kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

আইন নির্দেশ কিছুই মানছে না আ. লীগ

বগুড়া ঢেকে যাচ্ছে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনে

লিমন বাসার, বগুড়া   

১৫ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বগুড়া ঢেকে যাচ্ছে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনে

নেতাকর্মী এমনকি সমর্থকদেরও রংবাহারি বিজ্ঞাপনের ব্যানার-পোস্টার-ফেস্টুনে ছেয়ে আছে বগুড়া শহর। ছবি : কালের কণ্ঠ

দলে গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবি নেই। কর্মীদের অনেকেই জানেন না দলে সেই নেতার অবস্থান কী। এলাকায় কিংবা কর্মী বাহিনীর কাছে পরিচিত শুধু নেতা হিসেবে। সেই নেতাদের অনেকেই পরিচিতি বাড়ানোর জন্য নিজের ঢাউস ছবি দিয়ে শহরের যত্রতত্র লাগিয়েছেন বিলবোর্ড-পোস্টার। অথচ নিজের ছবি দিয়ে বিলবোর্ড, পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন তৈরি না করতে নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেওয়া আছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে। মূল দল ও তাদের সব সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনকে এই নির্দেশ মেনে চলতে বলা হয়েছে কয়েক বছর আগেই। কিন্তু বগুড়ায় শুরু থেকেই সেই নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। শহরের প্রায় প্রতিটি এলাকায় গিয়ে চোখে পড়ে এমন দৃশ্য।

আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড থেকে পাঠানো নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, বিলবোর্ড, পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি ছাড়া কারো ছবি ব্যবহার করা যাবে না। আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে সাংগঠনিক জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বরাবর চিঠিগুলো ডাকযোগে দেওয়া হয়েছিল।

নির্দেশনার বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও রাজশাহী বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘দলীয় নির্দেশনা না মানলে অবশ্যই শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি আমরা খোঁজখবর করব।’

ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি যে সারা বাংলাদেশে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক বিলবোর্ড, পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন শোভা পাচ্ছে, যাতে সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ছবি থাকছে। অথচ বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি থাকছে খুবই ছোট আকারে, যা দেশের সাধারণ মানুষের নিকট দৃষ্টিকটু। সুতরাং জাতির পিতা ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যতীত অন্য কারো ছবি থাকলে সেই সব বিলবোর্ড, পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন সরিয়ে ফেলার জন্য সারা দেশে সংগঠনের নেতাকর্মীদের নির্দেশনা  দেওয়া হলো।’

আগামী ১৬ নভেম্বর বগুড়া শহর আওয়ামী লীগ এবং ৭ ডিসেম্বর বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এই সম্মেলনে সভাপতি-সম্পাদক পদে যাঁরা প্রার্থী হচ্ছেন মূলত তাঁদের গুণগান গাইতে এবং পরিচিতি বাড়াতে শহরে এখন পোস্টার-ব্যানারের ছড়াছড়ি। দেখা গেছে, প্রায় সব ব্যানার ও বিলবোর্ডে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি ছোট আকারের আর গুণগান গাওয়া সেই নেতার ছবি পোস্টার ও বিলবোর্ডের অর্ধেক অংশজুড়ে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, ছবিসর্বস্ব এই পোস্টার ও বিলবোর্ড তৈরি করা পাতি নেতাদের কাজ। এটা যে শুধু নিজেদের পরিচিতি বাড়ানোর জন্য করা তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাঁরা শুধু সুযোগ খোঁজেন কোন উপলক্ষে, কখন পোস্টার-ব্যানার লাগানো যায়।

বগুড়া জেলা যুবলীগের কমিটি এখনো ঘোষণা না হলেও নিজের ছবি দিয়ে সহসভাপতি দাবি করে সাতমাথায় সবচেয়ে বড় বিলবোর্ড লাগিয়েছেন মোবাশ্বার হোসেন স্বরাজ ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাইসুল তোফায়েল কোয়েল। এখানে তাঁদের চেয়ে বঙ্গবন্ধুর ছবি অনেক ছোট আকৃতির করা হয়েছে। অন্যদিকে নিজেকে জেলা যুবলীগ নেতা পরিচয় দিয়ে বঙ্গবন্ধুর চেয়ে চার গুণ বড় করে বিলবোর্ডে নিজের ছবি টানিয়েছেন শরিফুল ইসলাম পিয়াল। একসময় ছাত্রশিবিরের রাজনীতি করা লাখিন আহমেদ এখন নিজেকে পরিচয় দিচ্ছেন শহর যুবলীগ নেতা হিসেবে। তিনিও বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে নিজের ছবি চার গুণ বড় করেছেন। নন্দীগ্রাম উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা মোত্তারিন জাহিদ সরকার নিজের ছবি বিলবোর্ডে দিয়েছেন অন্য সব নেতার চেয়ে বড় করে। শেখ ফারহান আল অরছি নামের এক ছাত্রনেতা আবার আওয়ামী লীগে যে নেতাকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দেখতে চান তাঁর এবং নিজের ছবি বড় করে হাইলাইট করেছেন।

যুবলীগ নেতা স্বরাজ, বাপ্পি কুমার চৌধুরী, জাকারিয়া আদিল ও এনামুল হক নিজেদের এবং পছন্দের নেতার ছবি দিয়ে আরো একটি বিশাল আকৃতির বিলবোর্ড বানিয়েছেন, সেখানেও বঙ্গবন্ধুর ছবির সাইজ সবচেয়ে ছোট। আর সরকারি আজিজুল হক কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি মোজাম্মেল হোসাইন বুলবুল ও মিথিলেস প্রসাদের তৈরি করা বিশাল আকারের বিলবোর্ডে বঙ্গবন্ধুর ছবি খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয়। এ ছাড়া স্বেচ্ছাসেবক লীগের আল আমিন পরশ, নূর মোহাম্মদ সাদ্দাম, কোয়েল ইসলাম, প্রভাষক মনিরুজ্জামান মনির, তাঁতি লীগের রাশেকুজ্জামান রাজন, ছাত্রলীগের রাকিব হাসান শাওন, ওবাইদুল্লাহ সরকার স্বপন, জাকিউল আলম জনি, শহর শ্রমিক লীগের ইমরান শেখ, শামীম রেজা, বাংলার মুখের সিনথিয়া ইসলাম, মহিলা শ্রমিক লীগের শামীমা আক্তার জলি যেসব বিলবোর্ড তৈরি করেছেন তাতে নিজেদের প্রচারণা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবিকে অবমাননা করা হয়েছে।

যুবলীগ নেতা স্বরাজ তাঁর বাবা মোজাফ্ফর হোসেনের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষেও একটি বিলবোর্ড লাগিয়েছেন। সেখানেও বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে তাঁদের বাবা-ছেলের ছবি বড় করা হয়েছে। এ রকম উৎকট পোস্টার-বিলবোর্ড দেখা গেছে দত্তবাড়ি এলাকায় যুবলীগ নেতা সেতু খন্দকার, শহর যুবলীগের সদস্য শাহাদৎ হাসান পিয়াল, টেম্পল রোডে শহর যুবলীগ নেতা আনন্দ চন্দ্র দাস, আল আমিন মেহেদী, শ্রী সোহেল, সংগ্রাম চন্দ্র দাস ও রাছেদুজ্জামান রাছেলের। শহর ঘুরে এমন আরো শতাধিক নেতাকর্মীর পোস্টার, বিলবোর্ড ও ব্যানার দেখা গেছে। অভিযোগ উঠেছে, পোস্টার, ব্যানার ও বিলবোর্ডে ছবি দিয়ে প্রচারণা করা এমন অনেকেই রয়েছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কার্যক্রম, দলে অনুপ্রবেশ ও বিগত সময়ে একাধিক নাশকতার মামলা ছিল।

জানতে চাইলে জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম ডাবলু কালের কণ্ঠকে বলেন, কমিটি ঘোষণার আগে কেউ পদবি ব্যবহার করতে পারবে না। এটি সাংগঠনিক শৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে না। আর বিলবোর্ডে জাতির জনক ও প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে নিজের ছবি বড় করে তারাই, যারা রাজনীতির গুরুত্ব বোঝে না।

উল্লেখ্য, ১৯৯৪ থেকে ২০১৯—দীর্ঘ প্রায় চব্বিশ বছর বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির পদে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা মমতাজ উদ্দিন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তাঁর মৃত্যুর পর দলের পুনর্গঠন নিয়ে তৃণমূলে নানামুখী আলোচনা শুরু হয়। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ১০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সম্মেলনের দুই বছর পর ৭১ সদস্যের জেলা কমিটি গঠন করা হয়। এরপর আরো তিন বছর পার হয়েছে। এ কারণে এবারের সম্মেলন জেলা আওয়ামী লীগের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা