kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বগুড়া জেলা ও শহর আ. লীগের সম্মেলন

পদ পেতে নেতাদের দৌড়ঝাঁপ, প্রচার

গুরু-শিষ্য একই পদের জন্য মাঠে
উৎসাহের পাশাপাশি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা

লিমন বাসার, বগুড়া   

৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



পদ পেতে নেতাদের দৌড়ঝাঁপ, প্রচার

বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হবে ৭ ডিসেম্বর। আর শহর আওয়ামী লীগের সম্মেলনের দিন ঠিক করা হয়েছে ১৬ নভেম্বর। ক্ষমতাসীন দলের বড় এ দুই সম্মেলনকে ঘিরে উৎসব আমেজের পাশাপাশি দেখা দিয়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাও। কারণ এখানে দলের চেইন অব কমান্ড মানছে না কেউই। রাজনীতির মাঠে যিনি গুরু ছিলেন, তাঁর সঙ্গে একই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁরই শিষ্য। এরই মধ্যে নিজেদের ইচ্ছার কথা জানিয়ে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার চালাচ্ছেন। অনেকে তাঁর কর্মীদের দিয়েও নিজের গুণগান গাইয়ে নিচ্ছেন।

সভাপতি পদপ্রার্থীদের অনেকেই বলছেন, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হলে নবীন-প্রবীণদের সমন্বয়ে সৎ, নির্ভীকদের নিয়ে দল গঠন করে বগুড়ার উন্নয়নে সচেতন থাকবেন তাঁরা। এ পদে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে যাঁদের নাম শোনা যাচ্ছে, তাঁরা জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ডা. মকবুল হোসেন, সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান মজনু, সহসভাপতি তোফাজ্জল হোসেন দুলু, সহসভাপতি রেজাউল করিম মন্টু, অন্য সহসভাপতি মকবুল হোসেন মুকুল ছাড়াও আরো দু-একজন। প্রার্থীদের মধ্যে জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দ্বন্দ্ব এখন অনেকটাই স্পষ্ট। সর্বশেষ গত বুধবার শিবগঞ্জ উপজেলায় সম্মেলনের প্রস্তুতি উপলক্ষে কর্মিসভায় ডা. মকবুল হোসেনকে প্রধান অতিথি না করায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে কর্মিসভা বর্জন করেছেন। ওই কর্মিসভায় তাঁকে উদ্বোধক এবং সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান মজনুকে প্রধান অতিথি করা হয়েছিল।

ডা. মকবুল হোসেন বলেন, সংগঠনের নিয়ম অনুযায়ী কর্মিসভায় তাঁকে প্রধান অতিথি করার নিয়ম। কিন্তু তা না করে জেলা সাধারণ সম্পাদককে প্রধান অতিথি করা হয়।

একই ধরনের আরো একটি ঘটনা ঘটে জেলা মহিলা যুবলীগের অনুষ্ঠানে। এ ঘটনাগুলো থেকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সম্পাদকের দ্বন্দ্বের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। জানা গেছে, ১৯৯৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৪ বছর জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন মুক্তিযোদ্ধা মমতাজ উদ্দিন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়। এই নেতার কারণে দলের মধ্যে কোনো ঘটনা-রটনা থাকলেও তেমন একটা প্রকাশ্যে আসত না। তাঁর অবর্তমানে এখন দলের হ-য-ব-র-ল অবস্থা।

তবে দলের অনেক নেতাই বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘ক্ষমতার পালাবদল’ উল্লেখ করে বলেছেন টানা ২৪ বছর পর জেলা আওয়ামী লীগ নতুন সভাপতি পেতে যাচ্ছে। ডা. মকবুল হোসেন জানান, বগুড়ায় তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে আগের থেকে বেশি। প্রয়াত নেতা মমতাজ উদ্দিন সংগঠনের জন্য নিরলস পরিশ্রম করেছেন বলেই সংগঠনের মজবুত ভিত্তি হয়েছে। আগামীতে কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী সংগঠন শক্তিশালী করতে কাজ করা হবে। তিনি সভাপতি পদে প্রার্থী হবেন বলে জানান।

সাধারণ সম্পাদক ও শেরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মজনু বলেন, তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতি বুকে ধারণ করে চলছেন ছাত্রজীবন থেকেই। তিনি সভাপতি প্রার্থী হবেন।

সহসভাপতি রেজাউল করিম মন্টু জানান, তিনি সভাপতি প্রার্থী। বিগত দিনেও তিনি এ পদে প্রার্থী ছিলেন। তিনি নির্বাচিত হলে যারা সৎ, যোগ্য, ক্লিন ইমেজের মানুষ তারাই দলে থাকবে।

সহসভাপতি মকবুল হোসেন মুকুল বলেন, ‘আমিও জেলা কমিটির সভাপতি পদের একজন প্রার্থী। আমাকে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হলে প্রথমে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ধারক এবং সৎ নেতাকর্মীদের নিয়ে সংগঠন সাজাব।’

সাধারণ সম্পাদক পদে যাঁদের নাম শোনা যাচ্ছে, তাঁরা হলেন জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাগেবুল আহসান রিপু, টি জামান নিকেতা, মঞ্জুরুল আলম মোহন, সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুর রহমান দুলু, যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক সাগর কুমার রায়, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সুলতান মাহমুদ খান রনি ও প্রয়াত নেতা মমতাজ উদ্দিনের ছেলে ও বগুড়া চেম্বারের সভাপতি মাসুদুর রহমান মিলন। এঁদের মধ্যে সুলতান মাহমুদ খান রনি যাঁদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, তাঁরা একসময় তাঁর রাজনৈতিক গুরু ছিলেন।

এদিকে ছয় বছর পর ১৬ নভেম্বর শহর আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। দীর্ঘদিন পর সম্মেলনকে ঘিরে ২১টি ওয়ার্ডের নেতাকর্মীরা চাঙ্গা হয়ে উঠেছেন। সম্মেলন সফল করতে ওয়ার্ডগুলোতে বিশেষ বর্ধিত সভা চলছে। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে ছয়-সাতজন প্রার্থী হবেন বলে শোনা যাচ্ছে। সম্ভাব্য প্রার্থী এবং তাঁদের সমর্থকরা ফেসবুকসহ বিভিন্নভাবে তাঁদের প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সভাপতি পদে যাঁদের নাম শোনা যাচ্ছে, তাঁরা হলেন বর্তমান কমিটির আহ্বায়ক ও গাবতলী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রফি নেওয়াজ খান রবিন, শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল মান্নান আকন্দ এবং কাহালু উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলম। সাধারণ সম্পাদক পদে সম্ভাব্য প্রার্থীরা হলেন শহর কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক শাহাদৎ হোসেন শাহীন, শেখ শামীম, ওবায়দুল হাসান ববি ও অ্যাডোনিস তালুকদার বাবু, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের উপপ্রচার সম্পাদক আল রাজি জুয়েল।

জানা গেছে, ২০১৩ সালে কাউন্সিলর তালিকায় অনিয়মের কারণে শহর আওয়ামী লীগের সম্মেলন স্থগিত করা হয়। ওই বছরের নভেম্বরে শহর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। ছয় বছর ধরে আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে এর কার্যক্রম চলছে। পরবর্তী এক মাসের মধ্যে সম্মেলন করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করার কথা থাকলেও বিগত ছয় বছরে সেটি করতে পারেনি তারা। এখন আল রাজি জুয়েল যাঁদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, তাঁরা একসময় তাঁর রাজনৈতিক গুরু ছিলেন।

শহরের শহীদ খোকন পার্কে শহর আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এতে রাজশাহী সিটি মেয়র ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন প্রধান অতিথি থাকবেন। তবে পৌর আওয়ামী লীগের সম্মেলন ঘিরে নানা অনিয়ম ও অগঠনতান্ত্রিক বিষয় নিয়ে সম্প্রতি জেলার সাধারণ সম্পাদকের কাছে একটি অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দায়িত্বপ্রাপ্তরা ঘরে বসে কমিটি ঘোষণা দিচ্ছেন। পৌর আওয়ামী লীগের সদস্যদের একাধিক তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, যা বিভ্রান্তিকর। জেলা কমিটি এগুলোর অনুমোদন দেয়নি। অভিযোগ রয়েছে, শহর এলাকার বাইরের লোকজনকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করাসহ তাদের দিয়ে সম্মেলন করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আর আহ্বায়ক কমিটি সাত বছর আগের করা ওয়ার্ড কমিটি দিয়ে কিভাবে সম্মেলন করবে, সেটিও প্রশ্নবিদ্ধ।

তবে পৌর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক রফি নেওয়াজ খান রবিন জানান, প্রায় এক লাখ সদস্য সংগ্রহ করার কাজ চলমান রয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেক সদস্য সংগ্রহ করা হয়েছে। নতুন সদস্য করার ক্ষেত্রে যারা সুশৃঙ্খল, দলীয় চেতনায় বিশ্বাসী তাদের নেওয়া হচ্ছে।

আরেক সভাপতি প্রার্থী আব্দুল মান্নান আকন্দ জানান, তিনি অতীতে দলের জন্য কাজ করেছেন, আগামীতেও করে যাবেন। এ কারণে এবার সম্মেলনে সভাপতি পদে প্রার্থী তিনি। তিনি চান পেশির জোরে যেন কিছু না হয়।

জেলা ও শহর আওয়ামী লীগের সম্মেলন ঘিরে দলীয় নেতাকর্মীদের ছবিসংবলিত ব্যানার এবং ফেস্টুনে ভরে উঠেছে শহর। কেন্দ্রের নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও অনেক নেতা মোটরসাইকেলের বিশাল বহর নিয়ে শহরে শোডাউন করছেন। আগে জেলা কার্যালয়ে যাঁরা সপ্তাহে একদিনও আসতেন না, এখন তাঁরা প্রতিদিন আসছেন।

জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ ২০১৪ সালের ১০ ডিসেম্বর বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয়। সম্মেলনে পাঁচ সদস্যের কমিটিকে পরবর্তী এক মাসের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করতে বলা হয়। কিন্তু ২১ মাস পর ২০১৬ সালের ১২ অক্টোবর ৭১ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটি ঘোষণা করা হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা