kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

পুলিশ ‘টেনশনে’ মাদক নিয়ে

লিমন বাসার, বগুড়া   

২২ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পুলিশ ‘টেনশনে’ মাদক নিয়ে

বগুড়ায় অন্য অপরাধ কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে থাকলেও কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না মাদক কারবারিদের। মাদক কারবার নিয়ে একাধিক খুনের ঘটনাও ঘটেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোয়েন্দারা বলছেন, বগুড়ায় মাদক নিয়ে ‘টেনশনে’ আছে পুলিশ। কিন্তু মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও পুলিশের কিছু অসাধু কর্মকর্তার কারণে মাদকের বিস্তার রোধ করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

মাদক কারবার নিয়ে খুন : গত ৭ আগস্ট বগুড়া শহরের সুলতানগঞ্জপাড়ার ঈদগাহ লেনে প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে ভোলা মিয়া (৩২) নামের এক যুবক খুন হন। এর ১০ দিন পর ১৭ আগস্ট সাবগ্রাম চান্দুপাড়া এলাকায় হাবিল (৪৫) নামের একজনের একটি পা কেটে নিয়ে যায় প্রতিপক্ষ। গত বছর ৮ মে শিবগঞ্জ উপজেলার বাদলাদীঘি গ্রামের ডাবইর এলাকায় চার যুবককে গলা কেটে ও এক সন্ত্রাসীকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। এসব ঘটনা মাদক কারবারের জের ধরে ঘটেছে বলে পুলিশের তদন্তে জানা গেছে। শহরের ফুলবাড়ী দক্ষিণপাড়ায় গত বছরের ৮ মে মাদক কারবারি রুবেল হোসেনকে (৩২) পিটিয়ে হত্যা করেছে স্থানীয় লোকজন।

পুলিশের একাধিক সূত্র বলছে, ফেনসিডিল ও ইয়াবার চালান মাঝেমধ্যেই ধরা হলেও কার্যত মাদকের আগ্রাসন কয়েকগুণ বেড়েছে।

মাদক কারবারিদের কৌশল পরিবর্তন : অচেনা জায়গা ও পুলিশের সন্দেহের বাইরের স্পটগুলোকে বেছে নিয়েছে মাদক কারবারিরা। ব্যবহার করা হচ্ছে নারীদের। সম্প্রতি শহরের বিভিন্ন অভিজাত অ্যাপার্টমেন্টে অভিযান চালিয়ে চার বোনসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। তাদের কাছে পাওয়া যায় দুই হাজার ১০০টি ইয়াবা ট্যাবলেট। এর আগে ৮ মার্চ এক নারী মাদক বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। একাধিকবার পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয় সেউজগাড়ি এলাকার মাদক কারবারি দম্পতি তাসলি বেগম ও তাঁর স্বামী আলম। গত ৭ এপ্রিল ২০০ ইয়াবাসহ যুব মহিলা লীগ নেত্রী শিল্পী বেগমকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। মাসখানেক আগে পুলিশের তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি রিনা বেগমের লাশ উদ্ধার করা হয়।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলছে, বগুড়া শহর ও শহরতলীর অর্ধশতাধিক স্থানে চলছে মাদক কারবার। নারীদের সামনে রেখে আড়াল থেকে এ কারবার নিয়ন্ত্রণ করছেন প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। বাদুড়তলা, চকসূত্রাপুরের হাড্ডিপট্টি ও সেউজগাড়ি রেলওয়ে কলোনি ঘিরে মাদকের রমরমা কারবার চলছে। এ ছাড়া গণ্ডগ্রাম, চকসূত্রাপুর চামড়াপট্টি, চকফরিদ, শাপলা মার্কেট, কৈগাড়ি, চেলেপাড়াসহ বেশ কিছু এলাকায় মাদকের আস্তানা রয়েছে। এসব স্থানে ফেনসিডিল, হেরোইন, ইয়াবা, চোলাই মদসহ নানা ধরনের মাদকদ্রব্য পাওয়া যায়।

জেলার ধুনট উপজেলার গোসাইবাড়ী এলাকার শীর্ষস্থানীয় মাদক কারবারি সোহাগ কাজী, সুরুজ, লেমন, শ্যামল, শাওনসহ ২০-২৫ জন দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবার করে আসছে। ধুনট থেকে সারিয়াকান্দির ভেলাবাড়ী, কামালপুর, চন্দনবাইশা ও কুতুবপুরে ঢুকছে হেরোইন ও ইয়াবা।

মাদকপাচারের চার পথ : অনুসন্ধানে জানা গেছে, সীমান্তের ওপার থেকে বগুড়ায় মাদক আসছে চারটি পথে। দিনাজপুরের হিলি ও জয়পুরহাটের পাঁচবিবি, নওগাঁ ও জেলার ধামইরহাট সীমান্তের ওপার থেকে চোরাকারবারিরা হিলি-গোবিন্দগঞ্জ-বগুড়া, হিলি-কালাই-বগুড়া, হিলি বা ধামইরহাট-মোলামগাড়ি-বগুড়া ও নওগাঁ-বগুড়া পথে মাদক আসছে। এসব মাদকের কিছু বিক্রি হচ্ছে বগুড়ায়। বাকি মাদক যাচ্ছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়।

মাদক কারবারিদের সঙ্গে আঁতাত : অভিযোগ আছে, মাদক কারবারিচক্রের সঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও পুলিশের কিছু অসাধু কর্মকর্তার আঁতাত রয়েছে। মাঝেমধ্যে পুলিশের সঙ্গে লেনদেনের টানাপড়েনের ফলে দু-একটি বড় চালান ধরা পড়ে। কিন্তু মামলায় প্রকৃত কারবারিদের নাম আসে না। মাদক কারবারিচক্রের কাছ থেকে বড় অঙ্কের মাসোয়ারার লোভে তদবির করে জেলার থানা ও গোয়েন্দা শাখায় বছরের পর বছর ধরে আছেন বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা। মাঝেমধ্যে ফেনসিডিল ও ইয়াবার বড় চালান আটক হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আটক মাদকদ্রব্যের অর্ধেকই কারবারিদের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বগুড়ায় ফেনসিডিলের সিংহভাগ চালান পাঠায় জয়পুরহাটের শাহাদত। বগুড়া শহরের ফুলবাড়ী এলাকায় তাঁর শ্বশুরবাড়ি। শাহাদতের মাইক্রোবাস বোঝাই ফেনসিডিল আটক হলেও তাঁর নামে মামলা না হওয়ার ঘটনা আছে। এমনকি মাদকের ওই চালানটি যার কাছে যাচ্ছিল সেই শীর্ষ কারবারি রজবকেও আসামি করা হয়নি। চালানটি আটক করেছিল ডিবির একটি দল।

মাদক ছাড়লেও পুলিশ ছাড়ে না : গত ১৪ সেপ্টেম্বর পুরান বগুড়ার রাশিদা বেগম (মনু) সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেন, দুই বছর আগে মাদক কারবার ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও পুলিশ তাঁকে এখনো হয়রানি করছে। তাঁর কাছে অর্থসহ নানা অন্যায় দাবি করছে। তিনি দাবি করেন যে পুলিশের অত্যাচারে তিনি ভিটাবাড়ী ছেড়ে এখন অন্যত্র বসবাস করছেন।

গত ৫ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলন করে মাদক কারবার ছাড়ার ঘোষণা দেন সেউজগাড়ী পালপাড়ার বাসিন্দা আলম আকন্দ ও তাঁর স্ত্রী তাছলিমা বেগম। তাঁরা বলেন, অভাবের তাড়নায় কিছুদিন মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েছিলেন তাঁরা। এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান। পুলিশ যেন তাঁদের হয়রানি না করে। পুলিশের প্রতি একই অনুরোধ জানিয়েছেন শাজাহানপুর উপজেলার সাজাপুর গ্রামের রেহেনা বেগম।

ছিনতাই-চাঁদাবাজি : শহরের ঠনঠনিয়া এলাকার বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে, পিটিআই মোড়ে, কানুছগাড়ি মোড়ে ও সূত্রাপুরসহ নানা স্থানে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। আজিজুল হক কলেজের এক ছাত্রী গত বৃহস্পতিবার ফোন করে এ প্রতিবেদককে জানান, ওই দিন সন্ধ্যায় রিকশায় করে যাওয়ার সময় করতোয়া মাল্টিমিডিয়া স্কুলের সামনে ছিনতাইকারীরা তাঁর হাতব্যাগ ছিনিয়ে নিয়েছে। মোটরসাইকেল আরোহী দুই ছিনতাইকারীর মাথায় ছিল হেলমেট, হাতে ছিল আগ্নেয়াস্ত্র।

পুলিশের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে গিয়ে চাঁদা নেওয়ার তথ্যও রয়েছে। সম্প্রতি শহরের খান্দার এলাকার চার হোটেল শ্রমিককে ধরে নিয়ে যায় শহরের কৈগাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির একটি দল। এরপর ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শক হরিদাস তাদের প্রত্যেকের কাছে ২০ হাজার টাকা করে চাঁদা দাবি করেন। পরে তারা ১৫ হাজার টাকা দিয়ে ছাড়া পায়। আসামি ধরা-ছাড়ার এই বাণিজ্য এখন জেলার প্রতিটি পুলিশ ফাঁড়ি ও তদন্তকেন্দ্রগুলোয় আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞা কালের কণ্ঠকে বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করা হয়েছে। বগুড়াকে মাদকমুক্ত করতে অভিযান অব্যাহত রেখেছি। পুলিশের কেউ মাদক কারবারিদের সঙ্গে আঁতাত বা লেনদেন করেছে—এমন প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ এবং বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ছাড়া ছিনতাই ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা