kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

সাত কোটি মানুষের জন্য স্বাস্থ্য বীমা চালুর চিন্তা

সরকারি ১৪ লাখ চাকুরের জন্য প্রণীত স্বাস্থ্য বীমার মডেল নিয়ে আপত্তির মুখে আসছে নতুন সমন্বিত উদ্যোগ

তৌফিক মারুফ ও সজীব হোম রায়    

১৭ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সাত কোটি মানুষের জন্য স্বাস্থ্য বীমা চালুর চিন্তা

দেশের প্রায় ১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর স্বাস্থ্য বীমা চালুর উদ্যোগ আরো বড় পরিসরে করা হচ্ছে। শুধু সরকারি চাকরিজীবীই নয়, বেসরকারি চাকরিজীবীদেরসহ একটি সমন্বিত জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা করার জন্য নতুন করে একটি টেকনিক্যাল ওয়ার্কিং গ্রুপ কাজ শুরু করেছে। তারা দেশের সব চাকরিজীবীসহ প্রায় সাত কোটি মানুষকে স্বাস্থ্য বীমার আওতায় আনার পথ খুঁজছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি মডেলের প্রস্তাবের অনেক কিছুতেই পরিবর্তন আনা হবে। বিশেষ করে, প্রস্তাবিত সরকারি মডেলের ভেতরে স্বাস্থ্যবীমার সুবিধা আদায়ে ধনিক শ্রেণিকে এগিয়ে রাখা এবং সিলভার, গোল্ড ও প্লাটিনাম শ্রেণিভুক্ত করে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার বিষয়টিও বাদ যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদরা বাংলাদেশের জন্য ফিলিপাইনের স্বাস্থ্য বীমার মডেলকে প্রাধান্য দিচ্ছেন; যেখানে যার যার আয়ের আনুপাতিক হারে নাগরিকরা প্রিমিয়াম জমা দেবে, যা হবে বাধ্যতামূলক। ওই অর্থ স্বাস্থ্য বীমা খাতে জমা হবে, যা থেকে সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারবেন বীমার আওতায় আসা চাকরিজীবীরা। চিকিৎসা শেষে বীমা কার্ডধারীদের প্রিমিয়াম থেকেই তাঁদের বিল পরিশোধ করা হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, সর্বশেষ মন্ত্রণালয় পর্যায়ে এক  সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে নতুন করে—একটি টেকনিক্যাল ওয়ার্কিং কমিটির আওতায় সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত একটি মডেল ঠিক করা হবে। এই মডেলে দেশের সব সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মিলিয়ে প্রায় ছয় কোটি মানুষ স্বাস্থ্যবীমার সুবিধা ভোগ করতে পারবে।

এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব অরিজিৎ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্ত অনুসারে শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমার কাজ শুরু করেছি। এ ক্ষেত্রে আমরা জীবন বীমাকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম মডেল তৈরির জন্য। তারা আরো একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলে একটি মডেল তৈরি করেছে। এখন পর্যন্ত এই মডেল অনুসারে পরবর্তী কাজ এগোবে বলে জানি।’ তিনি বলেন, সরকারি ও বেসরকারি দুটি খাতেরই স্বাস্থ্যবীমার কাজ আলাদাভাবে সমানতালে এগিয়ে চলছে।

অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, স্বাস্থ্যবীমার সঙ্গে অন্য কোনো বীমাকে মেলানো ঠিক হবে না। আবার স্বাস্থ্যবীমার সুবিধাভোগীদেরও কোনো শ্রেণিবিন্যাস করা যাবে না। কারণ রোগ ধনী-গরিব সবার জন্য সমান এবং চিকিৎসাও সমান। তাই উপকারভোগীরা সমান সেবাই পাবে। শুধু প্রিমিয়ামের ক্ষেত্রে উচ্চ বেতনধারীরা বেতনের আনুপাতিক হারে বেশি দেবেন আর কম বেতনধারীরা কম দেবেন। যেসব দেশে স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা চালু হয়েছে সেসব দেশে এমন নিয়মই চালু আছে।

এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র থেকে জানা যায়, দেশে শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য প্রথমবারের মতো গ্রুপ ও স্বাস্থ্যবীমার উদ্যোগ নেওয়া হয় ওই মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বাধীন একটি কমিটির মাধ্যমে। ওই কমিটি একটি মডেল দাঁড় করায়, যেখানে প্রস্তাব করা হয়—প্রিমিয়ামের জন্য ৫০০ টাকা করে ভর্তুকি দিতে পারে সরকার। আর এতে সরকারের বছরে ব্যয় হবে প্রায় ৭২০ কোটি টাকা। প্রিমিয়ামের বাকি টাকা দেবেন সরকারি চাকরিজীবীরা। তবে তা যেন মূল বেতনের ওপর চাপ ফেলতে না পাড়ে সে জন্য ‘চিকিৎসা ভাতা’ থেকে টাকা কেটে নেওয়া হবে। বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীরা চিকিৎসা খরচ বাবদ এক হাজার ৫০০ টাকা করে ভাতা পান। এ ক্ষেত্রে পুরো টাকার অর্ধেক যাবে ফিক্সড ডিপোজিটের একটি তহবিলে। বাকি অর্ধেক টাকা যাবে প্রিমিয়াম খরচ হিসাবে। প্রিমিয়ামের টাকা থেকে হাসপাতালের ব্যয় বহন করা হবে। আর তহবিলের টাকা পাওয়া যাবে বীমার মেয়াদ শেষে। বীমার আওতায় সরকারি চাকরিজীবীকে হাসপাতালে ভর্তি থেকে শুরু করে আইসিইউ পর্যন্ত সব ধরনের সুবিধা দেওয়া হবে। সর্বোচ্চ বীমা সুবিধার জন্য দেওয়া হবে ‘হেলথ কার্ড’।

প্রিমিয়ামের ৬০ শতাংশ অর্থ যাবে স্বাস্থ্যবীমায় আর ৪০ শতাংশ যাবে গ্রুপ বীমার জন্য। স্বাস্থ্যবীমার ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ হারে প্রিমিয়াম দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনটি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হলো—সিলভার, গোল্ড ও প্লাটিনাম। সিলভার গ্রুপ বছরে সর্বোচ্চ ২০ দিন, গোল্ড ২৩ দিন এবং প্লাটিনাম ২৪ দিন হাসপাতাল কাভারেজ (বেড ভাড়া থেকে শুরু করে ওটি চার্জ, সার্জন ও অ্যানেসথেসিয়া ফিসহ) পাবে। স্বাস্থ্যবীমার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা রূপরেখা অনুযায়ী, বীমা কাভারেজের সর্বোচ্চ পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ছয় লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত। সিলভার গ্রুপের বীমাগ্রহীতারা বীমার মেয়াদ শেষে পাবেন তিন লাখ টাকা, গোল্ড বীমাগ্রহীতারা পাঁচ লাখ এবং প্লাটিনাম বীমাগ্রহীতারা পাবেন ছয় লাখ ৫০ হাজার টাকা।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য এমন বিভাজিত স্বাস্থ্যবীমার চিন্তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ নয়। কারণ স্বাস্থ্যবীমার ক্ষেত্রে এমন শ্রেণিবিন্যাস করা হলে তা উল্টো বিপদ বয়ে আনবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য। বরং সচ্ছলদের চেয়ে অসচ্ছলরা বেশি সুবিধা পাবে যে নীতিতে, সেই নীতিতেই বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যবীমার গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ করে, ধনীদের প্রিমিয়ামের সুবিধা যাতে গরিবরা পায়, সেটিই বেশি লক্ষ্য থাকে। এ জন্যই একই হারে খরচ কাটা হয়। এখানেও তা-ই করতে হবে।

সরকারি চাকরিজীবীদের গ্রুপ বীমার সঙ্গে অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে স্বাস্থ্যবীমা রাখা হচ্ছে। এ বীমার সুবিধাভোগীর বয়স হবে সর্বনিম্ন ১৮ বছর এবং সর্বোচ্চ ৫৯ বছর। এখানে ১৮ বছর রাখা হচ্ছে সরকারি চাকুরেদের পরিবারের সদস্য অন্তর্ভুক্তির সুবিধা দেওয়ার জন্য।

সরকারি চাকরিজীবীরা যাতে স্বাস্থ্যবীমার সর্বোচ্চ সুবিধা পান সে জন্য তৈরি করা হবে হেলথ কার্ড। এই হেলথ কার্ড সাপোর্টের জন্য হবে বিশেষ মোবাইল অ্যাপস। মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হেলথ কার্ডের সব তথ্য জানতে পারবে। এমনকি রোগীর বিভিন্ন রোগের ডাটাবেইস থাকবে হেলথ কার্ডে। আবার এই কার্ডে রোগীর হাসপাতালে ভর্তি, ছাড়া পাওয়াসহ নানা তথ্য থাকবে। সরকারি চাকরিজীবীদের পরিবারের সদস্যদেরও এর আওতায় আনা হতে পারে। তবে তার জন্য পৃথক প্রিমিয়াম দিতে হবে। আর সব বিষয় পরিচালনা করা হবে একটি পৃথক নীতিমালার আওতায়।

সরকারি চাকুরেদের স্বাস্থ্যবীমা দাবি নিষ্পত্তি করতে জীবন বীমা করপোরেশন ‘থার্ড পার্টি অ্যাডমিনিস্ট্রেটর (টিপিএ)’-এর মতো ভূমিকা রাখবে। তবে জীবন বীমার মাধ্যমে স্বাস্থ্যবীমা বাস্তবায়নকেও বাস্তবসম্মত নয় বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, সাধারণ বীমা ও স্বাস্থ্যবীমার মডেল কখনোই এক রকম হতে পারে না।

অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ জানান, চাকরিজীবীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য স্বাস্থ্যবীমার আরেকটি মোবাইল ইউজার মডেলকে সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে চলতি বছরের শুরুর দিকে। ওই মডেল অনুসারে দেশে যারা মোবাইল ব্যবহার করছে, তাদের প্রতিকল থেকে এক পয়সা-দুই পয়সা হারে কেটে নিয়ে তা প্রিমিয়ামের খাতে জমা হবে, যা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবার কাজে আসবে। এর সঙ্গে গার্মেন্টকর্মীদের জন্য আলাদা করে স্বাস্থ্যবীমা চালুর ব্যাপারেও পরিকল্পনা চলছে। সেটা করতে পারলে আরো প্রায় দেড় কোটি মানুষ এই বীমার সুবিধায় আনা যাবে, যদিও দেশের সব মানুষকে স্বাস্থ্যবীমার আওতায় আনতে আরো অনেকটা সময় লেগে যাবে। কারণ এখনো বাংলাদেশ সেই পর্যায়ে যেতে প্রস্তুত হতে পারেনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা