kalerkantho

সোমবার । ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ১ পোষ ১৪২৬। ১৮ রবিউস সানি                         

নড়বড়ে জাপা, ভবিষ্যতে চোখ আ. লীগের, নিষ্ক্রিয় বিএনপি

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নড়বড়ে জাপা, ভবিষ্যতে চোখ আ. লীগের, নিষ্ক্রিয় বিএনপি

জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত রংপুরে দলটির অবস্থা এখন নড়বড়ে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে দলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানের শূন্য আসন রংপুর-৩ (সদর)-এ জাতীয় পার্টি জিতলেও মনোনয়ন নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। আর ভবিষ্যতে রংপুর সদরের আসনটি কবজায় নিয়ে গোটা জেলার রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ রয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সামনে। তাই দল গোছানোর প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন নেতাকর্মীরা। অন্যদিকে নিষ্ক্রিয় বিএনপি।

জাতীয় পার্টি : একসময় রংপুর মানেই ছিল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, জাতীয় পার্টি ও লাঙল। ১৯৯০ সালে পতনের পর কারাগারে যাওয়া এরশাদের প্রতি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে রংপুরের মানুষ। সাধারণ ভোটারদের কাছে ‘এরশাদ আবেগ’ এতটাই প্রবল ছিল যে প্রার্থীর যোগ্যতা বা অযোগ্যতা বিবেচ্য বিষয় ছিল না, লাঙল প্রতীক হলেই জয় সুনিশ্চিত। তখন থেকে জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে রংপুর। সব স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের প্রার্থীরা বিপুল ভোটে জয়ী হন। অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থীর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

কিন্তু ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটে যোগ দেওয়ার পর থেকে এই দুর্গে ধস নামতে শুরু করে। গত পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ঘটে দলটির ভরাডুবি। জেলার ৭৬টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান প্রার্থী জিতেছেন মাত্র সাতটিতে। পৌরসভা নির্বাচনে তিনটি পৌরসভার মধ্যে হারাগাছ ও পীরগঞ্জ পৌরসভায় মেয়র পদে প্রার্থীই দিতে পারেনি দলটি। বদরগঞ্জ পৌরসভায় জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী মাত্র ১৭১ ভোট পেয়েছেন। উপজেলা নির্বাচনে আট উপজেলার একটিতেও দলের প্রার্থীরা জয় পাননি। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছেন মাত্র একটিতে। এমনকি সদর উপজেলায় স্বয়ং এরশাদ প্রচারে নেমেও কোনো সুবিধা করতে পারেননি। অবশ্য সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে জয়লাভ করেছেন দলের প্রার্থী।

ষষ্ঠ থেকে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত রংপুরের ছয়টি আসনের সবগুলোতে জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা নির্বাচিত হন। এরপর ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে তিনটি আসন চলে যায় আওয়ামী লীগের দখলে। সর্বশেষ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-১ ও রংপুর-৩ আসনে জয় পায় জাতীয় পার্টি।

গত জুলাইয়ে এরশাদের মৃত্যুর পর রংপুর-৩ আসন শূন্য হয়। সম্প্রতি এ আসনের উপনির্বাচনে জাতীয় পার্টি এরশাদপুত্র রাহগীর আল মাহী সাদকে প্রার্থী করে। এ নিয়ে সৃষ্ট কোন্দলের কারণে দলের একটি অংশ নির্বাচন থেকে বিরত থাকে। যার প্রতিফলন ঘটে ভোটে। মাত্র ২১ শতাংশ ভোট পড়ে উপনির্বাচনে। আওয়ামী লীগের সমর্থন থাকায় সাদ এরশাদ জয় পেলেও দলে বিভক্তি রয়েই গেছে।

তবে জেলা জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উপনির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে কোন্দল দেখা দিলেও জয়লাভের পর ধীরে ধীরে সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে আসছে। একসময় এরশাদের জন্য নির্ধারিত রংপুর-৩ আসনটি জাতীয় পার্টির দখলে ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।’

আওয়ামী লীগ : রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচন ঘিরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আসনটি দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীনরা বিরোধী দলকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে যায়। এতে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েন। তবে আগামীতে এই আসনটি যাতে হাতছাড়া না হয় সে লক্ষ্যে মাঠে নেমে পড়েছেন দলের নেতাকর্মীরা। পাশাপাশি আন্দোলনের নামে বিএনপি-জামায়াত জোটের যেকোনো ধরনের অরাজকতা কঠোরভাবে প্রতিহত করাও আওয়ামী লীগের লক্ষ্য। তাই দল গোছানোর বিকল্প নেই বলে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ নেতারা জানিয়েছেন।

দলের একটি অংশ যারা জেলা ও মহানগর কমিটির নেতৃত্বে আছেন তাঁরা মনে করেছিলেন, রংপুর নিয়ে তাঁদের বিশেষ কিছু ভাবার বা করার নেই। কারণ দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি নির্বাচনী এলাকা এ জেলায়। উপরন্তু তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় আছেন। তবে দলের অন্য একটি অংশের অভিযোগ ছিল, এমন গা-ছাড়াভাবে চললে ভবিষ্যতের জন্য সেটা মঙ্গলজনক হবে না। তার প্রমাণও মিলেছে গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। মেয়র পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই গড়তে পারেননি।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রাজু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে আওয়ামী লীগ এখন জনমানুষের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ইতিমধ্যে জাতীয় পার্টির দুর্গ রংপুর আওয়ামী লীগের কবজায় এসেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির কাজ চলছে। লক্ষ্য আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া।’

বিএনপি-জামায়াত নিষ্ক্রিয় : বিএনপি নেতাকর্মীদের মাঠে দেখা যায় না। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন-পরবর্তী অবরোধ কর্মসূচি চলার সময় বিএনপিকে মাঠে নামতে দেয়নি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ছাড়া নাশকতার ঘটনায় একাধিক মামলা রয়েছে জেলা ও মহানগর বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে। গ্রেপ্তার এড়াতে এখনো প্রকাশ্যে আসেন না তাঁরা। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয় বলে দলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ। তাঁরা বলছেন, কর্মসূচি পালনের আগেই দলীয় কার্যালয় ঘিরে রাখে পুলিশ।

রংপুর মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম মিজু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তিনটি মামলায় জামিনে থাকার পরও পুলিশ বাড়িতে হানা দেয়। গ্রেপ্তারের ভয়ে নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও বসতে পারছি না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা