kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

কৃষকের কোমর ভেঙে দিয়েছে বুলবুল

রফিকুল ইসলাম, বরগুনার নিশানবাড়িয়া থেকে   

১২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কৃষকের কোমর ভেঙে দিয়েছে বুলবুল

রবিবার ভোর ৬টা। প্রচণ্ড ঝোড়ো হাওয়া। উপকূলীয় জেলা বরগুনার রাস্তাঘাট তখনো যানবাহনহীন। অনেক অনুরোধের পর বরগুনা পৌরসভা লাগোয়া চা দোকানি ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলের ব্যবস্থা করে দিলেন। তবে গন্তব্য নিশানবাড়িয়া শুনে চালক রাজু আহমেদ অপারগতা প্রকাশ করেন। ‘যতদূর যাওয়া সম্ভব, ততটা যাবেন’—এমন শর্তে রাজু রাজি হন। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে আমাদের মোটরবাইক ছুটে চলছে। গন্তব্যে যেতে অন্তত ২৭ কিলোমিটার পাড়ি দিতে হবে। কয়েক কিলোমিটার গিয়েই থমকে যেতে হলো। এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে চলা রাস্তার ওপর গাছ পড়ে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। ওই রাস্তার দুই ধারে তখন কৃষকদের  জটলা চোখে পড়ে। তাদের ডেকে গাছ অপসারণ করানো হয়।

পরিচয় জানার পর কৃষকরা বললেন, ঘূর্ণিঝড় বুলবুল তাদের কোমর ভেঙে দিয়েছে। কিভাবে? তার ব্যাখ্যা দিলেন রাস্তার পাশের ক্ষেত দেদখিয়ে। কৃষকরা বললেন, টানা বৃষ্টি আর ঝোড়ো বাতাসে আধাপাকা ধানক্ষেতে প্রকৃতি মই দিয়ে দিয়েছে। তাই ধানগুলো নুয়ে আছে। পানি অপসারণের সঙ্গে সঙ্গে ধান মাটিতে লুটিয়ে পড়বে। কাঙ্ক্ষিত ফলন দূরের কথা, পুরো ধানে চিটা পড়বে।

পিচঢালা পথ বেয়ে মোটরবাইক ছুটে চলছে। প্রচণ্ড ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে হালকা ভারি বৃষ্টি হচ্ছে।

রাস্তার ওপর শুয়ে পড়া গাছ সরিয়ে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলছি। পথে নলটোনা ইউনিয়নের গাজী মাহমুদ গ্রামের কৃষক সেলিম শাহ নেওয়াজের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানালেন, প্রায় পাঁচ একর জমিতে ইরি আর আমনের চাষ করেছেন। একরপ্রতি চাষাবাদ তিন হাজার,

রোপণে পাঁচ হাজার এবং তিন হাজার টাকার কীটনাশক ছিটিয়েছেন। একরপ্রতি প্রায় ৬০ মণ ফসল পাওয়ার কথা। যেটা ক্ষেত থেকে সংগ্রহ করতে ১৫ জন শ্রমিককে জনপ্রতি গড়ে ৬০০ টাকা দিতে হবে। ধানের মণ কম করে ৫০০ টাকা হলেও একরপ্রতি তাঁর খরচ শেষে ১০ হাজার টাকা আয় হতো। কিন্তু বুলবুলের প্রভাবে তাঁর খরচের পুরো টাকাটাই জলে গেল।

নলটোনার ইউপি সদস্য আবু হানিফ। তিনিও কৃষির সঙ্গে জড়িত। চলতি মৌসুমে তিনি প্রায় ছয় একর জমিতে ইরি আর আমন আবাদ করেছেন। আগাম ফসল ইরি৫২ কয়েক দিনের মধ্যে ঘরে তোলার কথা। কিন্তু ঝোড়ো বাতাসের সঙ্গে টানা বর্ষণে ধান মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে ধানে চিটা পড়বে।

সিপিপি নলটোনা ইউনিয়ন শাখার টিম লিডার ইদ্রিসুল আলম। তাঁর বাড়ি দক্ষিণ গর্জনবুনিয়া। তিনিও কৃষির সঙ্গে জড়িত। জানালেন, প্রায় দেড় একর জমিতে ধান চাষাবাদ করেছেন। এ পর্যন্ত প্রায় ২২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু বুলবুলের প্রভাবে পাকা ধানের শীষ নুয়ে পড়েছে। এই ফলন ঘরে তোলা সম্ভব হবে না।

কৃষকদের সঙ্গে স্টেশনে কথা বলতে বলতে কখন গাছ সরিয়ে আমাদের বাইক বিষখালী নদীর তীরবর্তী নিশানবাড়িয়া এসে পৌঁছল তা টের পেলাম দুপুর ২টার দিকে। যখন বিশাল বিশাল ঢেউ এসে আছড়ে পড়ল নিশানবাড়িয়া খেয়াঘাটে। প্রচণ্ড ঝোড়ো বাতাস আর ঢেউয়ের তাণ্ডবে ঘাটটিই চলে গেছে বিষখালীর পেটে।

বিষখালীর অন্য প্রান্তেই সাগরতীরের উপজেলা পাথরঘাটা। কালমেঘা সেখানকার একটি ইউনিয়ন। পূর্ব কালমেঘা গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর হোসেন ৩৫ একর জমিতে ধান চাষ করেছেন। তিনি বলেন, এবার আমন চাষ নির্ধারিত সময়ের অন্তত ২০ দিন পরে হয়েছে। তাই বুলবুলে ক্ষতির পরিমাণ কম হবে। তার পরও প্রায় অর্ধেক ধান অপরিপক্ব অবস্থায় আছে। বাতাসের কারণে ধানে চিটা দেখা দেবে। তা ছাড়া কৃষি পঞ্জিকা মতে রবি মৌসুম প্রায় এক মাস আগেই শুরু হয়েছে। কিন্তু বুলবুলের প্রভাবে ক্ষেতে পানি জমে আছে। সেই পানি  অপসারণের পর খেসারি ডাল চাষ শুরু করতে হবে। যখন শুরু হবে তখন আবহাওয়া অনুকূলে থাকবে না। এর  প্রভাবে ফলন কমে যাবে।

কৃষি নিয়ে কাজ করে বেসরকারি সংস্থা ডোকাপ। সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মাসুদ আলম বলেন, দক্ষিণাঞ্চলে বেশ কয়েক বছর ধরে জমিতে দুই মৌসুমে ধান চাষ করা হয়। বোরো মৌসুমের শেষে রোপা আমনের চাষ করা হয়। রোপা আমনে মাত্র ফলন শুরু হয়েছে। এ অবস্থায় ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানায় ফলন বাধাগ্রস্ত হবে। এ ছাড়া একফসলি জমির আমন পরিপক্ব হতে শুরু করেছিল। এসব ধানের অর্ধেক চিটায় পরিণত হবে। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহনশীল জাতের ধান চাষ করতে সরকারের কৃষি বিভাগের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

বরগুনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মতিউর রহমান বলেন, জেলায় ৯৮ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। দেরিতে আমন চাষ হওয়ায় প্রায় ২০ শতাংশ ফ্লায়রিং পর্যায়ে রয়েছে। তবে বুলবুলের প্রভাবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে মাত্র ১০ শতাংশ অর্থাৎ ৯৮০ হেক্টর জমির আমন ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে আমন ক্ষেতে প্রচুর পানি রয়েছে। সেই পানি অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত রবি মৌসুমের ফসল বোনা সম্ভব হচ্ছে না। এতে রবি ফসলের কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্র অর্জনে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, বরগুনায় ঘূর্ণিঝড়ে কৃষিতে যে ক্ষতি হয়েছে সেসব এলাকায় জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে তালিকা প্রস্তুত করে সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক সাহায্য-সহযোগিতা করা হবে।

বিদ্যুৎ নেই : এদিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় পুরো বরগুনা শনিবার থেকেই অন্ধকারে রয়েছে। কবে নাগাদ আলো জ্বলবে তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। পটুয়াখালীর মীর্জাগঞ্জ উপজেলার সুবিদখালী ইউনিয়নের চরখালীর ভেতর দিয়ে চলে গেছে বরিশাল-বরগুনা সড়ক। ওই সড়কের পাশেই সমবায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এর বিপরীত পাশে বৈদ্যুতিক খুঁটি মাঝ বরাবর ভেঙে গেছে। এর কিছু দূরেই সুবিদখালী ইউনিয়নের কিসমত শৈলবুনিয়া গ্রামে বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় বরফ তৈরি করা যাচ্ছে না। তাই পানির দরে মাইকিং করে বরগুনা মাছ বাজারে রবিবার রাতে পোয়া মাছ বিক্রি হয়েছে।

বরগুনার মাছ ব্যবসায়ী ইদ্রিস শরীফ কালের কণ্ঠকে বলেন, বিষখালী আর পায়রা নদী থেকে জেলেরা দুর্যোগের মধ্যেও রবিবার প্রায় দেড় মণ পোয়া মাছ শিকার করেছেন। সেই মাছ বাজারে ওঠানো হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকার পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ থাকায় মাইকিং করে ৫০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়েছে।

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সুবিদখালী ইউনিটের ইনচার্জ মো. কামরুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ইউনিয়নের অন্তত ১৭টি বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে গেছে। তাই বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। শনিবার সকাল থেকেই তাঁরা মেরামত কাজ শুরু করেছেন। খুব তাড়াতাড়ি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা