাদেশের সংগীতপ্রেমীদের কাছে উন্মাদনা সৃষ্টিকারী দলটি উচ্চ্ছ্বাসে ভাসিয়েছে ঢাকার গানপ্রেমীদের। দলটির সদস্যরা হলেন সালমান আহমাদ, নুসরাত হোসাইন, আলী আজমত ও ব্রেইন ও’কন্নেল। পাকিস্তানি এই ব্যান্ড দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে শ্রোতাদের মোহাবিষ্ট করে রেখেছে। ১৯৯৭ সালে নিজেদের চতুর্থ অ্যালবাম ‘আজাদি’ দিয়ে সারা উপমহাদেশে ঝড় তোলে জুনুন। অ্যালবামের প্রথম গান ‘সাইওনি’ পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ—এই তিন দেশের শ্রোতাদের কাছে পেয়েছে তুমুল জনপ্রিয়তা। বিশ্বব্যাপী জুনুনের ৩০ মিলিয়নেরও বেশি অ্যালবাম বিক্রি হয়েছে।

মেরিল নিবেদিত সান ফাউন্ডেশন আয়োজিত ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উৎসবের পঞ্চম আসরটি উৎসর্গ করা হয় বাংলা গানের ছয় বরেণ্য শিল্পীকে। তাঁরা হলেন সুবীর নন্দী, বারী সিদ্দিকী, শাহনাজ রহমতউল্লাহ, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, আইয়ুব বাচ্চু ও ফকির আবদুর রব শাহ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা