kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

লিট ফেস্ট

সাহিত্য ও সংস্কৃতির উৎসব হলো শুরু

নওশাদ জামিল   

৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সাহিত্য ও সংস্কৃতির উৎসব হলো শুরু

বাংলা একাডেমিতে গতকাল ফিতা কেটে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল লিট ফেস্ট উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখিকা মনিকা আলী, অনুষ্ঠানের পরিচালক কাজী আনিস আহমেদ প্রমুখ। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঘড়ির কাঁটা তখন সকাল ৯টার ঘরে। বাংলা একাডেমি চত্বরে ঢুকতেই দেখা গেল চারদিকে উৎসবের সাজ। ঐতিহাসিক বর্ধমান হাউসের সামনে থেকে ভেসে আসছে লালনের গান। সাধুসংঘের শিল্পীদের গান আর দোতারা-তবলায় মুখর প্রাঙ্গণ। আশপাশে নানা স্টল। কয়েকটি স্টলে বই আর বই। কিন্তু তা বইমেলা নয়। বইয়ের লেখকদের নিয়ে উৎসব। শুধু কবি-লেখক-সাহিত্যিক নন, সংস্কৃতির আরো কিছু শাখা যেমন নৃত্য, সংগীত, চলচ্চিত্র, নাটকসহ নানা কিছুর সমাবেশ। দেশ-বিদেশের যশস্বী কবি-সাহিত্যিক-অনুবাদক-নাট্যকারদের নিয়ে আয়োজিত এই উৎসব—‘ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল লিট ফেস্ট’।

জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে শুরু হয়েছে সাহিত্য ও সংস্কৃতির অনিন্দ্য উৎসব ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’। নবমবারের মতো আয়োজিত আন্তর্জাতিক এই সাহিত্য উৎসবের উদ্বোধন করা হয় সকাল ১০টায় সাধনা নৃত্যগোষ্ঠীর ক্লাসিক্যাল ড্যান্সের সঙ্গে সুরের মূর্ছনায়। অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ ও ম্যানবুকার পুরস্কারের চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পাওয়া সাহিত্যিক মনিকা আলী। আরো ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী, ঢাকা লিট ফেস্টের পরিচালক সাদাফ সায্, কাজী আনিস আহমেদ ও আহসান আকবর, ঢাকা ট্রিবিউন সম্পাদক জাফর সোবহান প্রমুখ।

সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বলেন, বাংলা সাহিত্যকে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করাই ঢাকা লিট ফেস্টের মুখ্য উদ্দেশ্য। ২০১১ সালে যাত্রার শুরুতে এই আয়োজনের নাম ছিল ‘হে লিটারেরি ফেস্টিভাল’। তখন সাহিত্য উৎসবটি সমাজের এলিট তথা ধনিক শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করত। ২০১৫ সালে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’। পৃষ্ঠপোষকতায় যুক্ত হয় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। এর ফলে উৎসবটি সর্বজনীনতা লাভ করে এবং ঢাকা তথা বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি বিশ্ব দরবারে সঠিকভাবে তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি হয়।’ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে উৎসবে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের কবি-শিল্পী-সাহিত্যিক-চিন্তাবিদদের নিজ নিজ দেশের সরকারের মাধ্যমে জনমত গড়ে তোলাসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক মনিকা আলী বলেন, ‘এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমি গর্বিত। ১৯৭১ সালে মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সে আমি বাংলাদেশ ছেড়েছি। আর আসা হয়নি। এখন ঠিক করে বাংলা ভাষাটাও বলতে পারি না। এ জন্য দুঃখ হয়। এত সমৃদ্ধ যে ভাষা সে ভাষা আমি জেনেও ভুলে গেছি। তবে এ ভাষার প্রতি ভালোবাসাটা কমেনি। আমি দূরে থাকলেও হৃদয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।’

কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, ‘ঢাকা লিট ফেস্ট আগামী বছর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে উৎসর্গ করা হবে। আমি গৌরবের সঙ্গে উচ্চারণ করতে চাই, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম। তিনি না থাকলে এই মঞ্চে বাংলা সাহিত্য নিয়ে, বাংলাদেশকে নিয়ে, বাংলাদেশের সাহিত্য নিয়ে বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার এই অভিজ্ঞতা আমার হতো না।’

ঢাকা লিট ফেস্টের পরিচালক এবং ঢাকা ট্রিবিউন ও বাংলা ট্রিবিউনের প্রকাশক কাজী আনিস আহমেদ বলেন, ‘আমরা ঢাকা লিট ফেস্ট আয়োজন করি একটি চিন্তার উৎসব হিসেবে। আমাদের গভীর আশা, বাংলাদেশ ও তার গোটা জনবল একদিন মুক্তচিন্তার বিশাল সুদৃঢ় পাটাতনে পরিণত হবে।’

ঢাকা লিট ফেস্টের পরিচালক আহসান আকবর বলেন, ‘ঢাকা লিট ফেস্ট ফিকশনের সঙ্গে বিজ্ঞান, বিজ্ঞানের সঙ্গে কবিতা, কবিতার সঙ্গে কলার মেলবন্ধন ঘটায়। বাক্স্বাধীনতা, বহুত্ববাদ এবং রাজনীতির বিভিন্ন প্রেক্ষাপট ও মুক্তচিন্তার গুরুত্ব নিয়ে আমাদের আয়োজন সাজানো হয়।’

আরেক পরিচালক সাদাফ সায্ বলেন, ‘বই ও কবিতা একজন মানুষের আমূল পরিবর্তন ঘটাতে পারে। আমরা তিন পরিচালক শব্দ ও আইডিয়ার শক্তিতে বিশ্বাস করি। এটি আমাদের অনুপ্রেরণা জোগায় প্রতি বছর ঢাকা লিট ফেস্ট আয়োজন করতে।’

উদ্বোধনী পর্ব শেষে শুরু হয় নানা অধিবেশন। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি নিয়ে সারা দিন অনুষ্ঠিত হয় ৩০টি মনোজ্ঞ আলোচনা অনুষ্ঠান। এর মধ্যে সকালে ছিল প্রথম অধিবেশন ‘প্ল্যানারি ফিকশন : রেজিস্ট্যানস অর রিফিউজ’। বাংলা একাডেমির আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ অডিটরিয়ামে এ সেশনে উপস্থিত ছিলেন মনিকা আলীসহ পাঁচ দেশের পাঁচজন নারী লেখক। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ভারতীয় লেখক সুমনা রায়। বাকিরা হলেন ব্রাজিলীয় লেখক মারিয়া ফিলোমেনা বইসো লেপেসকি, ফিনল্যান্ডের মিন্না লিন্ডগ্রেন ও ব্রিটিশ-ব্রাজিলীয় জারা রদ্রিগেজ ফাউলার।

সুমনা রায় শুরুতেই প্রশ্ন করেন, ফিকশন কী? জবাবে মনিকা আলী বলেন, ‘ফিকশন হলো ছোট ছোট জিনিসকে আবেগ ও কাব্যিকতার ছোঁয়ায় বড় পরিসরে ধরা।’ তাঁর মতে, সাহিত্যিক পরিচর্যায় যেকোনো ক্ষুদ্র জিনিস বড় পরিসরে তুলে ধরা যায়।

বাংলা একাডেমির কসমিক টেন্টে ‘কবিতা আড্ডা : এপার ওপার’ শীর্ষক পরিবেশনায় কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ওপার বাংলার কবি মৃদুল দাশগুপ্ত, জহর সেন মজুমদার, গৌতম গুহ রায়, এপার বাংলার কামাল চৌধুরী ও মোহাম্মদ সাদিক।

কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থের পাণ্ডুলিপির ওপর লিখেছিলেন, ‘বাংলার ত্রস্ত নীলিমা’। এই ত্রস্ত নীলিমার মাধ্যমেই বাংলা ভাঙার গল্প বলা হয়েছে। ঢাকা লিট ফেস্টের প্রথম দিন ‘ভাঙা বাংলা : ত্রস্ত নিলীমায়’ সেশনে সেই ভাঙা বাংলার গল্পের বিশদ আলোচনা করলেন পশ্চিমবঙ্গের ঔপন্যাসিক স্বপ্নময় চক্রবর্তী এবং বাংলাদেশের শিক্ষাবিদ ও গল্পকার সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। এ ছাড়া সন্ধ্যায় দুই ক্যাটাগরিতে দেওয়া হয় জেমকন সাহিত্য পুরস্কার। আজ শুক্রবার উৎসবের দ্বিতীয় দিন। উৎসব চলবে সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা