kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বিএনপির দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আ. লীগের গোপনে

সাব্বিরুল ইসলাম সাবু, মানিকগঞ্জ   

৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিএনপির দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আ. লীগের গোপনে

নির্বাচন, জনসমর্থন ও সাংগঠনিক শক্তি—মানিকগঞ্জে বিএনপি ও আওয়ামী লীগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বরাবরের। ঢাকার পার্শ্ববর্তী এই জেলায় একসময় বিএনপির ছিল ব্যাপক প্রভাব। তবে গত ১০ বছরে সব দিক থেকেই আওয়ামী লীগ অনেকটা এগিয়ে গেছে। নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে অন্তর্দ্বন্দ্ব-অসন্তোষ থাকলেও দল ক্ষমতায় থাকায় তা সেভাবে প্রকাশ্যে আসছে না।

অন্যদিকে বিএনপি দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকায় নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা কাজ করছে। সেই সঙ্গে আছে নেতৃত্ব নিয়ে অন্তর্দ্বন্দ্ব। ফলে সাংগঠনিকভাবে বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছে দলটির মধ্যে। এর বাইরে জেলায় জাতীয় পার্টি, জামায়াত, বাম সংগঠনগুলোসহ অন্যান্য দলের তেমন একটা শক্ত অবস্থান নেই। দলীয় কর্মকাণ্ডও সেভাবে চোখে পড়ে না।

বিএনপি : একসময় মানিকগঞ্জকে বলা হতো বিএনপির দলীয় প্রতীক ধানের শীষের ঘাঁটি। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত জেলার চারটি আসনেই একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল বিএনপির। সে সময় মানিকগঞ্জে বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন, শিল্পপতি হারুনার রশিদ খান মুন্নু ও শামসুল ইসলাম খান নয়া মিয়া। তাঁদের মধ্যে নেতৃত্বের বিরোধ থাকলেও তা উল্লেখ করার মতো ছিল না।

উল্লিখিত তিন নেতার কেউ আজ বেঁচে নেই। তাঁদের অনুপস্থিতিতে জেলা বিএনপিতে বিরোধ প্রকট হয়ে ওঠে। সংকট মোকাবেলায় ২০১৪ সালে মুন্নুর মেয়ে আফরোজা খানম রিতাকে সভাপতি, খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের ছেলে খোন্দকার আবদুল হামিদ ডাবলুকে সহসভাপতি এবং শামসুল ইসলাম খান নয়া মিয়ার ছেলে মাঈনুর ইসলাম শান্তকে সাধারণ সম্পাদক করে জেলা কমিটি গঠন করে দেওয়া হয় কেন্দ্র থেকে। তাঁরা তিন মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের কথা থাকলেও বিভক্তির কারণে পাঁচ বছরেও তা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় কেন্দ্র ওই কমিটি বাতিল করে গত ২২ মে ৬৩ সদস্যবিশিষ্ট জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি করে দেয়। অ্যাডভোকেট জামিলুর রশিদ খানকে আহ্বায়ক ও জিন্না কবিরকে দেওয়া হয় সদস্যসচিবের দায়িত্ব। গত ১১ সেপ্টেম্বর সাতটি উপজেলা ও দুটি পৌরসভায় ৩৩ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা দেয় এই আহ্বায়ক কমিটি।

এদিকে এই কমিটিরই যুগ্ম আহ্বায়ক আজাদ হোসেন খান, তোজাম্মেল হক তোজাসহ বেশ কয়েকজন গত ১৩ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলন করে পকেট কমিটি গঠনের অভিযোগ এনে খোদ আহ্বায়ক কমিটিই ভেঙে দেওয়ার দাবি তোলেন। সর্বশেষ সাতটি উপজেলা ও দুটি পৌরসভা থেকে ১৬১ জন সদস্য পদত্যাগ করেন।

যোগাযোগ করা হলে জামিলুর রশিদ খান বলেন, সবার মতামত নিয়েই কমিটি করা হয়েছে। সদস্যসচিব জিন্না কবির বলেন, সংবাদ সম্মেলন করে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করা থেকে বোঝা যায় কারা ষড়যন্ত্র করছেন।

আওয়ামী লীগ : জেলার তিনটি আসনেই দলের সংসদ সদস্য এবং দল ক্ষমতায় থাকায় মানিকগঞ্জে আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে রয়েছে শক্ত অবস্থানে। ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি সম্মেলন করে কমিটি গঠন করে জেলা আওয়ামী লীগ। তৃণমূল পর্যায়েও রয়েছে কমিটি।

তবে জেলায় ক্ষমতাসীন দলটিতেও রয়েছে বিভেদ। অভিযোগ আছে, সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি গঠন করা হলেও ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে পছন্দের লোকজনকে কমিটিতে রাখা হয়েছে। বাদ দেওয়া হয়েছে পরীক্ষিত নেতাদের। দলের জন্য নিবেদিত এসব নেতাকে সাংগঠনিক কার্যক্রমে রাখা হয় না। ফলে দলের বড় একটি অংশের মধ্যে রয়েছে হতাশা।

অন্যদিকে নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি, টিআর-কাবিখা প্রকল্পে নয়ছয়, বালুমহাল ইজারায় আধিপত্য, কিছু কিছু নেতার উগ্র আচরণ—এমন সব বিষয় নিয়ে সাধারণ সদস্যদের মধ্যে রয়েছে ক্ষোভ। অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ক্ষেত্রের কর্তৃত্ব নিয়ে দলে বিভক্তি চোখে পড়ার মতো। এর একটি উদাহরণ হলো, পরিবহন খাতের কর্তৃত্ব নিয়ে দুই গ্রুপের প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব। জেলা পর্যায়ের বেশির ভাগ নেতা এমনকি সংসদ সদস্যরাও বিভক্ত হয়ে পছন্দের গ্রুপকে সমর্থন দিচ্ছেন। মিছিল-মিটিং এমনকি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে এই বিভেদ।

আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি নিয়েও মূল দলে বিভেদ রয়েছে। সর্বশেষ শ্রমিক লীগের কমিটি নিয়ে বিভক্ত মতামত জানিয়েছেন নেতারা। সর্বশেষ কমিটির বৈধতা নিয়ে শ্রমিক লীগের একাংশ আবার আদালতে মামলা করেছে।

জেলা ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের সময়ও আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মধ্য দিয়েও সংগঠনের নেতাদের দ্বন্দ্ব প্রকাশ পেয়েছে।

জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক দীপক কুমার ঘোষ বলেন, ‘জেলা থেকে তৃণমূল পর্যায়ে কমিটি থাকলেও বেশ কিছু দুর্বলতা আছে। কমিটির অনেকে সাংগঠনিকভাবে অভিজ্ঞ নয়। কেউ কেউ আবার নব্য আওয়ামী লীগার। তাঁরা মনে-প্রাণে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের নীতির অনুসারী নন।’  

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম মহিউদ্দিন অবশ্য দলে কোন্দল থাকার কথা স্বীকার করতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘এটা কোন্দল নয়, মতের পার্থক্য। এই মুহূর্তে মানিকগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ অত্যন্ত সংগঠিত। আর নেতাকর্মীদের দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ে বড় ধরনের অভিযোগ নেই। যেটুকু আছে তা সহনীয় পর্যায়ে।’

জাতীয় পার্টি : জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় থাকার সময় মানিকগঞ্জে জাতীয় পার্টিতে ভিড়ে যান আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা। তবে এরশাদের হাত ধরে রাজনীতিতে আসা কর্নেল (অব.) মালেকের হাতেই ছিল নেতৃত্ব। সে সময় সাংগঠনিকভাবে জেলা জাতীয় পার্টি বেশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ১৯৯৬ সালের দিকে কর্নেল মালেক বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী নিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার পর থেকেই জেলায় শক্তিহীন হয়ে পড়ে জাপা। বর্তমানে সংগঠনটির কার্যক্রম খুবই সীমিত।

জাসদ : মানিকগঞ্জে একটা সময় জাসদের উল্লেখযোগ্য শক্ত অবস্থান ছিল। অধ্যাপক মজিবুর রহমান, অ্যাডভোকেট লতিফ, মুক্তিযোদ্ধা ইকবাল হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম বুলু, মুক্তিযোদ্ধা আফজাল হোসেন জকি নেতৃত্ব দিতেন জেলা জাসদকে। বর্তমানে নিয়মিত জেলা অফিস খুললেও সারা জেলায় তাদের জনসমর্থন ও কর্মীর সংখ্যা নগণ্য।

জামায়াত : একসময় সাংগঠনিকভাবে ভালো অবস্থান থাকলেও মানিকগঞ্জে জামায়াতে ইসলামীর জনসমর্থন সেভাবে কখনোই ছিল না। বিভিন্ন সময় জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিলেও দুই শতাংশের বেশি ভোট পায়নি। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় দলটি উজ্জীবিত হয়ে উঠলেও বর্তমানে সাংগঠনিক কোনো তৎপরতা চোখে পড়ে না।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা