kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

গার্ডিয়ানে একাত্তরের বীরাঙ্গনা

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

৭ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গার্ডিয়ানে একাত্তরের বীরাঙ্গনা

একাত্তরের বীরাঙ্গনাদের নিয়ে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি নির্মাতা লিসা গাজী নির্মিত পুরস্কারজয়ী তথ্যচিত্র ‘রাইজিং সাইলেন্স’ গত মঙ্গলবার লন্ডনে প্রদর্শিত হয়েছে। এরপর গতকাল বুধবারের সংস্করণে ব্রিটিশ জাতীয় দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানে বৈশ্বিক পরিস্থিতিসংক্রান্ত বিষয়ে যৌন সহিংসতা প্রসঙ্গে একাত্তরের সেই বাংলাদেশি বীরাঙ্গনাদের কথা স্থান পায়। ওই প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘আমরা লাশের মতো পড়ে ছিলাম’ : কথা বলছেন বাংলাদেশে ১৯৭০-এর দশকে ধর্ষণ শিবিরের বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা।  

প্রতিবেদনে তথ্যচিত্র থেকে ১৯৭১ সালে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে ৯ মাসব্যাপী যুদ্ধের সময় বন্দি চার বোন আমিনা, মালেকা, মুখলেছা ও বুধি বেগমের অবস্থা তুলে ধরা হয়। এই চার বোনকে পাকিস্তানি সেনা ও স্থানীয় দোসররা অপহরণ করে নিয়ে যায়। ধর্ষণের জন্য ব্যবহৃত শিবিরগুলোতে যে দুই লাখেরও বেশি নারীকে আটকে রাখা হয়েছিল ওই চারজন তাঁদের মধ্যে ছিলেন। তাঁরা বন্দি ছিলেন প্রায় আড়াই মাস। তাঁদের একজন বুধি বেগম মুক্তি পাওয়ার আগেই যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে মারা যান। বড় বোন বুধি বেগমের ওপর নির্মম নির্যাতনের বিবরণ দিতে গিয়ে মালেকা বলেন, ‘ওই একটি কক্ষে আমরা ২২ জন লাশের মতো পড়ে থাকতাম।’ আরেক বোন মুখলেছা অত্যাচার থেকে বাঁচতে পানিতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। এত বছর পর লিসা গাজীর তথ্যচিত্রে দেওয়া জবানবন্দিতে মুখলেছা বলেছেন কিভাবে পাকিস্তানি সেনারা নারীদের তুলে নিয়ে মানববর্ম হিসেবে ব্যবহার করত।

মুখলেছাদের চার বোনের জবানবন্দি নিয়ে লিসা গাজীর তথ্যচিত্র ‘রাইজিং সাইলেন্স’ লন্ডন ছাড়াও বাংলাদেশ, আইসল্যান্ড, ইতালি ও নেদারল্যান্ডসে প্রদর্শিত হয়েছে। গার্ডিয়ান বলেছে, একাত্তরে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে যে কজন এখনো বেঁচে আছেন তাঁদের কয়েকজনের সাক্ষ্য ওই তথ্যচিত্র।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী নির্মাতা লিসা গাজী ‘বীরাঙ্গনা’ নারীদের কথা শুনেছিলেন তাঁর শৈশবেই। লিসার স্কুলের ইতিহাস বইয়ে রহস্যজনকভাবে বীরাঙ্গনাদের কথা ছিল না। কিন্তু তাঁর মুক্তিযোদ্ধা বাবা রাজধানী ঢাকার পথে ট্রাকে শত শত নারীকে দেখার কথা তাঁকে বলেছিলেন। ওই বীরাঙ্গনাদের বিষয়ে আরো জানতে আগ্রহী ছিলেন লিসা। একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম যৌন নির্যাতনের শিকার ওই নারীদের ‘বীরাঙ্গনা’ নাম দিয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যে পরিবারগুলো বীরাঙ্গনাদের গ্রহণ করছিল না তাদের পুনর্বাসন কেন্দ্র ও কারিগরি প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সেই কেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে যায়। বীরাঙ্গনারাও চলে যান আড়ালে। এরপর কয়েক দশক তাঁরা যে লজ্জা, বিচ্ছিন্নতা ও বৈষম্যের মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন তার প্রভাব পড়েছে তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও।

নারীদের জীবনের গল্প বলার প্রতিষ্ঠান ‘কমলা কালেক্টিভের’ প্রতিষ্ঠাতা সদস্য লিসা গাজী এরই মধ্যে ৮০ জনেরও বেশি বীরাঙ্গনা নারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। ২০১০ সালে একটি নাটকের জন্য প্রথমবারের মতো বীরাঙ্গনাদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল। ওই বীরাঙ্গনা নারীদের বেশির ভাগই দরিদ্র ও জরাগ্রস্ত। অধিকাংশই জীবিকা, সন্তান, বাবা-মা বা স্বামী হারিয়েছেন। তাঁদের ইতিহাস, জবানবন্দি ধারণ করা লিসা গাজীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ কারণেই তিনি আবার বীরাঙ্গনাদের কাছে ফেরেন ক্যামেরাসহ।

লিসা গাজীর এই তথ্যচিত্রটি এর মধ্যেই ‘এশিয়ান মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড’সহ বেশ কয়েকটি পুরস্কার জিতে নিয়েছে। লিসার যুক্তি, ‘আমরা যদি যৌন সহিংসতার ইতিহাস অগ্রাহ্য বা নাকচ করি তবে তা কোনো দিনও বন্ধ হবে না। বেঁচে যাওয়া ওই ব্যক্তিদের ব্যাপারে আমাদের মনোযোগী হতে হবে। তাঁদের কথা শুনতে হবে।’

মিয়ানমার ও দক্ষিণ সুদানে চলমান ঘটনাগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে তিনি লন্ডনে বলেন, ‘প্রায় ৫০ বছর আগে দূর দেশে ভুলে যাওয়া একটি যুদ্ধের বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে আমরা তাঁদের (বীরাঙ্গনাদের) জবানবন্দিকে উড়িয়ে দিতে পারি। কিন্তু সমস্যা হলো—আজও বিশ্বে সশস্ত্র সংঘাতগুলোতে একই ধরনের যৌন সহিংসতা ও ধর্ষণ চলছে।’

উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর ‘জেনোসাইড’ ও নির্মম নির্যাতনের ইতিহাস বাংলাদেশ সরকারও বিশ্বের কাছে তুলে ধরছে। ওই জেনোসাইডের অংশ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে দুই থেকে চার লাখ বাঙালি নারীকে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা ধর্ষণ করেছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা