kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ঈশ্বরগঞ্জে স্কুলছাত্রকে হত্যা

নিহতের মা জানেন না তিনি মামলার বাদী!

আঞ্চলিক প্রতিনিধি, ময়মনসিংহ   

১৮ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নিহতের মা জানেন না তিনি মামলার বাদী!

ছেলেকে গলায় ছুরি মেরে গুরুতর আহতের পর ওই রাত ৩টায় ছেলে মারা যায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ছেলে আহত হওয়ার পর থেকে তার মৃত্যু পর্যন্ত তার সঙ্গে মাসহ অন্য স্বজনরা ছিল। ওই অবস্থায় ছেলেটির মৃত্যুর আগেই তার মাকে বাদী দেখিয়ে ১১ জনকে অভিযুক্ত করে হত্যাচেষ্টার মামলা নথিভুক্ত করে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ থানার পুলিশ। ঘটনার এক দিন পর মামলা করার কথা সাফ অস্বীকার করেছেন নিহত স্কুলছাত্র জায়দুল ইসলামের মা নুরেজা পারভীন। মামলার এজাহারের স্বাক্ষরটির সঙ্গেও তাঁর স্বাক্ষরের কোনো মিল নেই। এ ঘটনা জানার পর ময়মনসিংহ পুলিশ সুপারের নির্দেশে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে নিহত স্কুলছাত্রের মা-বাবা ও ভাইকে বাড়ি থেকে ময়মনসিংহের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে নিয়ে যায় ঈশ্বরগঞ্জ থানা পুলিশ।

এদিকে জায়দুল হত্যার বিচারের দাবিতে তাঁর বন্ধু-বান্ধব ও সহপাঠীরা গতকাল সকাল সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর সোয়া ১টা পর্যন্ত শহরের মুক্তিযোদ্ধা মোড়ে অবস্থান নিয়ে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে। এতে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। চরম দুর্ভোগে পড়ে যাত্রী ও চালকরা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, উপজেলা দত্তপাড়া মহল্লার মো. রফিকুল ইসলামের ছেলে জায়দুল ইসলাম (১৬) পৌরসভার প্রতিশ্রুতি মডেল হাই স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। গত মঙ্গলবার সকালে নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশ নিতে সে বাড়ি থেকে রিকশায় স্কুলে যাচ্ছিল। স্কুল থেকে প্রায় ৫০০ গজ দূরে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের ফিসারিসংলগ্ন স্থানে দুর্বৃত্তরা তাকে রিকশা থেকে নামিয়ে গলায় ছুরি মারে। লোকজন তাকে উদ্ধার করে প্রথমে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও পরে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। মঙ্গলবার রাত ৩টার দিকে জায়দুলের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় পুলিশ অভিযুক্ত মশিউর রহমান কাঞ্চনকে (৩০) গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আর কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

ঈশ্বরগঞ্জ পৌরশহরের দত্তপাড়া মহল্লার বাড়িতে জায়দুলের মা নুরেজা পারভীন গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, তাঁর ছেলে মঙ্গলবার সকাল পৌনে ১০টার দিকে দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হয়ে গুরুতর আহত হয়। তারপর থেকে তিনি স্বজনদের সঙ্গে নিয়ে ছেলের চিকিত্সা করার জন্য ময়মনসিংহ ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যান। তাঁর ছেলে মারা গেলে বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তিনি দত্তপাড়ার বাড়িতে ফেরেন। এ সময়ের মধ্যে তিনি থানায় কোনো মামলা করেননি। থানা থেকে কেউ তাঁর কাছে আসেনি।

জায়দুলের বাবা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘তাঁর স্ত্রী ঘটনার পর থেকে পুত্র শোকে কাতর ছিলেন। তিনি কখনো থানায় যাননি। কিভাবে মামলা হয়েছে তা আমরা জানি না। আর কথিত মামলায় করা স্বাক্ষরও ভুয়া।’  

মামলার এজাহারে দেখা গেছে, বাদীর নাম মোছা. নুর জাহান। মামলা রেকর্ড করার সময় দেখানো হয়েছে ১৬ অক্টোবর রাত ১২টা ৫ মিনিট। এজাহারটি দেখালে নুরেজা পারভীন বারবার বলতে থাকেন, ‘আমি মামলা করার জন্য থানায় যাইনি। থানা থেকে পুলিশের কেউ আমার কাছে আসেনি।’ একপর্যায়ে সাংবাদিকরা জায়দুলের মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্রটি দেখতে চাইলে তিনি দেখান। সেখানে তাঁর নাম লেখা মোছা. নুরেজা পারভীন। পরে একটি সাদা কাগজে তিনি সই করে দেখান। তাঁর করা স্বাক্ষরের সঙ্গে থানায় মামলা দেওয়ার স্বাক্ষরের কোনো মিল নেই। 

নিহতের চাচাতো ভাই মো. হারুন অর রশিদ বলেন, ‘বুধবার রাত ১১টায় জায়দুলের দাফন হয়েছে। আমরা এখন পারিবারিকভাবে আলোচনা করে মামলা করব। আগে দায়ের হওয়া মামলা সম্পর্কে আমাদের পরিবারের কেউ অবগত নয়। মামলায় আসামি করার ব্যাপারে আমাদের কেউ জিজ্ঞাসা করেনি।’

এ বিষয়ে জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) এস এ নেওয়াজ কালের কণ্ঠকে বলেন, স্বাক্ষর জাল বা ভুয়া হতে পারে না। তাঁর (বাদী নুরজাহান) ছেলের কাছে ফোনে জানতে চাইলে সে তো জানিয়েছে, এটাই তাঁর মায়ের স্বাক্ষর। তার পরও নিহতের পরিবার যদি মনে করে আরো আসামি দেওয়ার দরকার ছিল, তাহলে তাঁরা একটি আবেদন করলে সেটি জিডি করে আদালতে পাঠিয়ে দিলে এজাহারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে। তিনি আরো বলেন, তার পরও তাঁদের আসতে বলা হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা