kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৪ রবিউস সানি     

পথেঘাটে রহস্যজনক ডিমওয়ালা ইলিশ!

তৌফিক মারুফ   

৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পথেঘাটে রহস্যজনক ডিমওয়ালা ইলিশ!

৩১ অক্টোবর সকালে পথে বের হতেই চোখে পড়ে অলিতেগলিতে ঝাঁপি-ডালায় সাজানো ইলিশের পসরা। বেশির ভাগই বড় আকারের এবং ডিমওয়ালা। মানুষের মুখে মুখেও ইলিশের আলোচনা। দামও বেজায় কম।

ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে গত ৯ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে টানা ২২ দিন দেশের সব নদ-নদী ও বঙ্গোপসাগরে ইলিশ ধরা-বিপণন-পরিবহন-সংরক্ষণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এ সময় ইলিশ ধরা বন্ধ থাকার পরদিন হঠাত্ করেই কিভাবে এত ইলিশ ছড়িয়ে পড়ল রাজধানীর অলিগলিতে? কৌতূহল খোদ মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের মনেও। তাঁদের প্রশ্ন, তবে কি এত দিনের জল-স্থল-আকাশপথে সর্বাত্মক অভিযানের ফাঁক গলে শিকার করা চোরাই ইলিশে সয়লাব পথঘাট।

অভিযানকালে জব্দ হওয়া প্রায় ১০৩ মেট্রিক টন ইলিশের সবটাই কী সঠিকভাবে এতিমখানায় গেছে, না কি নিয়ম ভেঙে তার অংশবিশেষ চোরাই পথে কোথাও মজুদ হয়েছিল—সেই প্রশ্নও তুলেছেন কেউ কেউ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ৩০ অক্টোবর রাত ১২টা পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা বলবত্ ছিল। বুঝলাম ওই দিন রাত ১২টার পর থেকেই জেলেরা ইলিশ ধরতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। মাছও না হয় ব্যাপকভাবে ধরা পড়ছে। তার পরও সকাল থেকেই কী করে ওই মাছ ঢাকা বা অন্য সব শহরে ছড়িয়ে পড়তে পারে? তাঁর মতে, হয়তো আশপাশের কোনো শহরে জেলেরা বা ক্ষুদ্র বিক্রেতারা সরাসরি কিছু কিছু মাছ খুচরা বিক্রির জন্য নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু ঢাকা বা অন্যান্য এলাকায় মাছ বাজারজাত হয় আড়ত ও পরিবহন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। জেলেদের কাছ থেকে প্রথমে মাছ যায় আড়তে, সেখান থেকে সেগুলো বাছাই করে, মাপ দিয়ে বরফজাত করে পাঠানো হয় ঢাকা কিংবা অন্যান্য বড় বড় মোকামে। সেই মোকাম থেকে যায় হাট-বাজারে বা অন্য ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের হাতে। কোনোভাবেই দু-এক দিনের মধ্যে এত ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া সম্ভব নয়। ফলে সহজেই ধারণা করা যায় যে এগুলো ২২ দিন আগের কিংবা অভিযান চলাকালে অবৈধভাবে ধরা ও মজুদ করা ইলিশ।

ওই কর্মকর্তা বলেন, অভিযানে আটক করা মাছগুলো কোথায় গেছে সেটা দেখা দরকার। পথেঘাটে পাওয়া ইলিশের দাম যে সস্তা তাতেও সন্দেহ হচ্ছে; এক কেজি বা তারও বেশি ওজনের ইলিশ কী করে মাত্র ৫০০-৬০০ টাকায় পথে-ঘাটে বিক্রি হয়!

এমন প্রশ্ন আর কৌতূহলের বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী শামস আফরোজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের অভিযানে কেবল মৎস্য বিভাগই নয়, অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও অংশ নিয়েছে। এত কঠোর ব্যবস্থাপনার মধ্যে আলাদা করে এত মাছ কেউ ধরেছে বা মজুদ করেছে বলে বিশ্বাস হয় না। তার পরও এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দেখব। কারণ অভিযানে জব্দ করা ইলিশ তো আমরা এখন আর অকশনে দেই না, এতিমখানা-লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে দেওয়ার কথা, সেটাই হয়েছে বলে জানি।’

একই অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. রমজান আলী বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার সময় আমাদের অভিযানে কোস্ট গার্ড, র্যাব, নৌবাহিনী, পুলিশসহ অন্যরাও আমাদের সঙ্গে কাজ করেছে। কোনো কোনো এলাকায় আমরা বিমানবাহিনীরও সহায়তা নিয়েছি। তার পরও জনবলের ঘাটতির কারণে পুরোটা ঠেকানো যায়নি। প্রায় পাঁচ হাজারের বেশি জেলে আটক হয়েছে। ১০৩ মেট্রিক টন ইলিশ জব্দ হয়েছে। মাছ যেমন বেড়েছে তেমন শুধু জেলে না অনেক অসচেতন-অসাধু মানুষ মাছ ধরেছে। কিন্তু কিভাবে মাছটা এলো, সেটা আমারও প্রশ্ন।’ তিনি বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পরদিন (৩১ অক্টোবর) আমি নিজেও বাজার ঘুরেছি। বিক্রি হওয়া ইলিশের মধ্যে ১০-১৫ শতাংশ ডিমওয়ালা। পরের দিন দেখলাম ৩০-৪০ শতাংশ ডিম ছাড়া ইলিশ দেখা গেছে।’

রমজান আলী আরো বলেন, যদি ৫০ শতাংশ মা ইলিশও ডিম ছাড়তে পারে তাহলে সেই মাছেও নদী সয়লাব হয়ে যাবে। ইলিশের এবার আর অভাব হবে না।

মৎস্য অধিদপ্তরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. কাজী ইকবাল আজম বলেন, ‘আমরা অভিযানের মাধ্যমে ৫৫-৬০ শতাংশ মা ইলিশ রক্ষা করতে পারি বা প্রজনন ঘটাতে পারি, বাকিটা তো থেকে যায়। ফলে ওই ডিমওয়ালা ইলিশ কোনো না কোনোভাবে ধরা পড়ে এবং বাজারে চলে আসে। আমরা তা ঠেকাতে বহু রকম পদক্ষেপ নিয়েছি। তার পরও বিষয়টি আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। আমরা দেখব কোথাও গলদ আছে কি না।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা