kalerkantho

শুক্রবার । ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৫ রবিউস সানি          

গোয়েন্দা পুলিশের চার্জশিটের তথ্য

আবরারকে পেটানোর সিদ্ধান্ত গেস্টরুমে

আবরার হত্যা মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আবরারকে পেটানোর সিদ্ধান্ত গেস্টরুমে

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ রাব্বীকে পেটানোর সিদ্ধান্ত হয় শেরেবাংলা হলের গেস্টরুমে। গত ৫ অক্টোবর অভিযুক্ত আসামিদের কয়েকজন সভা করে ওই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরদিন দিবাগত রাতে আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। আবরার হত্যা মামলার তদন্ত শেষে আদালতে জমা দেওয়া পুলিশের অভিযোগপত্রে (চার্জশিটে) এমন তথ্য উঠে এসেছে।

গোয়েন্দা পুলিশের জমা দেওয়া অভিযোগপত্রের একটি কপি কালের কণ্ঠ’র হাতে এসেছে। তাতে বলা হয়েছে, গেস্টরুমে নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে ৬ অক্টোবর রাত ৮টার দিকে মেহেদী হাসান ওরফে রবিন ও ইফতি মোশাররফের নির্দেশে এহতেশামুল রাব্বি, তানিম মুনতাসির আল জেমি ও এ এস এম নাজমুস সাদাত আবুজার আবরারের কক্ষে যান। আবরার তাঁর ১০১১ নম্বর কক্ষে তখন ঘুমাচ্ছিলেন। তানিম ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে আবরারকে বলেন, ‘বড় ভাইয়েরা তোকে ডাকছে। ২০১১ নম্বর রুমে যেতে হবে।’ কখন যেতে হবে এবং কেন যেতে হবে তা আবরার জানতে চাইলে উত্তরে তানিম বলেন, ‘গেলেই দেখতে পাবি।’ এরপরই ল্যাপটপ, মোবাইলসহ আবরারকে ২০১১ নম্বর কক্ষে নিয়ে যাওয়ার পর তাবাখখারুল, ইফতি মোশাররফ ও মুজতবা রাফিদ আবরারের মোবাইল ও ল্যাপটপ চেক করতে থাকেন। তখন এঁদের মধ্যে একজন ‘আবরারের মোবাইলে শিবিরের তথ্য পাওয়া গেছে’ বলতেই উপস্থিত মেহেদী হাসান ওরফে রবিন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। চোখ থেকে চশমা খুলেই রবিন প্রচণ্ড জোরে আবরারের মুখে কয়েকটি থাপ্পড় মারেন। এরই মধ্যে ক্রিকেট স্টাম্প নিয়ে আসেন মোরশেদ। এরপর আবরারকে জোরে থাপ্পড় মেরেই ক্রিকেট স্টাম্প হাতে তুলে নিয়ে আবরারের পিঠ, পা, হাতসহ বিভিন্ন স্থানে নির্মমভাবে আঘাত করতে থাকেন ইফতি মোশাররফ। সেটি ভেঙে গেলে আরেকটি স্টাম্প নিয়ে আসেন এহতেশামুল রাব্বি ও তানিম। এ সময় একটি স্টাম্প হাতে তুলে নিয়ে অনিক সরকার একাধারে আবরারের সারা শরীরে ৫০ থেকে ৬০টি আঘাত করেন। এতে আবরার মেঝেতে পড়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে মুজাহিদুল ইসলাম ও শামিম বিল্লা স্কিপিং রোপ (মোটা দড়ি) দিয়ে দুই থেকে তিনটি আঘাত করেন আবরারকে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আবরার বাঁচার জন্য আকুতি-মিনতি করলেও রেহাই মেলেনি। ওই অবস্থায় ক্রিকেট স্টাম্প দিয়ে আবরারের শরীরের বিভিন্ন স্থানে সর্বশক্তি দিয়ে আঘাত করেন মিফতাহুল ইসলাম ওরফে জীয়ন। নির্যাতনের একপর্যায়ে আবরার বমি ও প্রস্রাব করে ফেলেন। এরপর তাঁকে হলের বাথরুমে টেনে নিয়ে জামাকাপড় পরিষ্কার করা হয়। এভাবে রাত ১১টা বেজে যায়। তখন ওই কক্ষে ঢোকেন এস এম মাহমুদ ওরফে সেতু। তিনি অন্যদের কাছে জানতে চান আবরার কোনো তথ্য দিচ্ছে কি না। ইফতি মোশাররফ, অনিক সরকার ও মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, আবরার কোনো তথ্য দিচ্ছে না। তখন সেতুর নির্দেশে ইফতি মোশাররফ ও অনিক সরকার আববারকে স্টাম্প ও স্কিপিং রোপ দিয়ে আরো পেটাতে থাকেন। সে সঙ্গে কনুই দিয়ে আবরারের পিঠে প্রচণ্ড আঘাত করার পাশাপাশি সবাই মিলে প্রচণ্ড শক্তিতে আবরারকে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি, চড়-থাপ্পড় ও লাথি মারতে থাকে।

অনিক সরকার ও মেহেদী হাসান রবিন এরপর ওই কক্ষ থেকে বের হয়ে যান। যাওয়ার আগে অন্যদের বলে যান, ‘তোরা আবরারের কাছ থেকে তথ্য বের কর।’ তখন মনিরুজ্জামান মনির আবরারের মোবাইল চেক করে শিবিরের তথ্য পাওয়া গেছে জানিয়ে স্টাম্প দিয়ে পেটাতে থাকেন। আর নাজমুস সাদাত, এহতেশামুল তানিম, তাবাখখারুল ও কাশীরাম জেমি আবরারকে চড়-থাপ্পড় মারেন। এই পর্যায়ে বাইরে থেকে আবার ওই কক্ষে ঢুকে অনিক সরকার ক্রিকেট স্টাম্প হাতে তুলে নিয়ে আবরারকে আরো জোরে ৪০ থেকে ৫০টি আঘাত করেন। এর পরপরই আবরার বমি ও প্রস্রাব করে ফেলেন। ইশারা-ইঙ্গিতে বাঁচার জন্য আকুতি-মিনতি করতে থাকলে হলের বাথরুমে নিয়ে ধুয়ে মুছে জামা কাপড় বদলানো হয় আবরারের।

তখন রাত আড়াইটা। ওই সময় আবরারকে তোশকে মুড়ে হলের দোতলার সিঁড়িতে নিয়ে রাখেন ইফতি মোশাররফ, মুজাহিদ, তাবাখখারুল ও তোহা। এরপর বুয়েটের চিকিৎসক ও অ্যাম্বুল্যান্স ডেকে আনা হয়। চিকিৎসক পরীক্ষা করে ঘোষণা দেন যে আবরার মারা গেছেন।

তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক ওয়াহিদুজ্জামান অভিযোগপত্রে এসব তথ্যের পাশাপাশি আরো বলেছেন, আবরার হত্যার মূল হোতা শেরেবাংলা হলে আবরারের রুমমেট মিজানুর রহমান। মিজানুর রহমানই বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান ওরফে রবিনকে বলেছিলেন যে আবরারকে তাঁর শিবির বলে সন্দেহ হয়।

মিজানুরের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মেহেদী হাসান ওরফে রবিন বিষয়টি শেরেবাংলা হল ছাত্রলীগের নিজস্ব ফেসবুক মেসেঞ্জারে জানান। বিষয়টি নিয়ে ৪ অক্টোবর শেরেবাংলা হলের ক্যান্টিনে রবিন ইশতিয়াক, অমিত সাহা, ইফতি মোশাররফ সকাল, আকাশ হোসেন, খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম, মনিরুজ্জামান মনির, মিফতাহুল ইসলাম জীয়নসহ অন্যরা মিটিং করেন। তাঁরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন যে আবরার তাঁর কক্ষে নেই। সেদিনই তিনি কুষ্টিয়ার গ্রামের বাড়িতে চলে যান। পরদিন ৫ অক্টোবর মনিরুজ্জামান মনিরের নেতৃত্বে আসামি হোসেন মোহাম্মাদ তোহা, আকাশ হোসেন, মাজেদুর রহমান মাজেদ, মোয়াজ আবু হুরায়রাসহ অন্যরা গেস্টরুমে একত্রিত হয়ে আবরারকে পিটিয়ে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন।

অভিযোগপত্রে আরো বলা হয়েছে, যোগসাজশ করে পরস্পর সহায়তায় শিবির সন্দেহে মিথ্যা, বানোয়াট, ভিত্তিহীন অভিযোগ এনে নির্মমভাবে পিটিয়ে আবরারকে হত্যা করা হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা