kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

কিছু চালকের দুর্নীতিতেও রেলপথে অরাজকতা

♦ ট্রেন না চালিয়েও মাইলেজ ভাতা, বিদেশে থেকেও চাকরি বহাল অনেকের
♦ ১১ মাসে ঢাকায় ৭৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র

পার্থ সারথি দাস   

১৭ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



কিছু চালকের দুর্নীতিতেও রেলপথে অরাজকতা

ট্রেনচালকের তীব্র সংকট থাকলেও কোনো কোনো ট্রেনচালক নিয়োগের পর থেকেই অফিস সহকারীর কাজ করছেন। ট্রেন না চালালেও মাইলেজ ভাতা নিচ্ছেন। কেউ ট্রেন না চালিয়ে কন্ট্রোল সেকশনে পাওয়ার কন্ট্রোলার হিসেবে কাজ করছেন। কেউ কেউ সৌদি আরবসহ বিদেশে অবস্থান করছেন। কাগজপত্রে তাঁরা অনুপস্থিত থাকছেন। কিন্তু তাঁদের চাকরি বহাল তবিয়তেই আছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের ঢাকা বিভাগের অধীন কমলাপুরের ঢাকা লোকোশেডের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে গতকাল সরেজমিনে গিয়েও দেখা গেছে, ট্রেনচালকরা দপ্তরে কাজ করছেন।

এদিকে শুধু ঢাকা বিভাগেই গত ১১ মাসে ৭৩ ট্রেনচালকের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা পড়েছে। অনুপস্থিতিসহ শৃঙ্খলা ভঙ্গ করায় তাঁদের মধ্যে কমপক্ষে ৫০ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বেশির ভাগের বছরের বেতন বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্ট স্থগিত করা হয়েছে। এটি শুধু ঢাকা বিভাগের চিত্র। আরো তিনটি রেল বিভাগেও এভাবে চালকদের অনিয়ম, দুর্নীতি চলছে।

সাইদুর রহমান (টিকিট নম্বর-২৫) ট্রেনের এ এল এম গ্রেড-১ (সহকারী লোকোমাস্টার) পদে নিযুক্ত হলেও তিনি ঢাকা লোকোশেডের বেতন ও ওভারটাইমসংক্রান্ত স্ট্যাবলিশমেন্ট মাইলেজ রানিং (ইএমআর) শাখায় প্রধান সহকারীর কাজ করছেন। ট্রেন পরিচালনার কাজ যেমন ট্রেন চালানো, লোকোশেডে ইঞ্জিন ঘোরানো, ফুয়েলিং করা, ট্রেন এক লাইন থেকে অন্য লাইনে নেওয়ার মতো কাজের জন্য তাঁর নিয়োগ হয়েছিল। তবে শুরু থেকেই তিনি ইএমআর শাখায় কাজ করছেন। যদিও কোনো ‘রানিং স্টাফ’ (চালক, সহাকারী চালক, গার্ড) দপ্তরের কাজে যুক্ত থাকতে পারেন না। তার ওপর সাইদুর আবার বাংলাদেশ রেলওয়ে রানিং স্টাফ ও শ্রমিক কর্মচারী সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং একই সংগঠনের ঢাকা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক।

সাইদুর ১৯৮৩ সালে শিক্ষানবিস হিসেবে চাকরিতে যোগ দিলেও একই পদে রয়েছেন ৩৬ বছর। জানা গেছে তিনি পদোন্নতি নিতে চান না। সহকর্মীরা অভিযোগ করেছেন, ইঞ্জিনের ফুট প্লেটে পা না রাখলেও অবৈধভাবে মাইলেজ ভাতা নিচ্ছেন সাইদুর।

ব্রিটিশ আমল থেকে চালকদের জন্য মূল বেতনের পাশাপাশি মাইলেজ ভাতা দেওয়ার বিধি চালু রয়েছে। এ হিসাবে ১০০ মাইল ট্রেন চালালে এক দিনের বেসিক বেতন প্রাপ্য হন চালকরা। আর লোকোশেডে দায়িত্বরত চালক-সহকারী চালকরা টিএমও এবং শানটিংয়ের কাজে আট ঘণ্টা ব্যয় করলে এক দিনের বেসিক বেতন প্রাপ্য হন। সাইদুর রহমান এ ধরনের কোনো কাজ না করেও নিয়মিত মাইলেজ ভাতা ওঠান। বছর ধরে অফিসে বসেই ওভারটাইমের মাইলেজ ভাতা তুলছেন তিনিসহ আরো অনেকে।

গতকাল শনিবার দুপুরে কমলাপুরের ঢাকা লোকোশেডে তাঁর দপ্তরে গেলে সাইদুর রহমানকে ফাইলপত্র নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। ট্রেন না চালিয়ে কেন অফিস সহকারীর কাজ করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রানিং স্টাফদের মাইলেজ তৈরি করা, বিল করাসহ বিভিন্ন কাজের চাপ বেশি। এ জন্য মঞ্জুরিকৃত চারটি পদের বিপরীতে জনবল কম রয়েছে। ফলে আমিও এখানে কাজের চাপ সামলাচ্ছি।’ তিনি জানান, দপ্তরে মাঝে-মধ্যে কাজ করতে হয় না, তখন ট্রেন পরিচালনার কাজ করেন। তাঁর মতে ‘দপ্তরে কাজ করলেও মাইলেজ ভাতা নেওয়া অপরাধ নয়। কারণ আমি কাজ করি। কাজ করেই ভাতা নেই।’

কন্ট্রোলার নেই অজুহাতে ঢাকা কন্ট্রোল সেকশনে পাওয়ার কন্ট্রোলার হিসেবে কাজ করছেন সহকারী লোকোমাস্টার বিকাশ চক্রবর্তী (এএলএম-১, টিকিট নং-৭৫), আবু আহমেদ মো. আব্দুল্লাহ (এসএলএম, টিকিট নং-১২৪), মো. জাকির হোসেন (এএলএম-১, টিকিট নং-৬২১), নাজমুল হাসান (টিকিট নং-১২৩)।

ট্রেনচালক শহীদুল ইসলাম একবার সৌদি আরবে রেলওয়ে কম্পানিতে দুই বছর কাজ করে এসেছেন। তারপর আবারও সৌদি আরব চলে যান। তবু তাঁর চাকরি বহাল আছে। গতকাল লোকোশেডসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে খোঁজ নিলে জানানো হয়, তিনি কমপক্ষে তিন মাস ধরে অনুপস্থিত আছেন। সবুজ হাসানও বিদেশে অবস্থান করছেন। সাইদুর রহমানের কাছে গতকাল জানতে চাইলে শহীদুল ও সবুজ অনুপস্থিত স্বীকার করে বলেন, ‘তাঁরা কোথায় আছে বলতে পারব না।’ অভিযোগ আছে, সাইদুর রহমান বিদেশে অবস্থানকারী ও অনুপস্থিত ট্রেনচালকদের কাগজপত্র ঘষামাজা করে ঠিকঠাক করে রাখেন।

জানা গেছে, সাইদুর রহমান অনুপস্থিত কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তালিকা তৈরি করা, তাঁদের শাস্তি কমাতে বা বাড়াতে প্রভাব বিস্তার করেন। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে নিয়মিত ট্রেনচালকরা মুখ খুলতে ভয় পান। তিনি স্ট্যান্ড রিলিজ, বদলিসহ নানা হুমকি দিয়ে থাকেন প্রতিবাদকারীদের। যুবলীগ ঢাকা দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক (বর্তমানে বহিষ্কৃত) খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া এবং রেলওয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আছে বলেও প্রচার চালিয়ে সহকর্মীদের ভয় দেখান তিনি। এ ব্যাপারে সাইদুর বলেন, কমপক্ষে পাঁচজন ট্রেনচালক তাঁর ও কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়ে আসছেন বছরের পর বছর। যাঁরা অভিযোগ দিচ্ছেন তাঁরা যড়যন্ত্রকারী ও রেলকে ধ্বংস করে দিচ্ছেন।

ঢাকা লোকোশেডে শেডম্যানের কাজ করছেন উপসহকারী প্রকৌশলীর বদলে সহকারী ট্রেনচালক রায়হান জামিল (টিকিট নম্বর-৬৪১), এ ছাড়া ঢাকা লোকোশেডে শেডম্যানের কাজ করছেন সহকারী লোকোমাস্টার গ্রেড-২ সিরাজুল ইসলাম ও সাব-লোকোমাস্টার নজরুল ইসলাম সরকার। এদিকে সহকারী লোকোমাস্টার গ্রেড-২ ইফতেখারুল ইসলাম অফিস সহকারীর কাজ করছেন বিভাগীয় যন্ত্র প্রকৌশল (লোকো) দপ্তরে।

ইএমআর শাখায় কর্মরত অপর এক ট্রেনচালক বলেন, ‘অফিস থেকে যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাই পালন করছি।’ ঢাকা কন্ট্রোল সেকশনে পাওয়ার কন্ট্রোলার হিসেবে কর্মরত একজন ট্রেনচালক বলেন, ‘ট্রেনের সিগন্যালিং কন্ট্রোল করছি। এটাও কাজ।’

মো. সাইদুর রহমানের সঙ্গে ঢাকা লোকোশেডের ইএমআর শাখায় কাজ করছেন সহকারী লোকোমাস্টার গ্রেড-২ মো. শরীফ হোসেন (টিকিট নম্বর-৬৫১)। তিনিও ট্রেন পরিচালনায় সরাসরি যুক্ত না থেকে দপ্তরের কাজ করছেন। কিন্তু মাইলেজ ভাতা নিচ্ছেন। গতকাল তাঁকেও দপ্তরে কর্মরত অবস্থায় পাওয়া গেছে। শরীফকে দেখিয়ে সাইদুর বলেন, ছেলেটা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করছে।

এএলএম গ্রেড-২ পদে কর্মরত মো. ইফতেখার ডিএমই লোকো দপ্তরে করণিকের কাজ করেও মাইলেজ ভাতা নিচ্ছেন। একই পদে নিয়োগ পাওয়া মো. বরকত হোসেন ডিএমই লোকো দপ্তরের গাড়ি চালান। গাড়ি চালান কিন্তু তাঁকেও দেওয়া হয় ট্রেন পরিচালনায় যুক্ত থাকার মাইলেজ ভাতা।

ঢাকা লোকোশেডের ইএমআর শাখা সূত্রে জানা গেছে, গত ১১ মাসে ঢাকা বিভাগে কমপক্ষে ৭৩ জন ট্রেনচালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়েছে। তার মধ্যে ৫০ জনের শাস্তি হয়েছে। তাঁদের অপরাধের মধ্যে আছে অনুপস্থিতি, বিলম্বে ট্রেন চালানো, অবৈধভাবে যাত্রী তোলা, সিগন্যাল অমান্য করাসহ শৃঙ্খলাবিরোধী অপরাধ। যেমন, গত ২০ আগস্ট ঢাকা বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশল দপ্তরের সহকারী যন্ত্র প্রকৌশলী ট্রেন চালক মো. মহসীনের বিরুদ্ধে সাত দিন অনুপস্থিত থাকায় তিন মাসের বেতন বৃদ্ধি স্থগিত রাখার আদেশ দেন। গত ১০ আগস্ট সহকারী ট্রেনচালক আনিসুর রহমান ডেমু ট্রেন পরিচালনাকালে প্রতিবন্ধকতা থাকলেও নিয়ম অনুসারে রেজিস্ট্রারে স্বাক্ষর করেননি। এ অভিযাগের পরিপ্রেক্ষিতে এখনো তাঁর শাস্তির আদেশ হয়নি। গত ১০ এপ্রিল ঢাকা আইসিডিতে একটি ট্রেনের চারটি বগি পড়ে গেলে চালক রফিকুল ইসলামের এক বছরের ইনক্রিমেন্ট স্থগিত করা হয়। গত ৬ আগস্ট চালক আবু জাফর দুই দিন অনুপস্থিত থাকায় তাঁর এক বছরের ইনক্রিমেন্ট স্থগিত করার আদেশ হয় গত ৬ অক্টোবর। এভাবেই চালকদের অনিয়ম ধরা পড়ছে ও শাস্তি হচ্ছে।

তবে সাইদুর রহমান ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে কথা বলায় একাধিক সহকারী ট্রেনচালককে অন্যত্র বদলি করে দেওয়া হয়েছে। শাস্তি পাওয়া চালকদের একজন কালের কণ্ঠকে বলেন, যেখানে ট্রেনচালক সংকট রয়েছে সেখানে দপ্তরের বিভিন্ন কাজে এসব কর্মীদের কাজ না করিয়ে ট্রেন পরিচালনায় কাজে লাগানো জরুরি। ঢাকার ডিভিশনাল মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার রেজাউল করিম কয়েক দিন আগে বিষয়টি স্বীকার করে বলেছিলেন, ‘ঢাকায় ট্রেনচালকদের বিভিন্ন ক্যাটাগরির পদ শূন্য রয়েছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা