kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সম্পদ নয়, দুর্গন্ধ দূষণ ১০ সিটির বিপুল বর্জ্যে

শাখাওয়াত হোসাইন   

১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সম্পদ নয়, দুর্গন্ধ দূষণ ১০ সিটির বিপুল বর্জ্যে

বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করার নজির আছে দেশে দেশে। কিন্তু এ দেশে বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করা দূরের কথা, ঢাকার দুটি ছাড়া বাকি ১০ সিটি করপোরেশন বৈজ্ঞানিক উপায়ে তা ব্যবস্থাপনাই করতে পারছে না। ১২ সিটি কর্তৃপক্ষ দিনে প্রায় ৯ হাজার টন বর্জ্য কোনো রকমে ডাম্প করেই দায় সারছে। বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করতে বেশ কয়েকটি সিটি করপোরেশন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠালেও এখনো তা ঝুলে আছে। বর্জ্য ফেলার ভাগাড় ভরাট হয়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন ওই সব সিটি করপোরেশন। তবে প্রাথমিকভাবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করার একটি প্রকল্প পাস হওয়ার অপেক্ষায় আছে বলে জানা গেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় সূত্রে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ঢাকার দুই সিটিতে দিনে প্রায় এক হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। দুই সিটি করপোরেশনের আলাদা ল্যান্ডফিল আছে। কিন্তু বিপুল পরিমাণ বর্জ্য সম্পদে পরিণত করা যাচ্ছে না। ফলে আরো ১৬০ একর জমি অধিগ্রহণ করার প্রক্রিয়া চলছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) গত বছর প্রকল্প প্রস্তাব পাঠালেও তা এখনো অনুমোদন পায়নি। তবে ডিএনসিসির একটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে দেশব্যাপী পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রথমে ডিএনসিসির একটি প্রকল্পের মাধ্যমে শুরু করা হবে। ওই প্রকল্পের অভিজ্ঞতা নিয়ে বাস্তবায়ন করা হবে অন্যগুলোতেও।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) সূত্রে জানা যায়, দৈনিক আড়াই হাজার টন বর্জ্য সংগ্রহ করে তা ফেলা হয় নগরীর দক্ষিণ প্রান্তে হালিশহরে এবং পশ্চিম প্রান্তে আরেফিননগরে ভাগাড়ে। দীর্ঘদিন ধরে বর্জ্য ফেলায় দুটি ভাগাড়ই পূর্ণ হয়ে গেছে। এ ছাড়া দুর্গন্ধ বিষিয়ে তুলেছে আশপাশের জনজীবন। সনাতন পদ্ধতিতে বর্জ্য সংগ্রহ করে উন্মুক্ত ভাগাড়ে ফেলায় নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ। বর্জ্যের পরিমাণ বৈজ্ঞানিকভাবে কমিয়ে তা সম্পদে পরিণত করার প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করেন চসিক মেয়রও। কিন্তু নিজস্ব অর্থ না থাকায় এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় তা করতে পারছে না সংস্থাটি। সনাতন পদ্ধতিতে বর্জ্য ফেলার জন্য জমি অধিগ্রহণও করা যাচ্ছে না অর্থাভাবে।

চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সনাতন পদ্ধতিতে বর্জ্য সংগ্রহ ও পরিবহনের জন্য অতিরিক্ত অর্থ খরচ হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিবেশের মারাত্মক দূষণ হচ্ছে। এ ছাড়া নিজস্ব অর্থ না থাকায় বর্জ্যের ভাগাড় নির্মাণের জন্য জমি কেনা যাচ্ছে না। চট্টগ্রামের দুটি ভাগাড়ে বর্জ্য ফেলার মতো অবস্থা নেই।’

গাজীপুর সিটি করপোরেশনে দৈনিক প্রায় তিন হাজার টন বর্জ্য কোনাবাড়ীর কর্দা, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি এবং রাস্তার পাশে ফেলা হচ্ছে। নিজস্ব কোনো জমি নেই ওই সিটি করপোরেশনের। জমি পেতে জেলা প্রশাসনের অসহযোগিতার অভিযোগ করেছেন সংস্থাটির মেয়র।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র জাহাঙ্গীর আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জমি না থাকায় যেখানে-সেখানে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ফেলতে হচ্ছে। ডিসি অফিসে জমি বরাদ্দ চেয়েও পাইনি। জমি না থাকায় কোনো প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।’

দিনে প্রায় ৮০০ টন বর্জ্য সংগ্রহ করে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)। প্রতিদিনই বর্জ্য সংগ্রহের পরিমাণ বাড়ছে সংস্থাটির। শহর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে লালমাটিয়ায় ফেলা হয় ওই সব বর্জ্য। ভাগাড়টির কোনো সীমানাপ্রাচীর ও শোধনাগার না থাকায় দূষণ ছড়াচ্ছে। সাত একর আয়তনের ওই জায়গাটি ভরাট হয়ে পানি ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের জমিতে। সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী জানান, ঝাঁশিটোলা এলাকায় ভাগাড়ের জন্য জমি নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু জেলা প্রশাসকের কার্যালয় তা বরাদ্দ দিতে পারেনি। ফলে বিদ্যমান ভাগাড়ের দূষণ রোধ করতে চারপাশে দেয়াল ও শোধনাগার বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। 

ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন দৈনিক ৪০০ টনের মতো বর্জ্য সংগ্রহ করে। আরো ৩০ শতাংশ বর্জ্য এখনো সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। ১৯৮৮ সাল থেকে তৎকালীন ময়মনসিংহ পৌরসভার বর্জ্য ফেলা হচ্ছিল ব্রহ্মপুত্র সেতুর পূর্ব দিকে চর-ঈশ্বরদিয়ায়। প্রায় সাত একর আয়তনের ভাগাড়টি বর্জ্যে একেবারে পূর্ণ হয়ে গেছে। ফলে এখন বর্জ্য ফেলা হচ্ছে ময়মনসিংহ-নেত্রকোনা সড়কের ওপরেও। দুর্গন্ধ আর দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে পুরো এলাকায়। ভাগাড়টির পাশে আরো তিন একর জায়গা অধিগ্রহণ করার কাজ শুরু হয়েছে।

ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের মেয়র ইকরামুল হক টিটু জানান, ইউরোপের একটি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন ও কারিগরি সহযোগিতায় বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও জৈব সার উৎপাদনের লক্ষ্যে কাজ করছেন তাঁরা। সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয়েছে শুধু।

খুলনা সিটি করপোরেশনের সংগ্রহ করা দৈনিক প্রায় ৪৫০ টন বর্জ্য ফেলা হয় রাজবাগ এলাকায়। পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা আনিছুর রহমান জানিয়েছেন, ২৫ একরের ল্যান্ডফিলটি আরো কয়েক বছর চলবে। তবে আধুনিক পরিশোধনাগারের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করতে মন্ত্রণালয়ে প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হলেও এখনো সাড়া মেলেনি।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের সংগৃহীত প্রায় ২০০ টন বর্জ্য প্রতিদিন ফেলা হয় কাউনিয়া এলাকায়। উন্মুক্তভাবে ওই বর্জ্য ফেলায় প্রায় ভরাট হয়ে গেছে ভাগাড়। তবে চরবাড়িয়ায় আরো আট একর খাসজমি অধিগ্রহণ করছে সংস্থাটি। কিন্তু আধুনিক শোধনাগার গড়ার বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) এলাকা থেকে দিনে সংগ্রহ করা হয় প্রায় ৩৫০ টন বর্জ্য। নিজস্ব জমি না থাকায় জেলা প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে তা ফেলা হচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। নাসিক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী জানান, করপোরেশনের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের সৈয়দপুরে বেশির ভাগ বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এ ছাড়া সুষ্ঠু ও বৈজ্ঞানিকভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য জালকৌড়ীতে ২৩ একর জমি পাওয়া গেছে। সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ এফ এম এহতেশামুল হক জানান, ওই স্থানে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায় নাসিক। কিন্তু বরাদ্দ পাওয়া জমি নিচু হওয়ায় তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

এদিকে রংপুর, রাজশাহী ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের বর্জ্যের ভাগাড় এখনো খালি রয়েছে। আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি নিয়ে জোরালোভাবে ভাবলেও মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি মেলেনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা