kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

শিশু তুহিন হত্যা

বাবার সম্পৃক্ততা নিয়ে ধোঁয়াশা!

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ   

২৩ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাবার সম্পৃক্ততা নিয়ে ধোঁয়াশা!

সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে সাড়ে পাঁচ বছর বয়সী শিশু তুহিন হত্যায় পিতার সম্পৃক্ততা নিয়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। রিমান্ডে পিতা আব্দুল বাছিরের মুখ থেকে সন্তান হত্যায় তাঁর সম্পৃক্ততার স্বীকারোক্তি না পেয়ে সোমবার তাঁকে দ্বিতীয় দফায় পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। সঙ্গে দুই চাচাকেও তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে।এদিকে এখনো তুহিনের মা মনিরা বেগম এই ঘটনায় তাঁর স্বামী জড়িত থাকতে পারেন বলে বিশ্বাস করছেন না।এদিকে চাচাতো ভাই শাহরিয়ারের ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তির বিষয়টিও মেনে নিতে পারছেন না তাঁর মা খইরুন নেছা।তাঁর সন্তানের কাছ থেকে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন তিনি। তুহিনের মা, চাচিসহএলাকাবাসী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি সুষ্ঠু ও অধিকতর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।সরেজমিনে খেজাউড়া গ্রামে গিয়ে জানা যায়, বাছির খেজাউড়া গ্রামের যে পাড়ায় বসবাস করেন, তাঁর আত্মীয়-স্বজন সেই পাড়া থেকে অনেক দূরে থাকে। বাছিরের বাড়ির চারপাশে প্রতিপক্ষ আনোয়ার মেম্বারের আত্মীয়-স্বজনের বাস। আনোয়ার মেম্বারের স্বজনদের সঙ্গে তাঁদের নানা বিষয়ে পুরনো বিরোধ রয়েছে। জানা গেছে, বাছিরের ২০ দিন বয়সী মেয়ের জন্মের কয়েক দিন আগে বাছিরের সঙ্গে তাঁর ভাই নাসিরের তুমুল ঝগড়া হয়। এনিয়ে বাছিরের সঙ্গে নাসিরের ও তাঁর পরিবারের কথাবার্তা বন্ধ ছিল।

প্রায় দেড় দশক আগে মধুপুরের মুজিব হত্যায় বাছিরকে আসামি করায় তাঁর বাবা মর্মাহত হন। মুজিব নারীসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে এলাইছ মিয়া ও কনোরুলসহ তাঁদের স্বজনদের হাতে খুন হন বলে জানায় এলাকাবাসী। এই মামলায় বাছিরকে আসামি করায় তাঁর বাবা মৃত্যুর আগে মামলার খরচের জন্য বাছিরকে আলাদা করে জমি দান করে যান। এই জমি নিয়ে প্রায় এক মাস আগে নাসিরের সঙ্গে ঝগড়া হয় বাছিরের। নাসির ও মোছাব্বির চাইতেন না এই জমি বাছির একা ভোগদখল করুক।

১৬৪ ধারায় স্বীকৃতি প্রদানকারী তুহিনের চাচাতো ভাই শাহরিয়ারের মা খাইরুন নেছাও দাবি করেন তাঁর ছেলে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত নন। গ্রামের লোকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চার বছর আগে গ্রামের নিলুফার বেগম হত্যাকাণ্ডের সম্প্রতি আপসে নিষ্পত্তির জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এই বিষয়টি মেনে নিতে পারছিলেন না তুহিনের চাচা মাওলানা আব্দুল মোছাব্বির। তুহিন হত্যার দিনই এই মামলার যুক্তিতর্ক শুনানির দিন ছিল।কিন্তু ওই দিনই নৃশংসভাবে তুহিনকে খুন করা হয়। তাই নিলুফার হত্যা মামলার সঙ্গে তুহিন হত্যার রহস্য লুকিয়ে আছে বলে মনে করে এলাকার লোকজন।

তুহিনের মা মনিরা বেগম বলেন, ‘৮-১০ বছর হয় আমার বিয়ে হয়েছে। তুহিনের বাবা কখনো আমাকে গালি দেননি।সন্তানদেরও মারধর করেননি কখনো।বাচ্চাদের খুব আদর করতেন। আমি বিশ্বাস করি না তুহিনকে তিনি হত্যা করেছেন। কিন্তু পুলিশ বলছে তুহিনের বাবা জড়িত।’ তাদের নিরপেক্ষ ও অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে খুনি বের করার দাবি জানান মা মনিরা বেগম।তুহিনের মামা নূরুদ্দিন বলেন, ‘আমার বোন জামাই কখনো আমার বোন ও তার সন্তানদের গালমন্দ করেনি। এই মানুষটি কিভাবে তার সন্তানকে হত্যা করতে পারে বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছে।’

এদিকে ঘটনার পরদিন মৌখিকভাবেএবং এর পরদিন আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করে তুহিন হত্যায় চাচার সঙ্গে বাবাও জড়িত রয়েছেন বলে জানান সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান। তবে প্রথম দফা রিমান্ডে এবং আদালতে তোলা হলেও পিতার স্বীকারোক্তি না পাওয়ায় এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে।এ কারণেই গত শুক্রবার সিলেটের ডিআইজি কামরুল আহসানও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন বলে জানা গেছে।তবে বাছিরকে দ্বিতীয় দফা রিমান্ডে নেওয়ার পর পুলিশ এ বিষয়ে আগের মতো কথা বলতে চাচ্ছে না।

দিরাই থানার ওসি কে এম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘তুহিন হত্যায় আর কেউ জড়িত আছে কি না, বা এর আরো প্রকৃত কারণ কী—তা জানার জন্যই দ্বিতীয় দফা রিমান্ড চাওয়া হয়েছে।আশা করি এবার আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।’ এর বেশি কিছু বলতে অপারগতা জানান তিনি।

উল্লেখ্য, গত ১৫ অক্টোবর ভোরে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে নৃশংসভাবে খুন করা হয় তুহিন মিয়াকে। হত্যার পর তার দুই কান ও লিঙ্গ কেটে ফেলা হয়। গ্রামের সালাতুল ও সোলেমানের নাম লেখা হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দুটি ছুরি তুহিনের পেটে ঢুকিয়ে মসজিদের পাশে কদমগাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়। এ ঘটনায় ওই দিন তুহিনের বাবা, তিন চাচা, চাচাতো ভাই, চাচি ও চাচাতো বোনসহ সাতজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে আসে পুলিশ। রাতেই প্রতিপক্ষকে মামলা-মোকদ্দমাসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে ফাঁসাতে তুহিনের পরিবার এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে জানায় পুলিশ। আদালতে চাচা নাসির ও চাচাতো ভাই শাহরিয়ার ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। বাবা বাছির, চাচা মোছাব্বির ও জমসেদ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি না দেওয়ায় তাঁদের তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা