kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য

খালেদও ঘুষ দিয়েছেন কে কী চায় চোখ দেখেই বোঝেন জি কে শামীম

ওমর ফারুক   

৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



খালেদও ঘুষ দিয়েছেন কে কী চায় চোখ দেখেই বোঝেন জি কে শামীম

যাঁর চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে রাজধানীর কয়েকটি এলাকার মানুষ আতঙ্কে থাকত, সেই খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকেও কাজ পেতে ঘুষ দিতে হয়েছে গণপূর্তের প্রকৌশলীদের। অন্যদিকে দাপুটে ঠিকাদার জি কে শামীম মানুষের চোখ দেখলেই বুঝতে পারেন কে কী চায়, বোঝেন কাকে কী দিলে কাজ বাগিয়ে নিতে পারবেন। এ দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন একজন কর্মকর্তার কাছ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখা যুবলীগের বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গত ১৮ সেপ্টেম্বর গুলশানের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায় অবৈধ ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান চালায় র‌্যাব। তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক, মানি লন্ডারিং ও দুর্নীতির মামলা করা হয়েছে। ২৮ সেপ্টেম্বর অস্ত্র ও মাদক আইনের দুই মামলায় তাঁকে ১০ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। এরপর তাঁর মামলার তদন্তভার পায় র‌্যাব। র‌্যাব তাঁকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। পরে মানি লন্ডারিং আইনে করা মামলায় খালেদকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গত ২৩ অক্টোবর তাঁকে সাত দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। খিলগাঁও থানার একটি হত্যা মামলায় খালেদকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পিবিআই।

অন্যদিকে ২০ সেপ্টেম্বর গুলশানের নিকেতন থেকে গ্রেপ্তার করা হয় যুবলীগ নেতা পরিচয় দেওয়া ঠিকাদার এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমকে। এরপর তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান জিকে বিল্ডার্সের কার্যালয়ে অভিযান চালায় র‌্যাব। তাঁর বিরুদ্ধেও মাদক, অস্ত্র, মানি লন্ডারিং ও দুর্নীতির মামলা হয়েছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর শামীমকে অস্ত্র ও মাদক মামলায় ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। পরে মানি লন্ডারিং আইনে তাঁকে চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়।

এরই মধ্যে খালেদ ও শামীমের বিরুদ্ধে করা অস্ত্র মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ দুর্নীতির মামলায় সাত দিন করে রিমান্ড শেষে গত ৭ নভেম্বর তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গত ২১ অক্টোবর শামীম ও তাঁর মা আয়েশা আক্তারের বিরুদ্ধে ২৯৭ কোটি আট লাখ ৯৯ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একই দিন খালেদের বিরুদ্ধে পাঁচ কোটি ৫৮ লাখ ১৫ হাজার ৮৫৯ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলা করে দুদক। এ মামলায় তাঁদের ২৭ অক্টোবর রিমান্ডে নেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া রাজধানীর মতিঝিল, আরামবাগ, ফকিরাপুল, কমলাপুর, রামপুরা এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। তিনি শাহজাহানপুর এলাকায় গণপরিবহন থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করতেন। শাহজাহানপুর ও কমলাপুর পশুর হাট নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি খিলগাঁও লেভেলক্রসিংয়ে বসা মাছের হাট থেকে চাঁদা আদায় করতেন তিনি। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ঢাকা সিটি করপোরেশন, ক্রীড়া পরিষদ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, যুব ভবন, কৃষি ভবন, ওয়াসার ফকিরাপুল জোনসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করত খালেদের ‘ভূঁইয়া অ্যান্ড ভূঁইয়া’ নামের প্রতিষ্ঠান।

খালেদকে রিমান্ডে নিয়ে তাঁর চাঁদাবাজি, অবৈধ অর্থের উৎস জানতে চাওয়া হয়। এ সময় খালেদ জিজ্ঞাসাবাদকারী কর্মকর্তাকে জানান, রাজধানীর খিলক্ষেতের কুড়িল থেকে পূর্বাচলের দিকে যাওয়া সড়কের কিছু অংশ নির্মাণের কাজ পেয়েছিলেন তিনি। ২০১৫ সালে এর জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ শুরু করেন। কিন্তু বুঝতে পারেন ঘুষ না দিলে কাজ পাওয়া যাবে না। পরে তিনি গণপূর্তের প্রকৌশলীদের মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে ১৭০ কোটি টাকার কাজ পেয়েছিলেন। নিজে ৩০ কোটি টাকার কাজ করেন। বাকিটা অন্য ঠিকাদারকে দিয়ে দেন। ওই কাজ করেই তিনি মোটা অঙ্কের টাকার মুখ দেখেন বলে খালেদ দাবি করেছেন।

চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে খালেদ জিজ্ঞাসাবাদকারীদের জানিয়েছেন, তিনি নিজে কখনোই চাঁদা তুলতে যেতেন না। কিছু চক্রকে তিনি নিয়ন্ত্রণ করেন। তারা বিভিন্ন স্থান থেকে চাঁদা তুলে নিয়ে আসত তাঁর কাছে। পরে তিনি সেগুলো বিলি-বণ্টনের ব্যবস্থা করতেন। এ ছাড়া যত অবৈধ কাজ করেছেন, সবই যুবলীগের ঢাকা দক্ষিণ শাখার বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের নির্দেশে করেছেন। খালেদ বলেছেন, ‘সব জানে সম্রাট ভাই।’

উল্লেখ্য, সম্রাটও গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে আছেন।

জিজ্ঞাসাবাদকারী কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, একটি মামলায় রিমান্ডে নিয়ে আসার পর খালেদ মাহমুদকে বেশ শক্তই দেখা যায়। কোনো প্রশ্ন করা হলে তিনি ঘুরিয়ে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেন। এটিও বোঝানোর চেষ্টা করেন তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলেও তেমন কিছুই হবে না। পরে তাঁকে বোঝানো হয় তাঁর পায়ের তলায় মাটি নেই। তখন কিছুটা নরম হন এবং তথ্য দিতে শুরু করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে জি কে শামীম কোনো ঝামেলা করেননি। তিনি যা জানেন সব বলেছেন। কিভাবে সম্পদের মালিক হয়েছেন, কোন পেশার কাকে কাকে মাসোয়ারা দিতেন, সব জানিয়েছেন তদন্তকারীদের। শামীম বলেছেন, তাঁর কাছে কেউ এলে প্রথমেই চোখের দিকে তাকাতেন। চোখ দেখেই তিনি বুঝতে পারেন কে কী চায়। কাকে কত টাকা ঘুষ দিলে খুশি হবেন, সেটিও চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি আন্দাজ করতে পারতেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা