kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

সিলেটে রবীন্দ্র স্মরণোৎসব

শেষ মুহূর্তে জটিলতা

গঠিত পর্ষদে দু-তিনজনের বেশি ‘রবীন্দ্রপ্রেমী’ নেই
মেয়র আরিফুলকে পর্ষদের সদস্যসচিব করা নিয়ে চার মাস পর আপত্তি

সিলেট অফিস   

১৮ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



শেষ মুহূর্তে জটিলতা

সিলেটে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আগমনের শতবর্ষ স্মরণোৎসব নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। আগামী ৭ ও ৮ নভেম্বর উৎসবটি হওয়ার দিনক্ষণ চূড়ান্ত। উৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত থাকারও কথা রয়েছে। উৎসবের সব প্রস্তুতির যখন ‘দাড়ি’ টানা হচ্ছে ঠিক তখনই আহ্বায়ক পর্ষদ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সরকারদলীয় কয়েকজন নেতা। তাঁদের অভিযোগ, পর্ষদে দু-তিনজনের বেশি ‘রবীন্দ্রপ্রেমী’ নেই। সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে পর্ষদের সদস্যসচিব করা নিয়েও রয়েছে ঘোর আপত্তি।

অন্যদিকে আহ্বায়ক পর্ষদ গঠনের চার মাস পর এ নিয়ে প্রশ্ন তোলাকে ‘উদ্দেশ্যমূলক’ আখ্যা দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, সর্বজনীন স্মরণোৎসবকে রাজনৈতিকীকরণের পাঁয়তারা চলছে। বিষয়টি নিয়ে সিলেটের সংস্কৃতি অঙ্গনেও দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

১৯১৯ সালের নভেম্বরে সিলেটে এসেছিলেন বিশ্বকবি। সিলেটে তিন দিন অবস্থানকালে তিনি নাগরিক সংবর্ধনা, মানপত্র গ্রহণ, মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজের শিক্ষার্থীদের সামনে বক্তব্য দিয়েছিলেন। নগরের মাছিমপুরে মণিপুরিদের জীবনযাত্রা ও নৃত্য দেখতে গিয়েছিলেন তিনি। এ বছর রবীন্দ্রনাথের সিলেট আগমনের ১০০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। এ উপলক্ষে গত ২৩ জুন সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে আহ্বায়ক এবং সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে সদস্যসচিব করে একটি আহ্বায়ক পর্ষদ গঠন করা হয়েছিল। পরে গত ৩ জুলাই পর্ষদের উদ্যোগে উৎসবের লোগো উন্মোচন হয়। সর্বশেষ এ স্মরণোৎসব সামনে রেখে গত ১১ অক্টোবর সিলেটে স্মরণকালের সর্ববৃহৎ সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতাও অনুষ্ঠিত হয়। এতে সিলেট বিভাগের চার জেলার এক হাজার ৭০০ প্রতিযোগী অংশ নেয়।

নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, ওই সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানের আগের দিন গত ১০ অক্টোবর রাতে শতবর্ষ স্মরণোৎসবকে সামনে রেখে নগরের ধোপাদীঘির পারের সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের বাসায় ১৪ দল নেতাদের নিয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সিলেটের সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান অভিযোগ করেন—এমনসব মানুষ নিয়ে পর্ষদ গঠন করা হয়েছে যাঁদের মধ্যে দু-তিনজনের বেশি ‘রবীন্দ্রপ্রেমী’ মিলবে না। পর্ষদে বহু প্রতিক্রিয়াশীলদের উপস্থিতিও রয়েছে। রবীন্দ্র অনুরাগী অনেককে বাদ দেওয়া হয়েছে—দাবি জানানোর পাশাপাশি তিনি বলেন, ‘যে কমিটির আহ্বায়ক আবুল মাল আবদুল মুহিত সেখানে আরিফুল হক চৌধুরীকে মানায় না। অন্য কাউকে সদস্যসচিব করা হোক।’ তাঁর এই প্রস্তাবে আওয়ামী লীগের আরো দু-তিনজন নেতা সমর্থন দেন। তবে বেশির ভাগই তাতে সায় দেননি। সভায় উপস্থিত সিলেট সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আশফাক আহমদ পাল্টা প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘চার মাস আগে পর্ষদ গঠন হয়। এত দিন প্রশ্ন তোলা হয়নি কেন?’

এ রকম পরিস্থিতিতে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বিষয়টি নিজে দেখবেন বলে সবাইকে আশ্বস্ত করে সভা শেষ করেন। তবে এ ঘটনা তুমুল আলোচনার জন্ম দেয়। বিশেষ করে সংস্কৃতি অঙ্গনে এর প্রভাব পড়ে। সাংস্কৃতিক নেতারা বলছেন, দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে সিলেটের সব মানুষকে নিয়ে তাঁরা রবীন্দ্রনাথের সিলেট আগমনের স্মরণোৎসব করতে চান। এখানে কোনোভাবে কোনো দল বা গোষ্ঠীর কাছে তাঁরা মাথানত করবেন না। যদি সে রকম কিছু ঘটে তবে তাঁরা অনুষ্ঠান আয়োজন থেকে সরে দাঁড়িয়ে নিজেদের মতো করে শতবর্ষ পালন করবেন। এ পরিস্থিতিতে এখন সবাই সাবেক অর্থমন্ত্রী ও স্মরণোৎসব পর্ষদের আহ্বায়ক আবুল মাল আবদুল মুহিতের দিকে তাকিয়ে আছেন।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে সম্মিলিত নাট্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রজত কান্তি গুপ্ত বলেন, ‘এই আয়োজন কোনোভাবে কলুষিত হোক তা আমরা চাই না।’ পর্ষদ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘সিলেটে যতগুলো সাংস্কৃতিক ফেডারেশন আছে সবই এর সঙ্গে যুক্ত আছে। সবার সমন্বয়ে এটা করা হয়েছে।’ রবীন্দ্রনাথ স্মরণোৎসবে প্রধানমন্ত্রী আসার ইচ্ছা পোষণ করায় পুরো আয়োজন অন্যমাত্রা পেয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি মাথায় রেখে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে এটিকে একটি স্মরণযোগ্য অনুষ্ঠানে রূপ দিতে হবে।’

অভিযোগ উঠলেও তার বড় কোনো প্রভাব পড়বে না বলে মনে করেন সম্মিলিত নাট্য পরিষদ সিলেটের সভাপতি মিশফাক আহমদ মিশু। তিনি বলেন, ‘পর্ষদ গঠনের চার মাস পর এ রকম প্রশ্ন তোলার কোনো যৌক্তিকতা দেখি না। যেহেতু আবুল মাল আবদুল মুহিত এখানে অভিভাবক হিসেবে আছেন, সুতরাং এটা নিয়ে খুব সমস্যা হবে আমার মনে হয় না।’

১০০ বছর আগে সিলেটে যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ছিল সেটি এ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে চান জানিয়ে পর্ষদের যুগ্ম আহ্বায়ক ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সিলেটের সভাপতি আমিনুল ইসলাম লিটন বলেন, ‘আবুল মাল আবদুল মুহিত আমাদের কথা দিয়েছেন, সবাইকে নিয়েই এ স্মরণোৎসব হবে। আমরা কোনোভাবে কোনো দল বা গোষ্ঠীর কাছে মাথানত করব না।’

সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদরউদ্দিন আহমদ কামরান বলেন, ‘বর্তমানে যে কমিটি গঠন করা হয়েছে সেটি সর্বজনীন নয়। সবাইকে নিয়ে যেন উৎসবটি সর্বজনীন হয় এটাই আমার প্রত্যাশা। উৎসবটিকে রাজনৈতিক দলীয়করণ করা হচ্ছে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে এ কমিটিতে রাখার পক্ষে আমি মত দিয়েছি।’

সদস্যসচিবের পদ নিয়ে আপত্তির কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত যেখানে আহ্বায়ক সেখানে তাঁর সমপর্যায়ের কাউকে সদস্যসচিব করা উচিত।’ এখানে ব্যক্তি আরিফুল হক চৌধুরী না, নগরবাসীর প্রতিনিধি হিসেবে মেয়রকে এই পদ দেওয়া হয়েছে বলে সংস্কৃতিকর্মীরা জানিয়েছেন—এ বিষয়ে জানতে চাইলে কামরান বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। কারণ কারা তাঁকে এই পদ দিয়েছেন, কবে দিয়েছেন, কোন সভায় দিয়েছেন, সেসবের কিছুই আমি জানি না।’ 

এ ব্যাপারে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘কয়েক মাস ধরেই জানি, রবীন্দ্র স্মরণোৎসবের প্রস্তুতি চলছে। এখন এটা নিয়ে সমস্যা তৈরি করা ঠিক নয়। আবুল মাল আবদুল মুহিত যেহেতু আছেন, তিনি নিশ্চয়ই সুন্দর একটা সমাধান দেবেন।’

একই মন্তব্য করেন ১৪ দলের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি সিলেট জেলা সভাপতি সিকন্দর আলী। ওই সভায় নিজে উপস্থিত ছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘স্মরণোৎসবের কমিটি গঠনের সময় আমরা না থাকলেও পরবর্তী সব সভায় মেয়র আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। লোগো উন্মোচন অনুষ্ঠানেও ছিলাম।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা