kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

‘অতি’ অতিরিক্ত সচিবে আরো ভারসাম্যহীনতার পথে প্রশাসন

বাহরাম খান   

১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘অতি’ অতিরিক্ত সচিবে আরো ভারসাম্যহীনতার পথে প্রশাসন

উপসচিব, যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিব পদে চাহিদা না থাকলেও পদোন্নতির ধারা থামছেই না। প্রশাসনে এই তিনটি পদের বিপরীতে এখনই কয়েক গুণ বেশি কর্মকর্তা আছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ অতিরিক্ত সচিব পদে আছেন চার গুণ। তার পরও এই পদে নতুন পদোন্নতির প্রক্রিয়া চলছে। নতুন পদোন্নতি প্রক্রিয়া শেষ হলে এই পদে কর্মকর্তার সংখ্যা বেড়ে হবে ছয় থেকে সাত গুণ। এতে করে প্রশাসন আরো ভারসাম্যহীনতার দিকে যাচ্ছে।

পিরামিড আকৃতি হিসেবে প্রশাসনের নিচের স্তরে বেশি এবং ওপরের স্তরে কম কর্মচারী থাকার কথা। বাস্তবে সচিব পদ ছাড়া প্রশাসনের সব পদেই উল্টো অবস্থা বিরাজ করছে। অর্থাৎ যেখানে কর্মচারীর সংখ্যা বেশি থাকার কথা সেখানে কম আছে। যেখানে প্রয়োজন নেই সেখানেই আছে বেশি। প্রশাসনে অতিরিক্ত সচিবের অনুমোদিত পদ ১২২টি। বর্তমানে এই পদে আছেন ৪৫৮ জন। যুগ্ম সচিবের পদ ৩৮৮টি, বর্তমানে আছেন ৮৪১ জন। উপসচিবের পদসংখ্যা এক হাজার ৩৩০টি, কর্মরত এক হাজার ৭০০ জন। কিন্তু এর উল্টো চিত্র নিচের দুটি পদের ক্ষেত্রে। সিনিয়র সহকারী সচিবের অনুমোদিত পদসংখ্যা দুই হাজার ১৩১টি, এর বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত এক হাজার ৫২৭ জন। সহকারী সচিবের প্রায় দুই হাজার পদের চাহিদার বিপরীতে কর্মরত এক হাজার ৫৫৯ জন। তবে প্রশাসনের সর্বোচ্চ সচিব পদে ভারসাম্য বরাবরই বজায় রাখা হয়। বর্তমানে সচিব ও সচিব মর্যাদায় কর্মরত ৮২ জন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অতিরিক্ত সচিব মর্যাদায় নতুন করে পদোন্নতি শিগগিরই হতে যাচ্ছে। তাতে এই পদে কর্মচারীর সংখ্যা দাঁড়াবে কমবেশি ৭০০ জন। এই সাত গুণ পদায়নকে অনেকে প্রশাসনের অস্বাভাবিক অবস্থা বলে অভিহিত করছেন।

অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির পরপরই আলোচনায় আসবে উপসচিবদের পদোন্নতির বিষয়টি। এই পদেও প্রয়োজনের চেয়ে ৪০০ জন বেশি আছেন।

প্রয়োজন না থাকলেও প্রশাসনে পদোন্নতির এই যে পর্যায়ক্রমিক ধারা চলছে তা কেন থামছে না—এমন প্রশ্নের জবাবে জনপ্রশাসনসচিব ফয়েজ আহম্মদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মুসলেহ উদ্দিন আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিচের পদ খালি রেখে ওপরের দিকে বেশি অফিসার থাকলে তো ভারসাম্যহীনতা আসেই।’ তবে তিনি মনে করেন, দেশে প্রশাসনে কাজের বৈচিত্র্য বেড়েছে। তাই ওপরের দিকে আরো পদ সৃষ্টি করে যোগ্যদের পদোন্নতি দেওয়া উচিত।

জনপ্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, অতিরিক্ত সচিব পদটি মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে কম প্রয়োজনীয় পদ। মন্ত্রণালয় বা বিভাগ পরিচালনার যে প্রক্রিয়া তা প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে সচিব এবং অনুবিভাগ প্রধান হিসেবে যুগ্ম সচিবদের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। বিশেষ কোনো মন্ত্রণালয় বা বড় কাজের চাপ বা গুরুত্বের জন্য সচিবকে সহযোগিতা করতে একজন অতিরিক্ত সচিব প্রয়োজন হয়। কিন্তু এখন এমনও মন্ত্রণালয়-বিভাগ আছে যেখানে একজনের জায়গায় আট থেকে ৯ জন অতিরিক্ত সচিব আছেন। যেমন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে এখন অতিরিক্ত সচিবের সংখ্যা আট, জনপ্রশাসনে ৯।

অতিরিক্ত সচিব বেশি হওয়ার কারণে যুগ্ম সচিবদের জায়গায় সব অনুবিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন অতিরিক্ত সচিবরা। যুগ্ম সচিবরা ইনসিটু (পদোন্নতি পেলেও আগের পদে) থেকে করছেন উপসচিবের কাজ। এমনও অনুবিভাগ আছে যেখানে দুজন করে অতিরিক্ত সচিব কাজ করছেন, যা প্রশাসনের চরম ভারসাম্যহীনতার বহিঃপ্রকাশ।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের মাধ্যমিক অনুবিভাগ একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে চলত, কিন্তু এখন সেখানে দুজনকে দায়িত্ব দিয়ে একটি অনুবিভাগকেই দুই ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। একই বিভাগের বিশ্ববিদ্যালয় অনুবিভাগেও একই অবস্থা।

প্রশাসনের ক্যাডারের বাইরে অন্য খাতগুলোতে এক পদে ৮-১০ বছর পর্যন্ত পদোন্নতির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু প্রশাসন ক্যাডারে পদ ছাড়াই পদোন্নতি পেয়ে ওপরে উঠে যান কর্মচারীরা। অন্য খাতসংশ্লিষ্টরা একে বৈষম্য বলে অভিহিত করলেও কোনো সরকারই তা নিরসনে উদ্যোগ নেয়নি।

জনপ্রশাসনসংক্রান্ত একাধিক বইয়ের লেখক ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. ফিরোজ মিয়ার মতে, ‘পদোন্নতি ব্যক্তিস্বার্থে হয় না, হয় জনস্বার্থে। কিন্তু আমাদের দেশে তা কতটুকু জনস্বার্থে হয় সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে।’ তিনি আরো বলেন, এক পদে অপ্রয়োজনীয়ভাবে অতিরিক্ত পদোন্নতি দিলে তদবিরবাজরা গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নেয়। ভালো অফিসাররা পদের জন্য তদবির করেন না।’

প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সচিব পদে বেশি লোকবল থাকার বিষয়টি স্বীকার করে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অভিজ্ঞতার কারণে সিনিয়রদের পদোন্নতি দেওয়া হয়। তবে ক্যারিয়ার প্ল্যানিং চূড়ান্ত হলে এমনটা আর থাকবে না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা