kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

রেলশিল্প, কৃষিসহ নানা ক্ষেত্রে ‘বঞ্চনা’

নাসরুল আনোয়ার, হাওরাঞ্চল ও শফিক আদনান, কিশোরগঞ্জ    

৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রেলশিল্প, কৃষিসহ নানা ক্ষেত্রে ‘বঞ্চনা’

কিশোরগঞ্জে রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো উন্নয়নের প্রতিই যেন ঝোঁক সবার। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাসহ কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু রেলশিল্প-কৃষিসহ নানা ক্ষেত্রে বঞ্চিত জেলাবাসী এ নিয়ে ক্ষুব্ধ।

সম্ভাবনা থাকার পরও কিশোরগঞ্জে গড়ে ওঠেনি কোনো শিল্প-কারখানা। ফলে কর্মসংস্থানের মতো বিষয়টি উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে। পাকুন্দিয়া উপজেলার কালিয়াচাপড়ায় কিশোরগঞ্জ ইকোনমিক জোন (কেইজেড) নামে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার অনুমতি পেয়েছিল নিটল-নিলয় গ্রুপ। কিন্তু এ কাজের অস্বাভাবিক ধীরগতি হতাশ করেছে সবাইকে।

নাজুক রেলব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি দীর্ঘদিনেও। রেললাইনগুলো সংস্কার ও মেরামত না হওয়ায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে এ রুটে। তিনটি আন্তনগর ট্রেন চালু আছে। আরেকটি আন্তনগর ট্রেন চালুর দাবি পূরণ হয়নি।

৫০০ শয্যার শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কাজ শেষ হলেও কিছু অনিয়ম-দুর্নীতি ও লোকবল না থাকায় চালু হচ্ছে না প্রতিষ্ঠানটি। প্রয়াত জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও কিশোরগঞ্জবাসীর স্বপ্নের প্রকল্প ছিল নরসুন্দা পুনর্বাসন প্রকল্প। শতকোটি টাকার প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতি হয়। যার ফলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য নরসুন্দা নদীর পানিপ্রবাহ নিশ্চিত হয়নি। এসব সমস্যা নিয়ে জনপ্রতিনিধিরা বিভিন্ন সময় অনেক কথা ও প্রতিশ্রুতি দিলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। 

হাওরাঞ্চলসহ জেলার বিপুল জনগোষ্ঠীর অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। বিশেষ করে হাওরে বছরে একটি মাত্র ফসল বোরো উৎপাদন হয়। বছরের পর বছর ধরে অকাল বন্যায় ফসল মার খেতে খেতে কৃষকসমাজ পঙ্গু। চাষাবাদ করতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে বাড়িঘর ছেড়েছে অগণিত কৃষক পরিবার। তারা পেশা বদল করে শহরে রিকশা-ভ্যান চালিয়ে পরিবারের জীবিকা রক্ষা করছে। কৃষকরা ধান চাষের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলায় ফসলি জমির একটি বড় অংশ বছর বছর পতিত থাকছে। এ অবস্থায় ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, হাওরের জলমহালগুলোর ইজারা রহিত করে সবার জন্য উন্মুক্ত করার দাবি উঠেছিল। কিন্তু এসব জনদাবি আমলে না নেওয়ায় কৃষকের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি।

কিশোরগঞ্জের ১৩টি উপজেলার তিনটি উপজেলা পুরোপুরি হাওর অধ্যুষিত। এ ছাড়া আছে সাতটি পৌরসভা। এ জেলায় সংসদীয় আসন ছয়টি। এর মধ্যে অন্তত দুটি আসনের লোকজন তাদের এলাকায় উন্নয়ন নিয়ে মোটামুটি খুশি। এ দুটি আসন হচ্ছে কিশোরগঞ্জ-৩ ও কিশোরগঞ্জ-৪ আসন। বিশেষ করে ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলা নিয়ে গঠিত কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক প্রতিশ্রুতির চেয়ে বেশি কাজ করেছেন বলে স্থানীয় লোকজন বিশ্বাস করে।

জানা গেছে, স্থানীয় সংসদ সদস্য ছাড়াও তাঁর বাবা রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এ তিন উপজেলার উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখছেন।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, হাওরের প্রতিটি ঘরে আজ বিদ্যুতের আলো জ্বলে। যেখানে একসময়ে বর্ষায় নৌকা ও শুকনো সময়ে পায়ে হাঁটা ছাড়া যোগাযোগের কোনো উপায় ছিল না। এখন সারা বছর চলাচল উপযোগী সড়ক নির্মিত হচ্ছে। নদ-নদীর নাব্যতা ফেরাতে ড্রেজিং চলছে। পর্যটন এলাকার উপযোগী করে সাজানো হচ্ছে পুরো হাওর। তবে শত শত কোটি টাকার এসব কাজের মান ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে স্থানীয়দের মাঝে।

জানা যায়, রাস্তাঘাট উন্নয়নে বিপুল পরিমাণ বরাদ্দ দেওয়া হলেও কাজের মানের প্রতি কারো খেয়াল নেই। তাই বিভিন্ন সড়ক নির্মাণ বা সংস্কার করার কিছুদিনের মধ্যেই সেগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। কুলিয়ারচরের আগরপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে বাজিতপুর চৌকি আদালত পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার সড়কটি সংস্কারের এক বছর না যেতেই বিভিন্ন স্থানে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। অষ্টগ্রামের বাঙ্গালপাড়া থেকে নোয়াগাঁও পর্যন্ত সাত কিলোমিটার সড়ক নির্মাণকাজ সম্প্রতি শেষ হয়। ঠিকাদার কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার তিন মাসের মাথায় সড়কের বিভিন্ন স্থানের ব্লক সরে যায়। ধসে পড়ে সড়কের নানা অংশ। সৃষ্টি হয় বড় বড় খাদের।

কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুল হক চুন্নু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত পাঁচ বছর আমি প্রতিমন্ত্রী ছিলাম। এবার এমপি হিসেবে আছি। এর আগেও এমপি হয়েছি। আমার এলাকায় গেল পাঁচ বছরে অন্তত দেড় শ ব্রিজ-কালভার্ট হয়েছে। এগুলোর মধ্যে বড় ব্রিজ রয়েছে ২০টি। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন নতুন ভবন হয়েছে। কয়েকটি স্কুল-কলেজ সরকারি হয়েছে। অবকাঠামোগত চাহিদা সব পূরণ করা হয়েছে।’ 

তবে করিমগঞ্জ পৌরসভা এলাকায় রাস্তাঘাটের করুণ অবস্থা নিয়ে ক্ষুব্ধ পৌরবাসী। বহু রাস্তাঘাট ভেঙে পড়ে আছে মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেই। এ প্রসঙ্গে চুন্নু বলেন, পৌরসভা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। তারা সরকারি অনুদান ও নিজেদের আয়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করে। এখানে এমপির কোনো হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু করিমগঞ্জ নয়, কিশোরগঞ্জ সদর, হোসেনপুর, পাকুন্দিয়া, কটিয়াদী, বাজিতপুর, কুলিয়ারচর ও ভৈরব—কোথাও পৌর নাগরিকরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পায় না। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে প্রতিষ্ঠানটি। কটিয়াদী ও পাকুন্দিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য নূর মোহাম্মদ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এক বছরও হয়নি আমি এমপি হয়েছি। এ সময়ে অনেক রাস্তাঘাট, বাজার উন্নয়নসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নও হয়েছে যথেষ্ট। আর আমার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোও পর্যায়ক্রমে  আমার মেয়াদে শেষ করতে পারব বলে আমার বিশ্বাস।’ নাম প্রকাশ না করে জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, সৈয়দ আশরাফ জীবিত থাকাকালে কিশোরগঞ্জের উন্নয়ন নিজেই দেখাশোনা করতেন। তাঁর অবর্তমানে জেলা সদর নিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদেরও দায়িত্ব রয়েছে। কারণ হাওরের লোকজন তাঁকে ভোট দিয়ে এমপি বানালেও নেতা বানিয়েছে কিশোরগঞ্জবাসী।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা