kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

রাজশাহীতে রেলের টেন্ডার নিয়ে যুবলীগ নেতা খুন

মূল হোতারা মামলায়ই নেই, গ্রেপ্তার ৭

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

১৫ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মূল হোতারা মামলায়ই নেই, গ্রেপ্তার ৭

আগের দিন মঙ্গলবার দুপুরে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে রাজশাহীর সদর দপ্তরের প্রধান সরঞ্জাম শাখার সামনে গিয়ে সদলবলে ছবি তুলেছিলেন তাঁরা। কেউ কেউ বিজয়ীর বেশে ‘ভি’ চিহ্নও দেখিয়েছিলেন ছবি তোলার সময়। এই ‘ভি’ চিহ্নধারীদের মধ্যে দুজন পরের দিন বুধবার দুপুরে একই স্থানে সংঘটিত যুবলীগকর্মী সানোয়ার হোসেন রাসেল (২৫) হত্যায় সরাসরি অংশ নেন। আর ছবির অন্যরা নেপথ্যে থেকে মদদ দেন।

ছবির বাইরে থাকা রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) এক কাউন্সিলর ও প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতারও মদদ ছিল এই হত্যাকাণ্ডে, যিনি গত সিটি নির্বাচনের পর থেকেই রেলের সব টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি তাঁর দূর সম্পর্কের খালাতো ভাই সাঈদ মাহমুদ হিমেলের মাধ্যমে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। কিন্তু মামলায় এঁদের দুজনের কাউকেই আসামি করা হয়নি। বিভিন্ন সূত্র কালের কণ্ঠকে এসব তথ্য জানিয়েছে।

নিহত রাসেলের ভাই মনোয়ার হোসেন রনি বাদী হয়ে ১৭ জনকে আসামি করে মামলাটি করেছেন বুধবার রাতেই। ওই রাতেই পুলিশ এজাহারভুক্ত সাত আসামিকে গ্রেপ্তারও করেছে। নগর পুলিশের মুখপাত্র গোলাম রুহুল কুদ্দুস জানান, রাসেল খুনের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার আসামিদের মধ্যে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁরা হলেন নগরীর শিরোইল কলোনি এলাকার বুলবুল হোসেনের ছেলে রাব্বি (২৫), জয়নালের ছেলে মো. বাপ্পি (১৯), নূর মোহাম্মদ সরদারের ছেলে মো. শাহিন (২৪), মানিকের ছেলে মো. শুভ (২১), বাবু ইসলামের ছেলে চঞ্চল (১৯), জালাল উদ্দিনের ছেলে কালাম উদ্দিন (১৯) ও আবুল কালাম চৌধুরীর ছেলে মোজাহিদুল ইসলাম অভ্র (১৯)।

একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার চাপাচাপির কারণেই নিহতের পরিবার হিমেলকে মামলায় আসমি করতে পারেনি। তবে ঘটনার মূল হোতা তিনিই। ঢাকার কয়েকজন ঠিকাদারের সঙ্গে আঁতাত করে রেলওয়ের সরঞ্জাম শাখার মালপত্র নিলামের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করছিলেন এই হিমেল। আর এতে বাধা দিতে চেয়েছিলেন নগরীর বোয়ালিয়া থানা আওয়ামী লীগের (পূর্ব) সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন রাজা। এই রাজাও রেলের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণকারীদের একটি গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে সূত্র মতে, গত মঙ্গলবার পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের দপ্তর থেকে ছয়টি গ্রুপে ট্রেনের মালপত্র বিক্রির জন্য দরপত্র বাক্স খোলা হয়। ওই ছয়টি কাজও হিমেলের মাধ্যমে ঢাকার কয়েকজন ঠিকাদারকে পাইয়ে দেওয়া হয়। আর এ নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয় রাজার সঙ্গে। রাজা রেলওয়ের ঠিকাদার। তিনিও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করতেন আগে। পরের দিন বুধবারও অনুষ্ঠিত আরো ছয়টি কাজ পাইয়ে দিতেও তাঁরা প্রভাব সৃষ্টি করেন সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক বেলাল উদ্দিনের ওপর।

প্রত্যক্ষদর্শীরা নিশ্চিত করেছে, গত বুধবার আনোয়ার হোসেন রাজার ওপর হামলার সময় অন্তত ৩০-৪০ জন উপস্থিত ছিল। রাজাকে বাঁচাতে গিয়ে তাঁর ভাই সানোয়ার হোসেন রাসেল খুন হন। অন্যদিকে রাজার অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক। হামলায় যাঁরা অংশ নেন তাঁরা কেউই রেলের ঠিকাদার নন। এঁরা সবাই রাসিকের একজন কাউন্সিলরের দূর সম্পর্কের ভাই সাঈদ মাহমুদ হিমেলের ভাড়াটে সন্ত্রাসী। মঙ্গলবার হিমেল এঁদের নিয়েই সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের দপ্তরের সামনে গিয়ে ‘ভি’ চিহ্ন দিয়ে ছবি তুলেছিলেন।

রেলওয়ের কয়েকজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত সিটি নির্বাচনের পরে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে হিমেল টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে একক আধিপত্য গ্রহণ করেন খালাতো ভাই আওয়ামী লীগ নেতা ওই কাউন্সিলরের নাম ভাঙিয়ে। হিমেলকে দিনের অধিকাংশ সময় রাজশাহী রেল ভবনে দেখা যেত। তাঁর মাধ্যমেই টেন্ডারের নিয়ন্ত্রণ নেয় আওয়ামী লীগের একটি গ্রুপ। এ নিয়ে বিরোধ দেখা দেয় টেন্ডার নিয়ন্ত্রণকারী আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের অন্য গ্রুপগুলোর মধ্যে। আনোয়ার হোসেন রাজা এ রকম একটি গ্রুপের নেতা।

সূত্র মতে, হিমেলকে দিয়ে রেলওয়ের টেন্ডারের একক আধিপত্য গ্রহণ করায় রাসিকের ওই কাউন্সিলরকে নিয়ে সম্প্রতি ফেসবুকে ব্যাপক লেখালেখিও হতে থাকে। এরই মধ্যে বুধবার ঘটে যায় টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা।

মামলায় অন্য যাঁদের আসামি করা হয়েছে তাঁরা হলেন সাঈদ মাহমুদ হিমেলের সহযোগী সুজন হোসেন (৩০), তাঁর ভাই স্বপ্ন হোসেন (২৫) ও রিপন হোসেন (২৮), নগরীর শিরোইল বাস্তুহারা এলাকার টমটম জলিলের ছেলে কুলি বাবু (৩০), শিরোইল কলোনি এলাকার মৃত সাত্তারের ছেলে পেদু বাবু (৩২), শিরোইল বাস্তুহারা এলাকার আবু তাহেরের ছেলে ঠাণ্ডু (৩০), আরেক ব্যক্তির ছেলে জাহেদ (৪৫), কাদিরঞ্জ দরিখরবোনা এলাকার খালেকের ছেলে মৃদুল (৪০), ছোটবনগ্রাম ১২ রাস্তার মোড় এলাকার আসলাম শেখের ছেলে হিরু শেখ (৩০) ও শিরোইল কানার মোড় এলাকার বাবুর ছেলে কাসেম (৩৫)। এ ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় সাত-আটজনকে আসামি করা হয়েছে।

স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘রাজা ও তাঁর ভাই রাসেলসহ তাঁদের অনুসারীর সংখ্যা ছিল সাত-আটজন। আর তাঁদের ওপর হামলার সময় হিমেল গ্রুপের অন্তত ৩০-৪০ জন উপস্থিত ছিল। হামলাটি অনেকটা পূর্বপরিকল্পিত ছিল। না হলে কয়েকজনের হাতে ধারালো চাকু থাকবে কেন? হামলাকারীদের তিনজনের হাতে ছুরি ছিল। এঁরা তিনজন হলেন সুজন, পেদু বাবু ও স্বপন। এঁরাসহ আরো কয়েকজন মঙ্গলবার হিমেলের সঙ্গে ছবি তোলেন রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের দপ্তরের সামনে। কিন্তু মামলায় কেন হিমেলকে আসামি করা হলো না বুঝলাম না। হিমেলই এই ঘটনার নেপথ্যের মূল নায়ক।’

স্থানীয় আরেক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘যারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত তারা সবাই হিমেলের ভাড়াটিয়া ক্যাডার হিসেবে ছিল। এরা কেউ ঠিকাদার নয়। তারা সম্প্রতি ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে সহযোগিতা করে বলে শুনেছি।’

অন্যদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার এক ফেসবুক পোস্টে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও রাজশাহীর বাঘা-চারঘাটের এমপি শাহরিয়ার আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, ‘রাজশাহীতে টেন্ডারবাজি বন্ধ হতে হবে। আর যাঁরা মদদ দেন তাঁদেরকে মদদ দেওয়া বন্ধ করতে হবে, অনতিবিলম্বে। নেত্রীর বার্তা যদি আপনারা বুঝে না থাকেন, তাহলে তার পরিণতি আপনাদেরকেই ভোগ করতে হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা