kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ওআইসির মামলা আইসিজেতে

রোহিঙ্গা ইস্যুতে ২০ দফা প্রস্তাব উঠছে জাতিসংঘে

মেহেদী হাসান   

১২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ওআইসির মামলা আইসিজেতে

‘জেনোসাইড’ প্রতিরোধবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ লঙ্ঘনের অভিযোগে অবশেষে ‘ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজে)’ মামলা হয়েছে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে। ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পক্ষে গাম্বিয়া গতকাল সোমবার নেদারল্যান্ডসের হেগে ওই মামলা করেছে। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রাখাইন রাজ্যে জেনোসাইডের উদ্দেশ্যে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ এবং সম্প্রদায়গুলোকে ধ্বংস করার অভিযোগ আনা হয়েছে ৪৬ পৃষ্ঠার আবেদনে। আগামী ডিসেম্বর মাসে ওই মামলার প্রাথমিক শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।

এদিকে হেগে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতেও (আইসিসি) রোহিঙ্গাদের গণবাস্তুচ্যুতির কারণ অনুসন্ধানের লক্ষ্যে পূর্ণ তদন্ত শুরু করার জন্য কৌঁসুলির আবেদন বিবেচনাধীন।

এ ছাড়া রোহিঙ্গা সংকট ও মিয়ানমার পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে ২০ দফা প্রস্তাব আনছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং ওআইসির সদস্য দেশগুলো। আগামী বৃহস্পতিবার প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা আছে।

একাধিক কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, আইসিজে ওই মামলা আমলে নিলে তা হবে নজিরবিহীন এক ঘটনা। কারণ জাতিসংঘের ওই আদালত সাধারণত জেনোসাইডসংক্রান্ত কোনো মামলা নেয় না, বরং আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে কাজ করে। তবে জেনোসাইড (বাংলায় গণহত্যা হিসেবে প্রচলিত) প্রতিরোধবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ লঙ্ঘনের অভিযোগে ওই আদালতে মিয়ানমারের জবাবদিহির সুযোগ আছে। মিয়ানমার আইসিসির সদস্য না হলেও আইসিজের সদস্য। জেনোসাইড প্রতিরোধবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে জেনোসাইড ঠেকাতে মিয়ানমার বাধ্য। কিন্তু জেনোসাইড ঠেকাতে ভূমিকা রাখার বদলে উল্টো নিজেই জেনোসাইড ঘটিয়েছে বলে জোরালো অভিযোগ উঠেছে।

মামলার আবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমার ভূখণ্ডে রোহিঙ্গাদের ধ্বংস করতে জেনোসাইডসংক্রান্ত অপরাধ অব্যাহত আছে। এগুলো ঠেকাতে মিয়ানমারের যে কোনো আগ্রহ নেই, তা অত্যন্ত স্পষ্ট।

রোহিঙ্গা জেনোসাইডের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আইসিসি ও আইসিজে কিভাবে ভূমিকা রাখতে পারে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কূটনীতিক বলেন, আইসিসি ব্যক্তিবিশেষের বিচার করতে পারে। অন্যদিকে আইসিজে রাষ্ট্র হিসেবে মিয়ানমারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখতে পারে।

মিয়ানমারকে আইসিজেতে নেওয়ার বিষয়ে গাম্বিয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের আন্তর্জাতিক বিচার বিষয়ক পরিচালক পরম-প্রিত সিং বলেন, আদালতের দ্রুত উদ্যোগ মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান নিপীড়ন বন্ধ করতে সহায়ক হতে পারে।

রোহিঙ্গা সংকট ও মিয়ানমার পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে আগামী বৃহস্পতিবার ২০ দফা প্রস্তাব আনছে ইইউ এবং ওআইসির সদস্য দেশগুলো। এর আগে ২০১৭ ও ২০১৮ সালেও ইইউ এবং ওআইসি যৌথভাবে সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে প্রস্তাব এনেছিল এবং তা ব্যাপক সমর্থনও পেয়েছিল। এবারের প্রস্তাবটিও সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে গৃহীত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকরা।

এদিকে বরাবরের মতো এবারও প্রস্তাবটির পক্ষে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে বাংলাদেশ। নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে গতকাল এক কূটনৈতিক ব্রিফিংয়ে হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী রোহিঙ্গা ও মিয়ানমার ইস্যুতে প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন প্রত্যাশা করেন।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, এবারের প্রস্তাবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য ছাড়াও রাখাইন, কাচিন, শানসহ বিভিন্ন স্থানে মানবাধিকার লঙ্ঘনে গভীর উদ্বেগ ও নিন্দা জানানো হয়েছে। মিয়ানমারে নারী ও শিশুদের ওপর যৌন ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতাসহ সব ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের আন্তর্জাতিক, স্বাধীন, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান জানানো হয়েছে প্রস্তাবে। রাখাইনসহ বিভিন্ন রাজ্যে মানবিক সহায়তা কর্মীদের ওপর ক্রমবর্ধমান বিধি-নিষেধের বিষয়েও গভীর উদ্বেগ জানানো হয়েছে।

এবারের প্রস্তাবে জাতিসংঘকে মিয়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তকাঠামোকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ছাড়া তদন্তকাঠামোকে দ্রুত কাজ এগিয়ে নিতে আহ্বান জানানো হয়েছে। এর বাইরে মিয়ানমার গঠিত তদন্ত কমিশনের প্রতি স্বাধীন, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে প্রতিবেদন দেওয়ার আহ্বান রয়েছে প্রস্তাবে।

মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, নাগরিকত্বহীনতা দূরীকরণসহ সংকট নিরসনের সুস্পষ্ট রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখানোর আহ্বান জানানো হয়েছে প্রস্তাবে। এ ছাড়া রোহিঙ্গা মুসলমানসহ অন্যান্য সংখ্যালঘুর প্রতি বৈষম্য বন্ধ করে সবার নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মিয়ানমারকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

মিয়ানমারকে আনান কমিশনের সুপারিশগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করার আহ্বান রয়েছে প্রস্তাবে। এ ছাড়া রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রতি সহযোগিতা বাড়াতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানানো হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা