kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

প্রতিশ্রুতির বেশিই বাস্তবায়ন হয়নি

লিমন বাসার, বগুড়া   

২৩ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রতিশ্রুতির বেশিই বাস্তবায়ন হয়নি

টানা ১০ বছর ধরে ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। কিন্তু এ সরকারের আমলে দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া বগুড়ার সাতটি আসনের কোনো সংসদ সদস্যই তাঁদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেননি। যে কারণে বগুড়ায় সিটি করপোরেশন ঘোষণা, সরকারি আজিজুল হক কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর, সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেলপথ নির্মাণ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, বিমানবন্দর নির্মাণসহ বেশ কয়েকটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি।

বর্তমানে বগুড়ার সাতটি আসনের মধ্যে দুটিতে আওয়ামী লীগ আর বাকি পাঁচটির মধ্যে দুটিতে বিএনপি, দুটিতে জাতীয় পার্টি ও একটিতে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রয়েছেন। দশম সংসদে দুটি আসনে আওয়ামী লীগ, তিনটিতে জাতীয় পার্টি ও একটিতে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সদস্য ছিলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বগুড়ার সাতটি আসনের মধ্যে বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) আসনে উল্লেখযোগ্য প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল নদী ভাঙন প্রতিরোধে স্থায়ী ব্যবস্থা, এলাকার রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, খোলাবাজারে পণ্য বিপণন ও চাষিদের পণ্য পরিবহন সহজীকরণের ব্যবস্থা, যমুনার চরের মানুষের জন্য স্কুল নির্মাণের ব্যবস্থা করা। এই এলাকায় নদী ভাঙন রোধসহ বেশ কিছু উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে। আরো কিছু বড় প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। তবে কৃষক ও চরবাসীর সমস্যা রয়েই গেছে। এখনো বন্যা হলে শত কোটি টাকার ক্ষতি হয়। যার প্রমাণ সর্বশেষ বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি।

বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে সংসদ সদস্যের প্রতিশ্রুতি ছিল নাগর নদের ওপর সেতু নির্মাণ, ময়দানহাটার মজুমদার পাড়ায় মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যার স্থানটিতে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ, অর্জনপুর গ্রামে করতোয়া নদীর ঘাটে এবং আঁচলাই-টেপাগাড়ি সড়কে একই নদীর ওপর সেতু নির্মাণ করা। এর মধ্যে শুধু নাগর নদের ওপর সেতু হয়েছে।

বগুড়া-৩ (আদমদীঘি-দুপচাঁচিয়া) আসনে সান্তাহার লেভেলক্রসিংয়ে ওভারব্রিজ নির্মাণ, পৌরসভাকে প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় উন্নীতকরণ, রক্তদহ বিল খনন ও বাস টার্মিনাল নির্মাণ করার প্রতিশ্রুতি ছিল, যার কোনোটিই এখনো পূরণ হয়নি।

বগুড়া-৪ (কাহালু-নন্দীগ্রাম) সংসদীয় এলাকার রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, উপজেলা সদরে ২০ শয্যার হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু, প্রয়োজনীয়সংখ্যক স্কুল নির্মাণ ও মাধ্যমিক স্কুলগুলো এমপিওভুক্ত, কৃষকদের পণ্য বিপণন ব্যবস্থা সহজীকরণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ১০ বছরে কোনোটাই পূরণ হয়নি।

বগুড়া-৫ (শেরপুর-ধুনট) আসনে বর্তমান সংসদ সদস্যের প্রতিশ্রুতি ছিল অনেক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ধুনট-শেরপুরের মাঝ দিয়ে বহমান বাঙ্গালী নদীর ঝাঝর ঘাটে সেতু নির্মাণ, যমুনা নদীর ভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা, ভাঙনে বাস্তুহারা পরিবারের পুনর্বাসন, শেরপুর-ধুনট উপজেলায় স্টেডিয়াম নির্মাণ, ধুনট উপজেলার মথুরাপুর ইউনিয়নের শ্যামগাতি-হিজুলী রাস্তা পাকাকরণ, বাঁশ ও টুপি শিল্পকে সমৃদ্ধ করার জন্য ক্রয় কেন্দ্র করা, বেকারদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এ ছাড়া এলাকাকে সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত করা ছিল অন্যতম প্রতিশ্রুতি। আইন-শৃঙ্খলা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এলাকাটি মাদকমুক্ত করা যায়নি। এ ছাড়া অন্য কোনো প্রতিশ্রুতি আজ পর্যন্ত পূরণ হয়নি।

বগুড়া-৬ (সদর) সংসদীয় এলাকার বগুড়া পৌরসভাকে সিটি করপোরেশন ঘোষণা, সরকারি আজিজুল হক কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর, সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেলপথ নির্মাণ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, বিমানবন্দর নির্মাণ ও দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরী স্থাপনের উদ্যোগ ১০ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি।

বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাহজাহানপুর) এলাকায় নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল গাবতলী ও দুর্গাহাটা সড়কটি চলাচলের উপযোগী করে তোলা, গাবতলীতে গ্যাস সংযোগ নিয়ে যাওয়া, গাবতলী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় সরকারি করা, নতুন উপজেলা হিসেবে শাহজাহানপুরে সরকারি সব কার্যালয় স্থাপন। এসব প্রতিশ্রুতির কোনোটাই পূরণ হয়নি।

বগুড়া নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব ও বগুড়া থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক তৌফিক হাসান ময়না কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি নিজে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী। তবে তার মানে এই নয় যে যেটা হয়নি সেটাকে হয়েছে বলব। আসলে বগুড়ার উন্নয়ন নিয়ে আমরা হতাশ। বগুড়া বিএনপির ঘাঁটি হওয়ার কারণে এখানে মানুষকে বোঝাতে হবে যে আওয়ামী লীগও কাজ করে। উন্নয়নে তারাও সমবণ্টনে বিশ্বাসী। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা হয়নি।’ তিনি মনে করেন, বগুড়ায় যোগ্য নেতৃত্বের অভাব রয়েছে। নিজ জেলার জন্য কাজ আদায় করতে ব্যর্থ হচ্ছেন তাঁরা।

এই নাগরিক নেতা বলেন, ‘বগুড়ায় সাংস্কৃতিক অঙ্গন উজ্জীবিত হয়নি, এমনকি মুক্তিযদ্ধের ভাস্কর্যগুলোরও বেহাল অবস্থা। বগুড়াবাসীর একটি দাবি ছিল বিজয়স্তম্ভ করার। এ ছাড়া ফুটবল খেলার মাঠ ও একটি সরকারি স্কুলও ছিল জরুরি।’

বগুড়া-১ আসনে আগেরবারও সংসদ সদস্য ছিলেন সরকারদলীয় আব্দুল মান্নান। এবারও তিনি সংসদ সদস্য। প্রতিশ্রুতি পূরণ প্রসঙ্গে আব্দুল মান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, এই আসনে প্রতিশ্রুতির বেশি উন্নয়ন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন ধরে রাখতে সাধ্যমত চেষ্টা চালিয়ে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রায় বেশির ভাগই পূরণ করতে পেরেছি। এখন আরো কিছু মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এগুলোর কয়েকটি দরপত্র প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। অন্য প্রতিশ্রুতিগুলোও পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।

জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ দশম সংসদে বগুড়া-২ আসনের সদস্য ছিলেন। এবারও তিনি ওই আসনের সংসদ সদস্য। জিন্নাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। কিন্তু অনেক সময় পরিকল্পনা মতো সব হয় না।’

বগুড়া-৬ (সদর) আসনে আগেরবার সংসদ সদস্য ছিলেন জাতীয় পার্টির মো. নুরুল ইসলাম ওমর। বর্তমান সংসদে আসনটি বিএনপির দখলে।

জানতে চাইলে নুরুল ইসলাম ওমর কালের কণ্ঠকে বলেন, গতানুগতিক উন্নয়নের বাইরে সরকারের আগ্রহ দেখা যায়নি। সে কারণে বগুড়ার মূল উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য জি এম সিরাজ বলেন, ‘আমি নতুন সংসদ সদস্য। পর্যায়ক্রমে আমি সব উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চাই। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সরকারের সাহায্য দরকার।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা