kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

কালের কণ্ঠ’র গোলটেবিল আলোচনা

ইস্পাতশিল্পের প্রসারে শুল্ক কর ছাড়ের আশ্বাস

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ইস্পাতশিল্পের প্রসারে শুল্ক কর ছাড়ের আশ্বাস

ইস্পাতশিল্পের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কালের কণ্ঠ ও এসএসআরএম আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় আমন্ত্রিত অতিথিরা। গতকাল ইডাব্লিউএমজিএলের সম্মেলনকক্ষে এই গোলটেবিল আয়োজন করা হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

দেশীয় শিল্প হিসেবে স্টিল বা ইস্পাতশিল্পের সুরক্ষা ও বিকাশে ৩ শতাংশ অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন ইস্পাত ও রডশিল্প উদ্যোক্তারা। তাঁদের দাবি, নির্মাণসামগ্রী ও উপকরণ তৈরিতে বর্তমানে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং বাড়তি শুল্ক-করের বোঝা না চাপানো হলে এই শিল্পকে আরো অনেক দূর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। কালের কণ্ঠ আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় উদ্যোক্তাদের এসব দাবির প্রেক্ষাপটে বৈঠকেই সরকারের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিরা ইস্পাতশিল্পের প্রসারে শুল্ক ও কর ছাড়ের আশ্বাস দেন।

গতকাল শনিবার রাজধানীর বসুন্ধরায় ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের (ইডাব্লিউএমজিএল) সম্মেলনকক্ষে ‘স্টিল/ইস্পাতশিল্পের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এই গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করা হয়। এতে পৃষ্ঠপোষকতা করে শাহরিয়ার স্টিল মিলস লিমিটেড।

কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলনের সঞ্চালনায় এই আলোচনায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। বিশেষ অতিথি ছিলেন অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব অরিজিৎ চৌধুরী।

গোলটেবিল আলোচনায় ইস্পাতশিল্পের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে বক্তারা বলেন, সরকারের মেগা প্রকল্প ও আবাসন খাতের ওপর ভর করে প্রতিনিয়ত বাড়ছে ইস্পাতসামগ্রীর চাহিদা। এই চাহিদা মেটাতে এরই মধ্যে গড়ে উঠেছে তিন শতাধিক রি-রোলিং মিলস। এসব মিলের উৎপাদনক্ষমতা বছরে ৫৫ লাখ মেট্রিক টন।

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, ‘একটা দেশের উন্নয়ন বিবেচনা করা হয় সে দেশের স্টিল ব্যবহারের ওপর। যে দেশ যত বেশি স্টিল ব্যবহার করে, তারা তত বেশি উন্নত। সেদিক থেকে আমরাও অনেক এগিয়েছি। এই খাতকে যতটা সম্ভব সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘দেশে মাথাপিছু স্টিলের চাহিদা ৪৫ কেজি। এদিক থেকে আশপাশের অনেক দেশের চেয়েও আমরা ভালো অবস্থানে আছি। পাকিস্তানের চেয়েও স্টিল ব্যবহারে আমরা এগিয়ে আছি।’

কালের কণ্ঠ সম্পাদক ও ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পরিচালক ইমদাদুল হক মিলন বলেন, ‘গত ১৫ বছরে আমরা লক্ষ করেছি দেশের স্টিলশিল্প অনেক দূর এগিয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনায় জানতে পেরেছি, এই শিল্পকে ঘিরে অনেক সমস্যা রয়েছে। আমার বিশ্বাস এই সমস্যার ভালো সমাধান করতে পারলে, এই শিল্পটি দেশের জন্য খুব বড় সুফল বয়ে আনবে।’

কালের কণ্ঠ’র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোস্তফা কামাল বলেন, ‘স্টিল এমন একটা শিল্প, যেটা মানুষের মেরুদণ্ডের মতো। যেকোনো ইমারত নির্মাণ করতে হলে স্টিল ছাড়া সম্ভব নয়। একটি ইমারতকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করায় স্টিল। কাজেই দেশের এই শিল্পকে অবহেলা করলে চলবে না। এই শিল্পের বিদ্যমান সমস্যাকে চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে।’

এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘স্টিলশিল্পে ভ্যাটে বিশেষ হার নির্ধারণ করা হয়েছে। খুচরা বিক্রয়ের ক্ষেত্রেও ভ্যাট কমিয়েছি। কিন্তু এখনো জাহাজ ভাঙা ও স্থানীয় স্ক্র্যাপ নিয়ে কিছু সমস্যা আছে। আমি আশা করছি এ বিষয়টির সমাধান করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘গত বছর যেকোনো জোগানের ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর ৭.৫ শতাংশ ছিল। এ বছর অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে একই আছে। রডের ক্ষেত্রে ৩ শতাংশ করে দেওয়া হয়েছে। আপনারা বলেছেন নন-রিফান্ডেবল করে দেওয়াতে ক্ষতি হচ্ছে। এটা আবার স্ক্র্যাপের ক্ষেত্রে পড়ে গিয়েছে। আমরা এই দুইটি বিবেচনা করব।’

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব অরিজিৎ চৌধুরী বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্টিল ইন্ডাস্ট্রির মতো বড় বড় শিল্পগুলোকে কিভাবে সাহায্য করা যায় তা নিয়ে আমরা কাজ করছি। এ জন্য সরকার অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা বন্ড মার্কেট নিয়েও কাজ করছি। বড় বড় সেক্টরগুলোকে পুঁজিবাজার থেকে সাপোর্ট দেওয়া যায় কি না, আর্থিক সহায়তা করা যায় কি না সেটার উদ্যোগও আমরা নিচ্ছি।’

শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নারায়ণ চন্দ্র দেবনাথ বলেন, ‘আমাদের মানবসম্পদের কোনো ঘাটতি নেই। এটিকে কিভাবে ব্যবহার করবেন তা ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভর করে। আর তার ওপর নির্ভর করে শিল্প খাত কতটুকু এগোবে।’

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমাদের শিল্পে এ বছর ভ্যাট-ট্যাক্স মিলে ৬৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। এটা কিছুটা কমানো হয়েছে। এখনো সহনীয় পর্যায়ে আসেনি।’

বাংলাদেশ রি-রোলিং মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. মাহবুবুর রশিদ জুয়েল বলেন, ‘এবারের বাজেটে প্রধান সমস্যা ছিল ভ্যাট ও ট্যাক্স নিয়ে। তার মধ্যে এআইটি (অগ্রিম আয়কর) একটি বড় সমস্যা। এনবিআরের সঙ্গে এ ব্যাপার আলোচনা হয়েছে। কাঙ্ক্ষিত কোনো সুফল আসেনি।’

শাহরিয়ার স্টিল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মাসাদুল আলম মাসুদ বলেন, ‘এবার বাজেটে ইস্পাতশিল্প অস্থিরতায় পড়ে। এখনো সমস্যা আছে। শিল্পের স্বার্থে এগুলো সমাধান করা উচিত।’

গোলটেবিল আলোচনায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মুহম্মদ শহীদ উল্লাহ, আবাসন খাতের শীর্ষ সংগঠন রিহ্যাবের সহসভাপতি (এক) লিয়াকত আলী, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সহসভাপতি ও এনার্জিপ্যাকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন রশিদ, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (উৎপাদন) সাঈদ আহমেদ, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন্ন) প্রকৌশলী মো. আব্দুল ওহাব তালুকদার, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ম্যাটেরিয়ালস অ্যান্ড মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং (এমএমই) বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ফাহমিদা গুলশান, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বুয়েটের শিক্ষক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন, পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসেন, বিএসটিআইয়ের পরিচালক (সিএম) প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদুল বারী, উপপরিচালক (সিএম) মো. রিয়াজুল হক, বাংলাদেশ স্ক্র্যাপ অ্যান্ড আয়রন সাপ্লায়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শেখ আজহার হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক মো. ওসমান গণি ভূঁইয়া, বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইকেলিং অ্যাসোসিয়েশন সদস্য মাস্টার আবদুল কাসেম, রানী রি-রোলিং মিলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. সুমন চৌধুরী, ম্যাগনাম স্টিল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির এইচ চৌধুরী প্রমুখ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা