kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ধানমণ্ডিতে জোড়া খুন

সেই তরুণী শনাক্ত ভবনের সামনে ছিল কয়েকজন নারী

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সেই তরুণী শনাক্ত ভবনের সামনে ছিল কয়েকজন নারী

ধানমণ্ডিতে জোড়া খুনের পর বাসা থেকে বেরিয়ে যায় নতুন গৃহকর্মী। তাকে খুনের সঙ্গে জড়িত হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে। সিসিটিভির ফুটেজ থেকে নেওয়া। ছবি : কালের কণ্ঠ

স্মার্টফোন খুলে একটি ছবি সামনে তুলে ধরে শিল্পপতি কাজী মনির উদ্দিন তারিম বললেন, ‘এই দেখেন, মেয়েটিই আমার আম্মাকে (শাশুড়ি) হত্যা করেছে বলে মনে করছি। পুলিশও এমনটাই মনে করছে। তাকে ধরতে পারলেই ঘটনার আসল রহস্য বেরিয়ে আসবে।’

পোশাক ব্যবসায়ী মনির উদ্দিন যে তরুণীর ছবি দেখালেন তাঁকে গত শুক্রবার বিকেলে তাঁর শাশুড়ি আফরোজা বেগমের ফ্ল্যাটে গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োগ করা হয়। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর ওই ফ্ল্যাট থেকে আফরোজা (৬৫) ও তাঁর গৃহকর্মী দিতির (১৯) গলা কাটা লাশ উদ্ধার করা হয়।

ধানমণ্ডির ২৮ নম্বর সড়কের ২১ নম্বর বাড়ির চতুর্থ তলার ফ্ল্যাটে এই জোড়া খুনের ঘটনায় নতুন গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োগ করা ওই তরুণীকে সন্দেহ করা হচ্ছে। ঘটনার আগে ওই ভবনের সামনে কয়েকজন সন্দেহভাজন নারী উপস্থিত ছিল বলে জানা গেছে। সন্দেহ করা হচ্ছে, হত্যাকাণ্ডের পর খুনিরা গাড়িতে করে পালিয়ে গেছে।

তদন্তকারী একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ওই তরুণীর পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁর স্থায়ী ঠিকানা পাওয়া গেছে। সেখানে অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্তু ঘটনার পর তিনি বাড়িতে যাননি। ঢাকা বা ঢাকার আশপাশে কোথাও আত্মগোপন করে আছেন। শিগগিরই তাঁকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে। তবে ওই তরুণীর পরিচয় জানাতে চাননি এই কর্মকর্তা।

এদিকে গতকাল শনিবার আফরোজা বেগম ও দিতির মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। ময়নাতদন্তের পর দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান প্রভাষক ডা. কবির সোহেল সাংবাদিকদের জানান, দুজনের গলাসহ শরীরেই বিভিন্ন স্থানে ছুরিকাঘাতের একাধিক জখম ছিল। আফরোজার পেটে ও বুকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। এর মধ্যে একটি আঘাত তাঁর কিডনি ভেদ করে। মূলত অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়। গলা কাটার কারণে গৃহকর্মী দিতির মৃত্যু হয়।

ময়নাতদন্ত শেষে মৃতদেহ দুটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে গত রাত ৮টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত থানায় মামলা হয়নি।

গতকাল কাজী মনির উদ্দিনের সঙ্গে তাঁর ফ্ল্যাটে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি জানান, ওই তরুণীকে তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী বাচ্চুই নিয়ে এসেছিলেন। হত্যাকাণ্ডের দুই দিন আগে তাঁর শাশুড়ি বাচ্চুকে ধমক দিয়েছিলেন।

ভবনের চতুর্থ তলার ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখা যায়, আফরোজা বেগমের শয়নকক্ষের পুরোটাই এলোমেলো। মেঝের সাদা টাইলসে পড়ে থাকা রক্ত শুকিয়ে কালচে রং ধারণ করেছে। দেয়ালেও রক্তের দাগ লেগে আছে। এর পাশের কক্ষেই গৃহকর্মী দিতি থাকতেন। তাঁর কক্ষে ঢুকেও একই চিত্র চোখে পড়ে। জমাটবাঁধা রক্ত শুকিয়ে গেছে। রক্তমাখা কিছু পায়ের চিহ্নও রয়েছে ওই ঘরে।

শুক্রবার রাত সোয়া ৮টার দিকে এই দুজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এর আগে বিকেলে পৌনে ৪টার দিকে সন্দেহভাজন ওই তরুণীকে ওই ফ্ল্যাটে ঢুকতে দেখা গেছে। দেড় ঘণ্টার মতো বাসায় অবস্থান করে কাউকে কিছু না বলে তিনি বেরিয়ে যান। ফ্ল্যাট থেকে দেড় লাখ টাকা, স্বর্ণালংকার, মোবাইল ফোনসেটসহ মূল্যবান জিনিসপত্র খোয়া গেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ভবনের ক্লোজড সার্কিট (সিসি) টিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে পুলিশ জানতে পেরেছে গৃহকর্মী হিসেবে আসা ওই তরুণী ৫টা ৩২ মিনিটে ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে যায়। যাওয়ার সময় তাঁর পায়ে রক্তের দাগ ছিল। এ ছাড়া বাইরের রাস্তা থেকে রক্তমাখা একটি জুতা উদ্ধার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি। সেই জুতা পালিয়ে যাওয়া ওই তরুণীর হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

স্বজনরা জানান, মেয়েটি একা ছিলেন না। তাঁর আশপাশে আরো অনেকেই ছিল। তিনি যখন ফ্ল্যাটে আসেন তখন ভবনের সামনের রাস্তায় বিদ্যুতের খুঁটিতে হেলান দিয়ে একাধিক তরুণীকে দেখা গেছে। তাদের সঙ্গে কোনো গাড়ি ছিল, যাতে চড়ে ওই তরুণী পালিয়ে গেছেন।

ধানমণ্ডি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আশফাক রাজীব হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সম্ভাব্য সব কারণকে সামনে রেখে তদন্ত করে যাচ্ছি। প্রাথমিকভাবে পলাতক কাজের বুয়াকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।’ তিনি জানান, মনিরের ব্যক্তিগত সহকারী বাচ্চু, ভবনের কর্মচারী বেলায়েত, নুরুজ্জামান, শাফিন, রুমান ও মনুকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার আব্দুল্লাহ হিল কাফি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তদন্তে এখন পর্যন্ত ওই গৃহকর্মীকেই সন্দেহ করা হচ্ছে। ঘটনায় অন্য কেউ ছিল কি না, তারও খোঁজ চলছে। যেহেতু ওই বাসা থেকে কিছু স্বর্ণালংকার, টাকা ও মোবাইল ফোনসেট খোয়া যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে, তাই বাসার মালামাল লুট করতেই এ হত্যার ঘটনা ঘটতে পারে বলে মনে হচ্ছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা