kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

রংপুরে চলছে বিআরটিসির অর্ধশতাধিক বাস

সব বাসই আনফিট নেই রুট পারমিট

নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর   

৭ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রংপুরে চলছে বিআরটিসির অর্ধশতাধিক বাস

নতুন সড়ক আইন বাস্তবায়নে দেশজুড়ে চলছে তোড়জোড়। তবে রংপুর নগরী থেকে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে বিআরটিসির লক্কড়ঝক্কড় অর্ধশতাধিক যাত্রীবাহী বাস চলাচল করলেও যেন দেখার কেউ নেই। বাসগুলোর নেই ফিটনেস, নেই রুট পারমিট কিংবা বৈধ কাগজপত্র। এসব বাস প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার মুখে পড়ছে। দুই বছরে বিআরটিসির এই বাসগুলো দুর্ঘটনায় পড়েছে বারবার। এতে প্রাণ গেছে কমপক্ষে ৪৫ যাত্রীর। এর পরও বিআরটিএ কিংবা প্রশাসন এসব বাস চলাচল বন্ধে নিচ্ছে না পদক্ষেপ।

অভিযোগ রয়েছে, নগরীর আরকে রোড এলাকায় বিআরটিসির ডিপোয় চলছে লুটপাটের মহোৎসব। প্রকাশ্যেই বিভিন্ন বাস থেকে টায়ার, ইঞ্জিনসহ মূল্যবান যন্ত্রাংশ খুলে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে নগরীর তাজহাট এলাকায় পরিত্যক্ত স্থানে পড়ে আছে অর্ধশতাধিক বাস। এর বেশির ভাগের ইঞ্জিন, চেসিসসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ খুলে নিয়ে শুধু বাসের খোলস দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে।

রংপুর নগরীর তাজহাট এলাকায় রংপুর-কুড়িগ্রাম সড়কের পাশে বিআরটিসির বেশ কয়েকটি বাস খোলা আকাশের নিচে ফেলে রাখা হয়েছে। কোনোটিতে চাকা আছে, কোনোটিতে নেই। কোনোটির আবার ইঞ্জিনসহ মূল্যবান অনেক যন্ত্রাংশের কোনো হদিসই নেই। এসব বাস চালুর উদ্যোগ গ্রহণ তো দূরের কথা, খোয়া যাওয়া যন্ত্রপাতির হিসাবই জানে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ফলে অযত্ন-অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে রংপুর বিআরটিসির কোটি কোটি টাকার বাস। বিকল হয়ে পড়া বাসগুলোর মেরামত না করাসহ দক্ষ জনবল ও উন্নত সেবার অভাব রংপুর বিআরটিসি বাস ডিপোর পুরনো চিত্র।

রংপুরের শ্রমিক নেতা খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল জানান, যখন যে দায়িত্বে আসে, সে-ই নিজের পকেট ভারী করে। বিভাগীয় নগরী রংপুরে বিআরটিসির ভালো সার্ভিস নেই, ভালো চালক নেই। অনেক স্টাফ চলে গেছে। এখন যারা আছে তারাই ধ্বংস করছে এই সেক্টরকে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুই কর্মচারী জানান, বিআরটিসি ডিপোয় চলছে লুটপাটের মহোৎসব। এখানে যে কয়েকটি বাস চলে, সেখান থেকে প্রতিদিন আয়ের অর্ধেক জমা হয় না। এর বড় অংশ ম্যানেজারসহ কয়েকজন ভাগাভাগি করে নেন।

রংপুর থেকে পঞ্চগড় যাওয়ার জন্য বাসে উঠেছেন চাকরিজীবী নবাব আলী। তিনি জানান, একটি কারণে বিআরটিসি বাসে ওঠেন; সিটগুলো প্রশস্ত হওয়ায় ভালোভাবে বসা যায়। আর আন্তজেলা বাসগুলোর সিট খুবই সংকীর্ণ। তবে ২৫ থেকে ৩০ বছরের পুরনো বিআরটিসির বাসগুলো বেশির ভাগ দিন মাঝরাস্তায় বিকল হলে ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

বিআরটিসি বাসের এক চালক বলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাস চালাই। বাসের ব্রেক ও টায়ারের অবস্থা খারাপ, ইঞ্জিনের কন্ডিশনও সে রকম।

সরেজমিনে নগরীর আরকে রোড এলাকায় বিআরটিসি বাস ডিপোয় গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটকে পাহারাদার দাঁড়িয়ে আছে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ভেতরে প্রবেশ নিষেধ। অনেক চেষ্টায় ভেতরে ঢুকে দেখা গেল, বিআরটিসির বিভিন্ন বাসের ইঞ্জিনসহ মূল্যবান যন্ত্রপাতি খোলা হচ্ছে। এ ছাড়া অনেক বাসের মালপত্র খুলে ফেলে রাখা হয়েছে। দায়িত্বশীল কর্মকর্তার নাম বলতে রাজি হচ্ছিল না কেউ। ম্যানেজার (অপারেশন) সাইনবোর্ড দেখে ভেতরে ঢুকলে দেখা যায়, চেয়ারে হেলান দিয়ে টিভির মনিটরে সিসিটিভি ক্যামেরার দৃশ্য দেখছিলেন ম্যানেজার (অপারেশন) জামসেদ আলী। তিনিসহ ওই কক্ষে থাকা আরো দুজন বারবার ছবি তুলতে নিষেধ করেন। একপর্যায়ে ম্যানেজার ছবি না তোলার শর্তে কথা বলতে রাজি হন। তিনি জানান, রংপুর ডিপোয় ১০৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন। ডিপোর অধীনে ২৪টি বাস রংপুর থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করে। আর ১৮টি বাস প্রধান কার্যালয় থেকে লিজ নিয়ে বেসরকারি মালিকরা চালান। তিনি স্বীকার করেন, সব বাসেরই ফিটনেস সার্টিফিকেট ছিল না। তবে সম্প্রতি রংপুর বিআরটিএ অফিস থেকে ফিটনেস করা হয়েছে। তিনি জানান, বাসগুলো আসলেই চলাচলের অযোগ্য। কোনোটির ব্রেক ও টায়ারের অবস্থা ভালো নয়, ইঞ্জিনগুলো অনেক দিনের পুরনো। তবে নতুন বাস আসছে দাবি করে তিনি বলেন, ডিপোতে বাসের মূল্যবান মালপত্র লোপাট করার কথা ঠিক নয়। এ ছাড়া আয়ের টাকা ভাগাভাগির অভিযোগের বিষয়টিও অস্বীকার করেন ম্যানেজার জামসেদ আলী।

এ ব্যাপারে বিআরটিএ রংপুরের সহকারী পরিচালক আবদুল কুদ্দুস জানান, রংপুর থেকে ৬০টিরও বেশি বিআরটিসি বাস চলাচল করে। এর একটিরও ফিটনেস নেই। তাদের কাছে বিপুল পরিমাণ বকেয়া রয়েছে। তা বারবার বলার পরও পরিশোধ করা হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘ফিটনেসহীন গাড়ি চলাচল বন্ধে আমরা অভিযান শুরু করেছি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা