kalerkantho

শুক্রবার । ২২ নভেম্বর ২০১৯। ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

কিশোর গ্যাং, ইয়াবা, খুন ছিনতাইয়ে নাকাল

নাসরুল আনোয়ার, হাওরাঞ্চল ও শফিক আদনান, কিশোরগঞ্জ   

৭ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কিশোর গ্যাং, ইয়াবা, খুন ছিনতাইয়ে নাকাল

কিশোরগঞ্জ জেলা সদরে কিশোর গ্যাং বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। জেলাজুড়ে বেড়েছে খুনখারাবি। জেলার অন্যতম নদীবন্দর ও জংশন শহর ভৈরব ছিনতাইকারীদের একরকম দখলেই চলে গেছে। মোটরসাইকেল চোরদের দৌরাত্ম্য সীমা ছাড়িয়েছে এ শহরে। ইয়াবার রমরমা কারবার চলছে বাজিতপুর, নিকলী, কুলিয়ারচর, অষ্টগ্রামসহ বহু জায়গায়।

বেপরোয়া কিশোর গ্যাং : একসময়ের শান্তিপূর্ণ জেলা শহর কিশোরগঞ্জে নতুন উপদ্রব হয়ে দেখা দিয়েছে ‘কিশোর গ্যাং’। জানা যায়, শহরে সক্রিয় ১০-১২টি কিশোর গ্যাং। প্রতিটি গ্রুপে ৫০ থেকে ৬০ জন করে উঠতি বয়সী কিশোর অপরাধ করে বেড়ায়। স্কুল-কলেজের গণ্ডি না পেরোনো এ কিশোরদের বেশির ভাগই মাদকসেবী। খুন, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, অপহরণসহ সব ধরনের অপরাধই করছে অনেকটা ফ্রিস্টাইলে। বেপরোয়া কিশোর গ্যাংয়ের নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে লাঠি-বাঁশি নিয়ে মাঠে আছে শহরের হারুয়া এলাকার বাসিন্দারা।

অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের এক শ্রেণির নেতার ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধে জড়িয়ে যাওয়া কিশোরদের বড় একটা অংশই উচ্চ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের।

গত ১০ অক্টোবর রাতে কিশোরগঞ্জ শহরের বত্রিশ বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন তাঁতিপাড়া এলাকা থেকে র‌্যাব-১৪-এর কিশোরগঞ্জ ক্যাম্পের সদস্যরা কিশোর গ্যাং সাজ্জাদ গ্রুপের প্রধান সাজ্জাদসহ তার দলের ১১ সদস্যকে আটক করেন। কিশোর গ্যাং ছক কষে হামলা চালায় বলে প্রমাণ পেয়েছে র‌্যাব।

শুধু কিশোরগঞ্জ সদরে নয়, ভৈরবেও কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে বলে স্থানীয় লোকজন জানায়। সূত্র মতে, ভৈরবের গ্যাং সদস্যরাও ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িত। ভৈরবে কথিত কিশোর গ্যাংয়ের প্রধান মধ্যপাড়ার রূপক হত্যা, ডাকাতি, ছিনতাইসহ একাধিক মামলার আসামি। সম্প্রতি রূপক ও তার গ্যাংয়ের সদস্য আফজাল, অন্তর ও উদয়কে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে ছিনতাইকারীদের হামলায় ভৈরব থানার পুলিশের তিন সদস্য আহত হয়েছেন।

ছিনতাইকারীদের দখলে ভৈরব : সাত-আটটি ছিনতাইকারীচক্র উপজেলার প্রায় ২০ থেকে ২২টি জায়গায় ছিনতাই হচ্ছে। পুলিশ শতাধিক ছিনতাইকারীকে আটক করেছে। মাথাচাড়া দিয়ে উঠা এসব ছিনতাইকারীর প্রায় সবাই বয়সে কিশোর ও ইয়াবায় আসক্ত। মূলত নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা অপরাধে জড়ায়।

স্থানীয় লোকজন জানায়, তিন জেলার সংযোগস্থল ভৈরবে রয়েছে নদীবন্দর ও রেলওয়ে জংশন। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ উপজেলায় খুন, ডাকাতি বা ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ নতুন নয়। এখানে ছিনতাইকারীরা এতটাই বেপরোয়া যে তাদের হাতে একাধিক পুলিশ সদস্য, আইনজীবী ও ব্যবসায়ী খুন হয়েছেন।

গত ২৭ অক্টোবর বিকেলেও ছিনতাইয়ের শিকার হন রসুলপুর গ্রামের সালমান মিয়া। সম্প্রতি ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন নূরুজ্জামান নামে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র। কালের কণ্ঠ’র হাওরাঞ্চলের নিজস্ব প্রতিবেদক নাসরুল আনোয়ারও ভৈরবে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে ক্যামেরা, মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা খুইয়েছেন।

ভৈরব থানার ওসি মোখলেছুর রহমান সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ছিনতাই প্রতিরোধে পুলিশের দুটি বিশেষ টিম মাঠে কাজ করছে।

ইয়াবার স্বর্গরাজ্য বাজিতপুর : বাজিতপুরে ইয়াবার কারবার সম্প্রতি রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। পুলিশ মাঝেমধ্যে ইয়াবার ছোট কারবারি ও সেবনকারীদের গ্রেপ্তার করলেও গডফাদার বা মূল কারবারিরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়েছে।

জানা যায়, বাজিতপুরের অন্তত ১০০ স্পটে ইয়াবা বিক্রি হয়। বাজিতপুর বাজারসহ অন্যান্য স্পটে ভাসমান কারবারিরা ইয়াবা বিক্রি করে। এ ছাড়া বলিয়ারদী পশ্চিমপাড়ায় জমে ‘ইয়াবার হাট’। উত্তর সরারচরও ইয়াবার একটি বড় স্পট।

বাজিতপুর থানার ওসি মো. খলিলুর রহমান পাটোয়ারী জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাজিতপুর থানায় প্রায় ১২০টি মাদকের মামলা হয়েছে। মাদকসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে চার শরও বেশি অপরাধীকে। এ ছাড়া বেশ কয়েকজন মাদকসেবীকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হয়েছে।   

জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন কেমন—এমন প্রশ্নের জবাবে কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সার্কেল) মো. আমিনুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে বলেই আমার কাছে মনে হয়। অবনতি হওয়ার মতো এখনো কিছু ঘটেনি।’

ভৈরবে মোটরসাইকেল চোরদের দৌরাত্ম্য : গত ২১ মার্চ রাতে ভৈরব থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শ্যামল মিয়ার মোটরসাইকেল থানার ভেতর থেকে চুরি হয়। দুই দিন আগেই তিনি এক লাখ ৭০ হাজার টাকায় মোটরসাইকেলটি কিনেছিলেন। এর আড়াই মাস আগে তাঁর আরেকটি মোটরসাইকেল একইভাবে থানার ভেতর থেকে চুরি হয়েছিল।

এর আগে ভৈরব থানার এসআই অভিজিৎ চৌধুরীর একটি মোটরসাইকেল থানার গ্যারেজ থেকে চুরি হয়। গত ৮ মার্চ বিএডিসি সার গুদামের গুদামরক্ষক আতাউর রহমানের একটি মোটরসাইকেল শহরের কমলপুর এলাকা থেকে চুরি হয়। এর আগে ভৈরবপুর গ্রামের ইতালিপ্রবাসী সবুজ মিয়ার একটি মোটরসাইকেল চুরি হয়। তারও আগে উপজেলা প্রশাসনের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার মোটরসাইকেল চুরির খবর পাওয়া গেছে। সর্বশেষ মোটরসাইকেলটি চুরি হয় এশিয়ান টিভির সাংবাদিক সজীব আহমেদের।

এ ছাড়া সম্প্রতি কটিয়াদীতে রাজনৈতিক কারণে প্রতিপক্ষের হামলায় জখম হয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের ছয় নেতা।

জেলায় মাত্র ২২ দিনের ব্যবধানে ১১টি হত্যাকাণ্ড হয়েছে। ১৪ আগস্ট বাজিতপুরের মাইজচর গ্রামে ‘ফারুক বাহিনী’র সন্ত্রাসীদের নির্বিচার গুলিতে শরীফ মিয়া ও ফোরকান মিয়া নামের দুই চাচাতো ভাই নিহত হন। এ ঘটনায় ছররা গুলিতে জখম হয় শিশু ও নারীসহ আরো ১৭ জন।

কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুলিশের একার পক্ষে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।’ তাঁর মতে, ‘জেলার ৩৪ লাখ মানুষের জন্য পুলিশ রয়েছে মাত্র দুই হাজার। সে হিসাবে একজন মাত্র পুলিশ প্রতি এক হাজার ৭০০ জন মানুষকে নিরাপত্তা দিচ্ছে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা