kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

ভয়াল স্মৃতিবহ সিডরের এক যুগ

ঘূর্ণিঝড় আতঙ্ক কাটে না উপকূলবাসীর

নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা এবং বাগেরহাট ও শরণখোলা প্রতিনিধি   

১৫ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ঘূর্ণিঝড় আতঙ্ক কাটে না উপকূলবাসীর

আজ থেকে ১২ বছর আগে ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর রাতে বলেশ্বরপারে প্রবল বেগে জলোচ্ছ্বাস আছড়ে পড়ে। ঘূর্ণিঝড় সিডর সৃষ্ট এ তীব্র জলোচ্ছ্বাস লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল বিস্তীর্ণ জনপদ। জন ও সম্পদের বিপুল ক্ষতিতে হতবিহ্বল হয়ে পড়ে সমগ্র দেশ। সেই ক্ষত আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি, বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ। প্রসঙ্গত, সিডরের দুই বছরের মধ্যেই ২০০৯ সালের ২৫ মে আঘাত হানে আইলা নামের আরেক প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়। আর এর ১০ বছরের মাথায় গত ৯ নভেম্বর রাতে আবারও ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আতঙ্কে বলেশ্বরনদের উভয় তীরের মানুষ বিনিদ্র রাত কাটায়। তবে আশার কথা, সহসা দুর্বল হয়ে পড়া বুলবুল তেমন ক্ষতি করতে পারেনি। সিডর থেকে বুলবুল পর্যন্ত অনেক ঘূর্ণিঝড় সতর্কবার্তার মুখোমুখি হয়েছে উপকূলের মানুষ। ঘন ঘন সতর্কবার্তা আর এরপর ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ উপকূলবাসীর অবচেতনে যেন স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে ঘরপোড়া গরুর মতো। ঝড়ের সতর্কবার্তায় তারা একদিকে আগাম প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে অন্যদিকে সিডর-আইলার মতো ভয়াবহতার পুরনো আতঙ্ক যেন সন্তর্পণে ভর করে মনের গভীরে।

দক্ষিণাঞ্চলের বরগুনা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরার উপকূলভাগ জুড়ে সিডর হামলে পড়েছিল। সেবার খুলনা ও সাতক্ষীরায় ক্ষয়ক্ষতি একটু কম হয়েছিল; কিন্তু দুই বছর পরের ঘূর্ণিঝড় আইলা তীব্ররোষে হামলে পড়ে সাতক্ষীরা ও খুলনায়; ক্ষতিও করে মারাত্মক। আর এবারে বুলবুল সুন্দরবনের একেবারে পশ্চিম অংশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সাগরদ্বীপে আঘাত করায় এবং সুন্দরবন বরাবর পুবমুখো এগিয়ে আসায় জনপদের ক্ষতি হয়েছে তুলনামূলকভাবে কম। সুন্দরবনের পশ্চিম দিক থেকে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল যত পূর্ব দিকে এগিয়েছে তত তার শক্তি কমেছে, দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে। একদিকে সুন্দরবনের প্রবল বাধা অন্যদিকে বৃষ্টিপাত শুরু হয়ে যাওয়ায় বুলবুল দুর্বল হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলস্বরূপ বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা ও তীব্রতা দুই-ই বেড়েছে, যা সামনের দিনগুলোতে আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আজকাল সাগরে ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় দানা বাঁধছে। অবশ্য সব ঘূর্ণিঝড়ই আমাদের দেশে আঘাত করেনি। এসব দুর্যোগের জন্য প্রধানতম দায়ী তাপমাত্রা বৃদ্ধি। আর এর সরাসরি শিকার হচ্ছে বাংলাদেশসহ বিশ্বের উপকূলীয় দেশগুলো। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মানুষ নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যার মুখোমুখিও হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ক্লাইমেট সেন্ট্রাল নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে চার কোটি ২০ লাখেরও বেশি মানুষ বন্যাঝুঁকিতে পড়তে পারে। আবার স্বাস্থ্যবিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেটের ১৪ নভেম্বরের এক প্রতিবেদন মতে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশে ডেঙ্গু রোগের ঝুঁকি, শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যগত সমস্যা বাড়ছে। বায়ুদূষণ বাড়ছে। মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

সিডরের আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া অন্যতম জনপদ হচ্ছে বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার সাউথখালী ইউনিয়ন। এখানকার মানুষ এককথায় সব কিছুই হারিয়েছিল। প্রায় প্রতিটি পরিবারের এক বা একাধিক সদস্য মারা গিয়েছিল সাউথখালীর। সরকারি এবং দেশি-বিদেশি দাতা সংস্থার সহায়তায় বেঁচে যাওয়া মানুষগুলো আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তবে এখনো ১২ বছর আগের অবস্থায় তারা ফিরে যেতে পারেনি।

বৃহস্পতিবার বিকেলে কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে কথা হয় বলেশ্বরনদের পশ্চিম প্রান্তের রায়েন্দাবাজারের পূর্ব মাথার হেমায়েত উদ্দিন বাদশা, দক্ষিণ সাউথখালীর ইউসুফ আলী খান ও আশরাফ আলী শিকদারের। তাঁরা সেই ভয়াল কালরাতের কথা মনে করে আঁতকে ওঠেন এখনো। তাঁরা আর এমন দিন চান না, কিন্তু ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় সতর্কবার্তা এবং ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে এই জনপদের মানুষগুলো আসলেই বিপর্যস্ত। সিডরে বিধ্বস্ত সাউথখালী ইউনিয়নে সৌদি সরকারের সহায়তায় পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। যে ঘর তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল, তা আকারে অনেক ছোট। মানুষ তা নিয়ে ক্ষুব্ধ। ইউসুফ আলী খান জানান, সিডরে তাঁদের সব শেষ হয়ে গেছে। তিনি আর এমন সর্বনাশ দেখতে চান না। কিন্তু বারবারে ঘূর্ণিঝড় তাঁদের মনে স্থায়ী ভীতি তৈরি করেছে।

বলেশ্বরপারের বগী গ্রামের বাসিন্দা আলেতুন নেছার (৭৬) স্বামী, দুই নাতি-নাতনি এবং পুত্রবধূ জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায়। প্রিয়জন হারানোর বেদনায় এখনো তিনি ডুকরে ওঠেন। এখন রোগশোকে অনেকটা অচল হয়ে পড়েছেন ওই নারী। প্রতিবেশী রুহুল আমিন পঞ্চায়েত (৫৫) তাঁর দুই ছেলে-মেয়ে এবং বাবাকে হারিয়েছেন সিডরে। জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায় তাঁর দুই বছরের শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের ২২ জন নারী-পুরুষ। কেউ কেউ তাদের স্বজনকে আজও খুঁজে পায়নি। কোনো কোনো শিশু মা-বাবাকে হারিয়ে এতিমের খাতায় নাম লিখিয়েছে। রাজৈর গ্রামে খান বংশের শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের ২৬ জন নারী-পুরুষ মারা যায় সিডরে।

সিডরের পর বগী গ্রামে কাঁচা-পাকা, সেমিপাকাসহ বিভিন্ন ধরনের ছোট-বড় বাড়িঘর তৈরি করা হয়। তৈরি হয় দোতলা ও তিনতলা সাইক্লোন শেল্টারও। বৃক্ষ উজাড় হয়ে যাওয়া স্থানগুলোতে নতুন করে গাছপালাও জন্ম নিয়েছে।

প্রসঙ্গত, সিডরের আঘাতে উপকূলীয় অঞ্চলের দুই হাজার ২২১ জন লোক মারা যায়। বিপন্ন হয়ে পড়ে এক কোটিরও বেশি মানুষ। সুন্দরবনের বিশাল সংখ্যায় পশু-পাখিরও মৃত্যু হয়। প্রায় ১০ লাখ ঘরবাড়ি ধ্বংস হয় আর আড়াই লাখ গৃহপালিত পশু এবং হাঁস-মুরগি মারা যায়। সরকারি হিসাবে সিডরে শুধু শরণখোলা উপজেলায় ৬৯৫ জন মারা যায় এবং এখনো পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছে ৭৬ জন। বাগেরহাট জেলা প্রশাসক দপ্তর সূত্র জানায়, সিডরে জেলায় ৯০৮ জন মারা যায়। বাগেরহাটের এক হাজার ৬২৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা, ৬৫ হাজার ঘরবাড়ি এবং চার লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি টাকা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা