kalerkantho

শুক্রবার । ৩ আশ্বিন ১৪২৭। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০। ২৯ মহররম ১৪৪২

শেকড়ের গান ও নৃত্যে জমজমাট উৎসব শুরু

নওশাদ জামিল   

১৫ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শেকড়ের গান ও নৃত্যে জমজমাট উৎসব শুরু

রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে গতকাল ফোক ফেস্টে ভারতের শিল্পী দালের মেহেন্দির পরিবেশনা। ছবি : তারেক আজিজ নিশক

কার্তিকের জোছনাময় রাতে গতকাল বৃহস্পতিবার শুরু হলো শেকড়লগ্ন গান ও নৃত্যের জমজমাট উৎসব ‘ফোক ফেস্ট’। যার পোশাকি নাম আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উৎসব। তিন দিনের এই উৎসবের প্রথম দিন গতকাল সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত সুর-সমুদ্রে আর লোকনৃত্যের ঝংকারে অবগাহন করে রাজধানীবাসী প্রায় ৩০ হাজার দর্শকশ্রোতা।

উদ্বোধনী দিনের পরিবেশনায় অংশ নেন বাংলাদেশ, ভারত ও জর্জিয়ার শিল্পীরা। এর মধ্যে ভারতের খ্যতিমান শিল্পী দালের মেহেন্দি প্রথম দিনের উৎসবের শেষ পরিবেশনায় মাত করেন আসর। গেয়ে শোনান তাঁর জনপ্রিয় গানগুলো। আজ শুক্রবার উৎসবের দ্বিতীয় দিন। উৎসব শুরু হবে সন্ধ্যা ৭টায়, চলবে রাত ১২টা পর্যন্ত। গতকাল উৎসব শুরু হয় লোকনৃত্য দিয়ে। নাচের তালে সূচনা হওয়া পরিবেশনা পর্বটি এগিয়ে যায় সহজিয়া সুরের পথে। সুরের আবহে ঝলমল করে ওঠে আর্মি স্টেডিয়াম। সহজিয়া বাণী ও সুরে সুরে  উঠে আসে  জীবনের গভীর দর্শন থেকে শুরু করে আধ্যাত্মিকতা, প্রেম আর মাটির ঘ্রাণ। অগণন দর্শক-শ্রোতার উপস্থিতিতে এদিন অনুষ্ঠান শুরুর বেশ আগেই সরব হয়ে ওঠে উৎসব আঙিনা। আন্তর্জাতিক এই লোকসংগীত উৎসবে অংশ নিচ্ছেন বাংলাদেশসহ ছয় দেশের দুই শতাধিক শিল্পী।  বিগত চার বছরের ধারাবাহিকতায় পঞ্চমবারের মতো উৎসবটির আয়োজন করছে সান ফাউন্ডেশন। 

উৎসবের প্রথম পরিবেশনাটি ছিল সিলেট অঞ্চলের  ধামাইল নাচ। ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনা উপস্থাপন করেন সামিনা হুসাইন প্রেমা ও তাঁর নৃত্যদল ভাবনা। নারী ও পুরুষ শিল্পীদের নাচের মাঝে ভেসে বেড়ায় ‘বন্ধু বিনে প্রাণ বাঁচে না’সহ লোকজ সুর। ১৫ মিনিটের পরিবেশনায় নয়ন জুড়ানো ধামাইল নাচের সঙ্গে ছিল ময়মনসিংহ অঞ্চলের লাঠিনৃত্য।

এরপর মন কেমন করা স্নিগ্ধ সুরে শ্রোতার হৃদয় রাঙায় জর্জিয়ার লোকসংগীত। ইউরেশিয়া অঞ্চলের দেশটির শেভেনেবুরেবি নামের দলটি শুরুতেই শ্রোতার সঙ্গে সংযোগ ঘটায় নিজেদের। দলের কণ্ঠশিল্পী স্পষ্ট বাংলায় বলে ওঠেন, ‘কেমন আছ তোমরা? আমরা ভালোবাসি বাংলাদেশকে!’ কথা শেষে ভাষার দূরত্ব ঘুচিয়ে দলটি পরিবেশন করে শ্রুতিমধুর জর্জিয়ান লোকসংগীত। হাজারও শ্রোতা তন্ময় হয়ে শোনে বিচিত্র বাদ্যযন্ত্রসহযোগে গাওয়া সেই সব গান। জর্জীয় সুরের মুগ্ধতার রেশ ধরে করতালিতে ভালোবাসার প্রকাশ ঘটায় দলটির প্রতি।

এরপর ছিল উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা। প্রধান অতিথি হিসেবে উৎসব উদ্বোধনের ঘোষণা দেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন,  ঢাকা ব্যাংকের ফাউন্ডার চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার এবং সান কমিউনিকেশনের চেয়ারম্যান অঞ্জন  চৌধুরী। উদ্বোধনী বক্তব্যে তথ্যমন্ত্রী বলেন, গান তাঁর নিজ গুণে মানুষকে হাসায়, কাঁদায় ও আনন্দ দেয়। সুন্দর সমাজ তৈরির জন্য একটি

বড় হাতিয়ার হচ্ছে সংগীত। আব্দুল মোমেন বলেন, জীবনের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, প্রেম-ভালোবাসা, আবেগ-অনুভূতির এক অনন্য সংমিশ্রণ আমাদের লোকসংগীত। এ সময় তিনি ‘কোথায় পাব কলসি কন্যা, কোথায় পাবো দড়ি, তুমি হও গহিন গাঙ আমি ডুইব্যা মরি’ গানটির উদাহরণ  টেনে বলেন, অনুভূতির এত সুন্দর প্রকাশ আর কোথায় পাওয়া যাবে! আবদুল হাই সরকার বলেন, বর্তমান সময়ে পশ্চিমা সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার অন্যতম পথ এই লোকসংগীত। অঞ্জন চৌধুরী বলেন, এই আয়োজনের মাধ্যমে বাংলার লোকজ সুর ছড়িয়ে যাচ্ছে সারা বিশ্বে। অন্যদিকে বিশ্বের নানা প্রান্তের লোকগানের সঙ্গে পরিচয় হচ্ছে বাংলার মানুষের। উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা শেষে গান শোনান বাংলাদেশের প্রখ্যাত বাউলশিল্পী শাহ আলম সরকার। পালাগানের এই শিল্পীর প্রথম গানে ছিল সম্প্রীতির বারতা। গেয়ে শোনান ‘কি দরকার হিন্দু-মুসলমান’। এরপর গেয়ে শোনান ‘বিয়ে করা মানে জ্যান্ত প্রাণে মরা’, ‘এত যে নিঠুর বন্ধু জানা ছিল না’, ‘পিরিত রতন পিরিত যতন’, ‘আমি তো মরে যাব, চলে যাব, রেখে যাব সবই’।

আয়োজনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী ভারতের দালের মেহেন্দি। ১৯৯৫ সালে দালের প্রথম অ্যালবাম ‘বোলো তা রা রা রা’ প্রায় ২০ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়, যা কিনা একটি রেকর্ড। ‘দ্য কিং অব ভাঙড়া’ দালের মেহেন্দির কণ্ঠে পাঞ্জাবি ভাঙড়া গান সীমানা পেরিয়ে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা পেয়েছে। গতকাল তাঁর সুরসুধায় শেষ হয় প্রথম দিনের উৎসব।

দ্বিতীয় দিন সুরের মূর্ছনায় ভাসাবেন বাংলাদেশের মালেক কাওয়াল, ফকির শাহাবুদ্দিন, ‘ম্যাজিক বাউলিয়ানা’র কামরুজ্জামান রাব্বি ও শফিকুল ইসলাম, পাকিস্তানের হিনা নাসরুল্লাহ এবং মালির হাবিব কইটে অ্যান্ড বামাদা। সমাপনী দিনে মঞ্চ মাতাবেন বাংলাদেশের কাজল দেওয়ান, চন্দনা মজুমদার, পাকিস্তানের জুনুন এবং রাশিয়ার সাত্তুমা।

ফোক ফেস্ট সরাসরি সম্প্রচারিত হচ্ছে মাছরাঙা টেলিভিশনে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা