kalerkantho

সোমবার । ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ১ পোষ ১৪২৬। ১৮ রবিউস সানি                         

গুম-খুনের কিনারা হয় না, উদ্বেগ আতঙ্ক

মাদক নির্মূলে পুলিশের জিরো টলারেন্স

কে এম সবুজ ঝালকাঠি ও মেহেদী হাসান জসীম, রাজাপুর   

১৫ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে




গুম-খুনের কিনারা হয় না, উদ্বেগ আতঙ্ক

খায়রুল মীর ২০১৭ সালের ৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে চা খাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়ে যান। ঝালকাঠির রাজাপুরে ওই ঘটনার পর দুই বছরের বেশি সময় পার হলেও ঘরে ফেরেননি এই যুবক। খোঁজ পেতে স্বজনরা মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে। কোনোই লাভ হয়নি। এমনকি রাজাপুর থানার পুলিশ এ ঘটনায় প্রথমে মামলা পর্যন্ত নিতে চায়নি।

চলতি বছরের মে মাসে ঝালকাঠি থেকে নিখোঁজ হন রাজাপুরের কৃষি ব্যাংক কর্মকর্তা ওয়াদুদ মৃধা (৬২)। অবসরের ২০ লাখ টাকা উত্তোলনের পর থেকেই তিনি নিখোঁজ হন। স্বজনদের দাবি, টাকার লোভে স্ত্রী জেসমিন বেগম তাঁকে হত্যা করে লাশ গুম করেছেন।

শুধু খায়রুল ও ওয়াদুদ মৃধা গুমের ঘটনা নয়, ঝালকাঠি জেলায় গত দুই বছরে ডজনখানেক হত্যাকাণ্ড, অর্ধশত ডাকাতি, শতাধিক চুরি ও অসংখ্য অপমৃত্যু ঘটনার বেশির ভাগই রহস্যাবৃত রয়ে গেছে। দু-একটি ছাড়া কোনো ঘটনারই কিনারা করতে পারেনি পুলিশ। ফলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জেলার সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে।

বছরের শুরুতেই ভাণ্ডারিয়া থানার নদমুলা গ্রামের মাদরাসাছাত্রী ধর্ষণ মামলার দুই আসামির গুলিবিদ্ধ লাশ রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। দুটি পরিবারেরই দাবি, রাকিব ও সজলকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষণ মামলার বাদীপক্ষ এই ঘটনা ঘটিয়েছে। চলতি বছরের ২৫ মার্চ রাজাপুর উপজেলার বড়ইয়া ইউনিয়নে মেহেদী হাসান শুভ (২৫) নামের এক কলেজছাত্রকে কুপিয়ে হাত-পা বিচ্ছিন্ন করে হত্যা করা হয়। এর আগে শুভ তাঁর সহপাঠী বড়ইয়া ডিগ্রি কলেজের ছাত্র সোহেল রানাকে পিটিয়ে হত্যা করেন। চলতি বছরের ৯ জুলাই ডাকাতের হামলায় নিহত হন উপজেলার দক্ষিণ রাজাপুর এলাকার গৃহকর্তা আব্দুল হক (৫৫)। এর আগে ৯ এপ্রিল সাউথপুর এলাকায় ফয়সাল গাজী (৩৫) নামের এক বালু শ্রমিককে হত্যা করে সহকর্মীরা।

এ ছাড়া ২০১৭ সালে উপজেলায় আরো দুটি চাঞ্চল্যকর হত্যার ঘটনা ঘটে। সিমা আক্তার (২৪) নামে পিরোজপুরের এক গৃহবধূকে রাজাপুরে বন্ধুর বাড়িতে এনে হত্যা করে লাশ ছয় টুকরা করে নদীতে ফেলে দেয় শ্বশুরবাড়ির লোকজন। এর আগে পিরোজপুরের মুক্তিযোদ্ধা আবদুস ছালাম খানকে (৬২) পিটিয়ে হত্যা করে রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ নেতা ও ইউপি সদস্য বাচ্চু ও তাঁর সহযোগীরা।

এ ছাড়া রাজাপুর উপজেলায় গত দুই বছরে বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ২০১৮ সালের ১৩ জানুয়ারি অনেকটা পূর্বঘোষণা দিয়ে থানা থেকে মাত্র ৪০০ মিটার দূরে এক প্রবাসীর বাড়িতে হানা দিয়ে ডাকাতরা অর্ধকোটি টাকার সম্পদ লুট করে। এ ঘটনায় মামলা হলেও পুলিশ রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি।

জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সর্বশেষ নিয়মিত সভা অনুষ্ঠিত হয় গত ১১ নভেম্বর সোমবার। জেলা প্রশাসক মো. জোহর আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় গত অক্টোবর মাসে জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। সভার তথ্য অনুযায়ী, জেলায় গত এক মাসে দুটি খুন, দুটি ধর্ষণ, ছয়টি নারী নির্যাতন, একটি শিশু নির্যাতন, একজন পুলিশ আক্রান্ত হওয়া, দুটি চুরি ছাড়াও অস্ত্র আইনে একটি, বিস্ফোরক আইনে একটি এবং মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে ২৪টি ও অন্যান্য ৩৪টি মামলা দায়ের হয়েছে। একই মাসে আদালতের নির্দেশে মামলা দায়ের হয়েছে দুটি। এ নিয়ে জেলায় এক মাসে দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা ৭৬।

তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থান এবং স্থানীয় জনগণের সচেতনতার সুবাদে একসময়ে মাদকের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত ঝালকাঠি জেলায় মাদক এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। জেলায় ১৭১ জন মাদক কারবারি ও সেবনকারী পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। অর্ধশতাধিক মাদকসেবী ও বিক্রেতাকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। এ ছাড়া কিশোর গ্যাং রোধে কার্যকর পদক্ষেপ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে বখাটের আড্ডা এবং রাতে পার্কে শিক্ষার্থীদের আড্ডা বন্ধ করেছে পুলিশ।

পুলিশ সুপার ফাতিহা ইয়াসমিন বলেন, ‘মাদক বিষয়ে আমরা জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছি। জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেক ভালো। এখানে কোনো রাজনৈতিক সহিংসতা নেই। হত্যা ও গুমের মামলাগুলো গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। আত্মসমর্পণকারী মাদক কারবারি ও সেবনকারীদের নিয়ে একটি সমাজকল্যাণমূলক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের ঋণ সহায়তাসহ নানা ধরনের সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা