kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সাক্ষাৎকার

বাবার স্মৃতিচিহ্নও ধ্বংস করে দেয় ওরা

মাহজাবীন খালেদ

তৈমুর ফারুক তুষার    

৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বাবার স্মৃতিচিহ্নও ধ্বংস করে দেয় ওরা

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সেনাবাহিনীর এক দল সিপাহি হত্যা করেছিল মুক্তিযুদ্ধের ২ নম্বর সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফকে। তাঁকে হত্যা করার পর পরিবারের সদস্যদের খুঁজতে গিয়ে তাঁর বাসায় লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল সিপাহিদের একটি অংশ। ওই সময় তারা বাসায় খালেদ মোশাররফের স্মৃতিবিজড়িত সব জিনিসও ধ্বংস করে দেয়। ফলে খালেদ মোশাররফের তেমন কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই তাঁর পরিবারের কাছে। এসব তথ্য জানিয়েছেন খালেদ মোশাররফের জ্যেষ্ঠ সন্তান মাহজাবীন খালেদ। তিনি গত মঙ্গলবার কালের কণ্ঠ কার্যালয়ে এক সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য জানান।

সাবেক সংসদ সদস্য মাহজাবীন খালেদ বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাবাকে হত্যার পর আমাদের কেমন দিন গেছে, তা বোঝানো খুবই কষ্টকর। আমরা তখন অনেক ছোট। আমার বয়স সাত, আমার ছোট বোনের পাঁচ আর সবচেয়ে ছোট বোনের বয়স মাত্র এক বছর। বাবাকে হারিয়ে অথই সমুদ্রে পড়েন আমাদের মা। একদিকে বাবাকে হারানোর কষ্ট, অন্যদিকে কোথায় থাকব, কী খাব কোনো কিছুরই সংস্থান ছিল না। বাবা আমাদের জন্য তেমন কোনো সম্পদ রেখে যাননি।’

মাহজাবীন বলেন, ‘৮ নভেম্বর নানি ক্যান্টনমেন্টে আমাদের বাড়িতে গেলেন ছোট বোনের কিছু জিনিস আনার জন্য। গিয়ে দেখেন সেখানে একটি সুতাও নেই। মূল্যবান সব জিনিস তো লুট করে নিয়ে গেছেই, সঙ্গে ধ্বংস করে দিয়ে গেছে বাবার সব স্মৃতিচিহ্নও। আমরা সেদিন শুধু বাবাকেই হারাইনি, হারিয়েছি বাবার স্মৃতিবিজড়িত সব জিনিসও। ওরা এতটাই নিষ্ঠুর ছিল যে বাবার স্মৃতিচিহ্নগুলোও আমাদের রাখতে দেয়নি।’

শেষ দেখার স্মৃতিচারণা করে মাহজাবীন খালেদ বলেন, ‘বাবার সঙ্গে আমাদের শেষ দেখা হয় ৬ নভেম্বর রাতে। আমরা একসঙ্গে খাবার খেয়ে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে নানার বাড়ি চলে যাই। বাবা বলেছিলেন—পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আমরা যেন রাতে ক্যান্টনমেন্টের বাসায় না থাকি।’

খালেদ মোশাররফকে হত্যার পর তাঁর লাশ পাওয়া প্রসঙ্গে মাহজাবীন খালেদ বলেন, ‘আমরা বাবার লাশটি কয়েক দিন পরে দেখতে পাই। কারণ ক্যান্টনমেন্ট থেকে বাবার লাশ নিয়ে আসার মতো আমাদের কোনো লোক ছিল না। তখন বুঝতে পারি, এত দিন আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব নামে বাবার পাশে যারা ছিল তারা কেউই আমাদের পাশে নাই।’

ওই সময় নানা কষ্টের মধ্য দিয়ে জীবনযাপনের কথা তুলে ধরে মাহজাবীন বলেন, ‘মামা আমাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। একটা ঘরে আমরা তিন বোন ও মা থাকতাম। উনি যদি আমাদের আশ্রয় না দিতেন, তবে আমাদের পথে নামতে হতো। কারণ বাবার মৃত্যুর পর আমাদের চাচা বা বাবার দিকের আত্মীয়রা আমাদের খোঁজ নিতেন না।’ তিনি বলেন, ‘আমার মা ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে দেন। আমরা শহীদ আনোয়ার স্কুলে পড়তাম। মা ভয় পেতেন যে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে স্কুলে গেলে আমাদের মেরে ফেলা হবে। এরপর এক বছর গ্যাপ দিয়ে আমরা হলিক্রস স্কুলে ভর্তি হলাম।’

মাহজাবীন খালেদ বলেন, ‘আমার মা মেশিন বসিয়ে কাপড় সেলাই করতেন। ধীরে ধীরে কয়েকজন নারী কর্মীকে নিয়ে বেশ কয়েকটি সেলাই মেশিন বসান। সেগুলোতে কাপড় সেলাই করে বিক্রি করতে শুরু করেন। জিয়াউর রহমান যখন মারা গেলেন তাঁর স্ত্রী থাকার জন্য বাড়ি, ভাতা ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ পান। কিন্তু আমরা সরকার বা সেনাবাহিনী থেকে কিছুই পাইনি। এখনো সেনাবাহিনী থেকে আমাদের কিছু দেওয়া হয়নি। পেনশন বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কিছুই পাইনি।’

সেনাবাহিনীর কাছে প্রাপ্য সুবিধা দাবি করা হয়েছিল কি না জানতে চাইলে মাহজাবীন বলেন, ‘আমার মা খুবই অভিমানী। তিনি বলেন—যেহেতু ওরা কিছু দেয়নি, আমরা চাইতে যাব না। তিনি মনে করেন, তাঁর স্বামী এত বড় একজন মুক্তিযোদ্ধা, সেনা কর্মকর্তা তার জন্য কেন চাইতে যেতে হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা