kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

চার কারণে কাউন্সিল করতে পারছে না বিএনপি

শফিক সাফি   

২১ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চার কারণে কাউন্সিল করতে পারছে না বিএনপি

দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির গঠনতন্ত্রে রয়েছে, প্রতি তিন বছর পর পর কাউন্সিল করতে হবে। কিন্তু সেই মেয়াদ শেষ হয়ে সাত মাস পেরোলেও কাউন্সিল করতে পারেনি দলটি। তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ চলতি বছর ডিসেম্বরে নিজেদের ২১তম কাউন্সিল করতে যাচ্ছে। তাই বিএনপির সপ্তম কাউন্সিল নিয়ে তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় নেতাদেরও জিজ্ঞাসা—‘কবে হবে আমাদের কাউন্সিল।’ যদিও এ প্রশ্নের সদুত্তর শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কাছেও নেই। তবে দলটির একাধিক নেতার সঙ্গে আলোচনায় জানা গেছে, চারটি কারণে বিএনপি তাদের কাউন্সিল এখনই করতে পারছে না।

কারণগুলো হচ্ছে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবন্দি থাকা, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সাজাপ্রাপ্ত হওয়ায় দেশের বাইরে অবস্থান করা, সংগঠনের পুনর্গঠনপ্রক্রিয়া শেষ করতে না পারা, কাউন্সিল সুষ্ঠুভাবে করার ক্ষেত্রে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা করার বিষয় এবং সরকারের হস্তক্ষেপ না করার নিশ্চয়তা না পাওয়া।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সারা দেশে সর্বস্তরে কমিটি গঠনের কাজ শেষে কাউন্সিলরের চূড়ান্ত তালিকা সম্পন্ন হওয়ার পরপরই জাতীয় কাউন্সিল হবে। এর মানে হচ্ছে—দুই দিন আগে বা পরে হোক, সব প্রস্তুতি শেষে আমাদের কাউন্সিল সম্মেলন হবে। এ নিয়ে সংশয়ের কিছু নেই।’

গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘আমাদের মহাসচিব বলেছেন, কাউন্সিলের প্রস্তুতি চলছে। আমরা প্রস্তুতি শেষ করতে পারলে কাউন্সিলের তারিখ ঘোষণা করব।’

তবে দলটির একাধিক নীতিনির্ধারকের তথ্য মতে, কাউন্সিল করতে তাঁদের সময় লাগবে। সম্ভবত আগামী বছরের প্রথম ধাপে তাঁরা সম্মেলনের প্রস্তুতি নিতে পারবেন। চলতি বছরের শেষ দিকে কাউন্সিল হতে পারে, এমন একটি আভাস দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দিলেও সেটি সম্ভব হচ্ছে না, কারণ সার্বিক প্রস্তুতি নেই। চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এখনো কারাবন্দি। তিনি মুক্ত না হলে আপাতত কাউন্সিল থেকে বিরত থাকার নীতিগত প্রাথমিক সিদ্ধান্তও রয়েছে নেতাদের।

নির্ধারকদের মতে, চেয়ারপারসনকে ছাড়া কাউন্সিল মানে অভিভাবককে মাইনাস করে কাজ করা। সেটি সিনিয়র নেতারা করতে চাচ্ছেন না। নেতাদের বিশ্বাস, যেকোনো সময় খালেদা জিয়া মুক্ত হবেন এবং তাঁর উপস্থিতিতেই সম্মেলন হবে। দ্বিতীয়ত, যদি খালেদা জিয়া সম্মতি দেন, সে ক্ষেত্রে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কাউন্সিলে সভাপতিত্ব করবেন। কিন্তু তিনি দেশে নেই। স্কাইপে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে হয়তো থাকতে পারবেন। কিন্তু সে ক্ষেত্রে আশঙ্কা, পুরো সময়জুড়ে সরকার হয়তো যোগাযোগের সব মাধ্যম বন্ধ রাখবে। সে ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে, যা নিয়ন্ত্রণের বাইরেও চলে যেতে পারে। এ ছাড়া তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারের ক্ষেত্রে আদালতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফলে তাঁর বক্তব্য দেশের মানুষ কোনো মাধ্যম থেকেই জানতে পারবে না।

নেতারা বলছেন, তৃতীয় যে সমস্যা সেটি কাটিয়ে উঠতেও সময় লাগবে। সারা দেশে দলের ৮১টি সাংগঠনিক জেলার বেশির ভাগেরই কমিটি পুনর্গঠন সম্ভব হয়নি। নতুন করে ১৯টি জেলায় আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। এগুলো হলো নীলফামারী, হবিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নওগাঁ, যশোর, বগুড়া, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, সৈয়দপুর, পাবনা, নাটোর, রাজশাহী, নেত্রকোনা, পঞ্চগড়, ঝিনাইদহ, মাগুরা, চট্টগ্রাম দক্ষিণ, ফেনী ও সিলেট। তিন মাসের জন্য গঠিত এ আহ্বায়ক কমিটিগুলোর মধ্যে ১২টির মেয়াদ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে।

৮১টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে ৯টি সাংগঠনিক জেলার আংশিক থেকে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হয়েছে। এগুলো হলো জামালপুর, লালমনিরহাট, খাগড়াছড়ি, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ, জয়পুরহাট ও শেরপুর। একই অবস্থা অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর ক্ষেত্রেও। সূত্র মতে, মহিলা দল, মুক্তিযোদ্ধা দল ও শ্রমিক দলের মেয়াদ শেষ। কৃষক দল, মৎস্যজীবী দল ও তাঁতী দলের আহ্বায়ক কমিটি করা হয়েছিল, সেগুলোর মেয়াদও শেষ। চলতি মাসে স্বেচ্ছাসেবক দল ও সামনের বছরের জানুয়ারি মাসে শেষ হবে যুবদলের কমিটির মেয়াদ। কাউন্সিল সামনে রেখে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সাংগঠনিক ৮১টি জেলা গুছিয়ে ফেলতে চাপ রয়েছে হাইকমান্ডে।

এ ছাড়া কাউন্সিল না হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে কাউন্সিল সুষ্ঠুভাবে করার ক্ষেত্রে দলীয় শৃঙ্খলা ও সরকারের হস্তক্ষেপ না করার নিশ্চয়তা পাওয়ার বিষয়টি। দলটির নেতারা বলছেন,  ষষ্ঠ কাউন্সিলের প্রস্তুতি কমিটি ও ১১টি উপকমিটি ছিল। প্রায় তিন হাজার কাউন্সিলর এতে অংশ নেন। কাউন্সিলর, ডেলিগেট, আমন্ত্রিত অতিথি ও উত্সুক নেতাকর্মী মিলিয়ে উপস্থিতির সংখ্যা ছিল লক্ষাধিক। কাউন্সিল ভেন্যু, মঞ্চ ও আগতদের বসার স্থান, আমন্ত্রিত অতিথিদের বসার স্থানসহ মহা এই আয়োজনে শৃঙ্খলা বজায় রাখা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে উপস্থিত কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হয়। দলের হাইকমান্ড উপস্থিত না থাকলে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা রয়ে যায়। এমনিতেই সরকার সুযোগ নিতে চায়।

ষষ্ঠ কাউন্সিলের জন্য স্থান দিতে সরকার নানা টালবাহানা করে হয়রানি করেছে। কাঠখড় পুড়িয়ে কাউন্সিলের স্থান পেলেও সেটিকে উপযুক্ত অবস্থানে নিতে বেগ পেতে হয়েছে। কাউন্সিলরদের সম্মেলনে যোগ দিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধাসহ নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে সে সময়। সে বিষয়টিও কাউন্সিলের আগে ভেবে দেখতে হবে।

জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহাজাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, সাংগঠনিক জেলাগুলোর কাজ প্রায় শেষ। ১৯-২০ কমিটির পূর্ণাঙ্গ করলেই প্রস্তুতি শেষ হয়ে যাবে। ডিসেম্বরের আগেই সেটি করার নির্দেশনা রয়েছে।

উল্লেখ্য, বিএনপির সর্বপ্রথম কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর। দ্বিতীয়টি ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারি, তৃতীয় ১৯৮৯ সালের মার্চ, চতুর্থ ১৯৯৩ সালের সেপ্টেম্বর, পঞ্চম ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর এবং সর্বশেষ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল হয় ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা