kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

চাঁদপুর ও হবিগঞ্জের গ্রামে গ্রামে কান্না

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চাঁদপুর ও হবিগঞ্জের গ্রামে গ্রামে কান্না

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ট্রেন দুর্ঘটনায় চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের নিহত মজিবুর দম্পতির পরিবারে চলছে মাতম। ছবি : কালের কণ্ঠ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় গত সোমবার দিবাগত রাতের ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে বেশির ভাগের বাড়ি হবিগঞ্জে। তারা শায়েস্তাগঞ্জ স্টেশন থেকে উঠেছিল দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেন উদয়ন এক্সপ্রেসের ‘ঝ’ বগিতে। আর দুর্ঘটনায় এই বগিটিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্বজনদের হারিয়ে হবিগঞ্জের ঘরে ঘরে চলছে মাতম। স্বজনহারাদের কান্না ছুঁয়ে গেছে চাঁদপুরকেও। এই জেলার এক দম্পতিসহ তিনজন এ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন।

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সদর উপজেলার বহুলা গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা আলমগীর আলম একমাত্র ছেলে ইয়াসিন আলম আরাফাতকে নিয়ে চট্টগ্রাম রওনা হয়েছিলেন। উদ্দেশ্য, সন্তানকে সাগর ও বন্দরনগরের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান দেখানো। উদয়ন এক্সপ্রেসের ‘ঝ’ বগিতে ছিল তাদের আসন। গভীর রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার মন্দভাগ এলাকায় ট্রেনটি আসার পর বিকট শব্দ শুনতে পান তিনি। এরপর আর কিছু জানেন না আলমগীর। খবর পেয়ে কসবা হাসপাতাল থেকে আহত অবস্থায় তাঁকে নিয়ে আসা হয় হবিগঞ্জ আধুনিক সদর হাসপাতালে। তখনো তিনি জানতে পারেননি যে প্রাণপ্রিয় সন্তান আর বেঁচে নেই।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে বহুলা গ্রামে ইয়াসিন আলমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। মা হাসিনা আক্তার সুমী সন্তানের লাশ আনতে ছুটে যান দুর্ঘটনাস্থলে। আহত বাবা বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন। বড় বোন ঝিনুক এবার জেএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। একমাত্র ভাইয়ের মৃৃত্যুতে সেও অঝোরে কাঁদছে। ইয়াসিন ছিল বহুলা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। ছুটে এসেছে স্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। বাড়িটিতে ভিড় জমিয়েছে আরো হাজারো মানুষ। পুরো গ্রামে শোকের ছায়া।

এদিকে হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি আলী মো. ইউসুফ সরকারি বৃন্দাবন কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করে লিটল ফ্লাওয়ার কিন্ডারগার্টেন নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর স্ত্রী ও এক বছরের সন্তান থাকে চট্টগ্রামে। তাদের দেখতে তিনি চটগ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে ফিরে আসতে হলো লাশ হয়ে।

গত সোমবার গভীর রাতের ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহতদের বেশির ভাগের বাড়ি হবিগঞ্জে। কেউ যাচ্ছিল কক্সবাজারে। কেউবা বেড়াতে। হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ রেলস্টেশন থেকেই এসব যাত্রী উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনের ‘ঝ’ বগিতে উঠেছিল। আর দুর্ঘটনায় এই বগির যাত্রীরাই বেশি হতাহত হয়েছে। শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার সাইফুল ইসলাম জানান, এখান থেকে কুমিল্লা, ফেনী, লাকসাম ও চট্টগ্রাম গন্তব্যে ১০০ যাত্রী টিকিট কাটে। এর মাঝে আসন ছিল ৫০টি। বাকিরা দাঁড়ানো ছিল।

দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে আরো রয়েছে বানিয়াচং উপজেলার মুরাদপুর গ্রামের আইয়ূব হোসেনের ছেলে আল-আমিন (৩৫) ও টাম্মুলিটুলা মহল্লার সোহেল মিয়ার শিশু কন্যা আদিবা খাতুন (২)। সোহেল ও নাজমা বেগম চট্টগ্রামে গার্মেন্টে কাজ করেন। বাড়িতে বেড়ানো শেষে তাঁরা আদিবা ও দুই ছেলে সন্তানকে নিয়ে কর্মস্থলে ফিরছিলেন। সোহেল ও নাজমা আহত অবস্থায় হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

চুনারুঘাট প্রতিনিধি জানান, চুনারুঘাট থেকে চার বন্ধু মিলে কক্সবাজার বেড়াতে যাওয়ার পথে ট্রেন দুর্ঘটনায় দুই বন্ধু লাশ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তাঁরা হলেন পীরেরগাঁও গ্রামের আব্দুল হাসিমের ছেলে সুজন মিয়া (২৫) ও উলুকান্দি পশ্চিম তালুকদার বাড়ির ফটিক মিয়ার ছেলে রুবেল (২২)। অন্য দুই বন্ধু আমরুট বনগাঁও গ্রামের ফ্রান্সপ্রবাসী জনি মিয়া সিলেটে ও পাইকপাড়া গ্রামের ফরিদ মিয়ার ছেলে রাজন মিয়া ঢাকায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। একই দুর্ঘটনায় উপজেলার আহম্মদাবাদ ইউনিয়নের পিয়ারা বেগম (৪৫) নিহত হন। নিহতদের বাড়িতে চলছে মাতম।

লাশ হয়ে ফিরলেন চাঁদপুরের তিনজন

চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, কসবার মন্দভাগে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় অন্যদের সঙ্গে চাঁদপুরের এক দম্পতিসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। এ সময় তাঁদের সঙ্গে থাকা পরিবারের অন্য সাত সদস্য আহত হয়। নিহত দম্পতি হলেন হাজীগঞ্জ উপজেলার রাজারগাঁও গ্রামের মজিবুর রহমান (৫৫) ও তাঁর স্ত্রী জেসমিন বেগম (৪৫)। গতকাল সন্ধ্যায় দুজনের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে।

নিহত অন্যজন গৃহবধূ ফারজানা আক্তারের (১৮) বাড়ি চাঁদপুর শহরের নাজিরপাড়ায়। তিনি মোহন দেওয়ানের স্ত্রী। তাঁরা ট্রেনে সিলেট থেকে লাকসামে যাচ্ছিলেন। পরে সেখান থেকে চাঁদপুরে গ্রামের বাড়িতে ফেরার কথা ছিল। গতকাল বিকেলে ফারজানার মরদেহ চাঁদপুরে পৌঁছে। তাঁর বাবার বাড়ি সদর উপজেলার উত্তর বালিয়া গ্রামে। বাবা বিল্লাল ব্যাপারী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ফারজানা ওর মা, নানা-নানু, মামি ও ছোট ভাই-বোনদের সঙ্গে সিলেটে বেড়াতে গিয়ে ফেরার পথে দুর্ঘটনায় পড়ে।

নিহত দম্পতির বাড়িতে মাতম

হাজীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত মজিবুর-জেসমিন দম্পতির তিন ছেলে রয়েছে। সরেজমিনে গতকাল দুপুরে তাঁদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় স্বজনরা আহাজারি করছে। ছোট ছেলে ইয়াসিন কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘বাবা শ্রীমঙ্গল স্টেশন বাজারে হার্ডওয়ারের ব্যবসা করতেন। মা কিছুদিন আগে বাবার কাছে বেড়াতে যান। আজ (মঙ্গলবার) সকালে মা-বাবার বাড়িতে এসে পৌঁছার কথা ছিল। গত রাত সাড়ে ৯টায় তাঁদের সঙ্গে আমার সর্ব শেষ কথা হয়। শ্রীমঙ্গল থেকে ট্রেনে রওনা হওয়ার পর আমাকে ফোন দেন। রাত সাড়ে ৩টার দিকে ফোনে খবর পাই যে ট্রেন দুর্ঘটনায় বাবা-মা মারা গেছেন।’

নিহত জেসমিনের ছোট বোনের স্বামী আলী মুন্সী বলেন, ‘রাত সাড়ে ৩টার দিকে আমরা দুর্ঘটনাসংশ্লিষ্ট এলাকার থানা থেকে খবর পাই যে ভাই আর আপা মারা গেছেন। ভোরেই তাঁর দুই ছেলে কাউসার আর সবুজ ঢাকা থেকে ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় যায়।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা