kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ওয়ার্কার্স পার্টি ভাঙনের মুখে!

► আওয়ামী লীগ ‘তোষণনীতি’ ছাড়ার জোর দাবি
► ভাঙন ঠেকাতে সরকারের সমালোচনা মেননের

তৈমুর ফারুক তুষার   

২১ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ওয়ার্কার্স পার্টি ভাঙনের মুখে!

ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কংগ্রেস সামনে রেখে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য চরমে উঠেছে। দলের একটি বড় অংশ ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগকে ‘তোষণ করার নীতি’ ছাড়ার পক্ষে। তাদের মতে, ওয়ার্কার্স পার্টির উচিত তার কমিউনিস্ট আদর্শকে প্রাধান্য দিয়ে জনগণের পক্ষে রাজনীতি করা। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলে থেকে ওয়ার্কার্স পার্টি জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। এখন পার্টির উচিত, বৃহৎ বাম ঐক্য গড়ে তুলে সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া। দলের বেশির ভাগ নেতাকর্মীর সরকারবিরোধী কঠোর মনোভাব বুঝতে পেরে সম্ভাব্য ভাঙন ঠেকাতে সরকারের সমালোচনায় সরব হয়েছেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। ওয়ার্কার্স পার্টির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, আগামী ২ থেকে ৫ নভেম্বর ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কংগ্রেস। ওই কংগ্রেস সামনে রেখে দলের বর্তমান নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন কেন্দ্রীয় পলিটব্যুরোর বেশ কয়েকজন সদস্য। তাঁদের সঙ্গে একমত হয়ে অবস্থান নিচ্ছেন জেলা পর্যায়ের নেতারাও। ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বগুড়া, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহসহ বেশ কয়েকটি জেলার গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতা ওয়ার্কার্স পার্টির বর্তমান নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।

জানা গেছে, ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক বিমল বিশ্বাস, পলিটব্যুরোর সদস্য মনোজ সাহা, নুরুল হাসান, ইকবাল কবির জাহিদ আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঐক্য করে সরকারের অন্যায় কর্মকাণ্ডে সমর্থন জোগানোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের মতে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণকে সমর্থন জানিয়ে ওয়ার্কার্স পার্টির দীর্ঘদিনের সংগ্রামী ইতিহাসকে কলঙ্কিত করা হয়েছে। সরকারের সঙ্গে থেকে ওয়ার্কার্স পার্টির একাধিক সংসদ সদস্য অনিয়ম, দুর্নীতিতে যুক্ত হয়েছেন। সরকারের হেফাজত তোষণের নীতির বিরুদ্ধেও সোচ্চার হয়নি ওয়ার্কার্স পার্টি। ফলে পার্টি তার কমিউনিস্ট আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছে।

দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বিমল বিশ্বাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওয়ার্কার্স পার্টি এখন আর কমিউনিস্ট পার্টি নয়। ফলে আমি এই পার্টি থেকে সদস্যপদ প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। মঙ্গলবারের মধ্যেই আমি সদস্যপদ প্রত্যাহার করে নেব।’

আগামী কংগ্রেসের মধ্য দিয়ে দল ভাঙছে কি না, জানতে চাইলে বিমল বিশ্বাস বলেন, ‘আমি আমার সদস্যপদ প্রত্যাহার করব। এটা গণতান্ত্রিক অধিকার। এরপর যদি অন্য নেতারা তাঁদের পদ প্রত্যাহার করে নেন তাহলে তো আমার কিছু বলার নেই। আমি দেখব, কয়টা জেলার নেতারা কংগ্রেস প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর জেলার নেতাদের সঙ্গে বসে আমাদের পরবর্তী রাজনৈতিক করণীয় ঠিক করব। আমরা মনে করি, কমিউনিস্ট পার্টি হিসেবে আমাদের এখন বাম ঐক্য গড়ে তুলে সাধারণ মানুষের পক্ষে রাজনীতি করা উচিত।’

এদিকে কংগ্রেস সামনে রেখে ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা সম্মেলনগুলোতে ভিন্নমত অবলম্বনকারীদের প্রস্তাব নিয়ে ব্যাপক তর্ক-বির্তক হচ্ছে। গত সপ্তাহে বগুড়া জেলার সম্মেলনে পাল্টাপাল্টি কমিটিও হয়েছে। ওয়ার্কার্স পার্টি সমর্থক ছাত্রসংগঠন ছাত্রমৈত্রীর সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের অনেকেই ভিন্নমত অবলম্বনকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

দলীয় কয়েকটি সূত্রে জানা যায়, ওয়ার্কার্স পার্টির বর্তমান নীতির বিরোধিতাকারীরা ভিন্ন একটি দল গঠন করে বাম জোটের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহেই তাঁরা দল গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছেন। বিমল বিশ্বাসকে সভাপতি করে ওই দল গঠন করা হবে।

সূত্র মতে, ১৯৯২ সালে তিনটি বাম দল মিলে ওয়ার্কার্স পার্টি গঠন করা হয়েছিল। একসময় চীনপন্থী ধারায় সংগঠন করা নেতারাই এখন ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আছেন। ফলে দলটির মধ্যে বরাবরই আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঐক্য করে ক্ষমতায় যাওয়া নিয়ে বিরোধ ছিল। এবার এই বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে। দলটির গুরুত্বপূর্ণ দুই নেতা বিমল বিশ্বাস ও ইকবাল কবির জাহিদ নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেও সংসদ সদস্য হতে পারেননি। ফলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট থেকে বেরিয়ে আসতে তাঁরা তৎপর হয়েছেন। দলের অভ্যন্তরে সরকারবিরোধী মনোভাব চাঙ্গা হওয়ায় আসছে কাউন্সিলে দলে ভাঙন ঠেকাতে সরকারের বিরোধিতায় সরব হয়েছেন রাশেদ খান মেনন। সম্প্রতি দলের এক অনুষ্ঠানে তিনি একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ভোটগ্রহণ নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে মেনন এমন সমালোচনা করেন।

এ বিষয়ে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওয়ার্কার্স পার্টির সব কাউন্সিলেই ভিন্নমত আসে। সেগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। অনেক সময় ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়। এবারও তাই হবে। কয়েকটি জেলা এরই মধ্যে ভিন্নমত যাঁরা পোষণ করেছেন তাঁদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। কিছু জেলায় তাঁদের প্রস্তাব সমর্থন পায়নি।’

দলে ভাঙনের সম্ভাবনা প্রসঙ্গে মেনন বলেন, ‘আমাদের এখানে ভিন্নমত চর্চার সুযোগ আছে। তবে কেউ যদি দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে ভিন্ন দল গঠন করতে চায়, আমাদের তো কিছু করার নেই।’

দলের অভ্যন্তরীণ চাপে সরকারের বিরোধিতায় সরব হয়েছেন কি না, জানতে চাইলে মেনন বলেন, ‘আমি মন্ত্রী থাকার সময়ও সরকারের বিরোধিতা করেছি। আমাদের পার্টি ফোরামে সরকারের বিরুদ্ধে অনেক সমালোচনা প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। ফলে আমি নতুন করে সরকারের সমালোচনায় নামিনি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা