kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

রাবিতে ভিন্নমত সহ্য করে না ছাত্রলীগ

গত ৩ বছরে নির্যাতনের শিকার ৪৯ শিক্ষার্থী দোষ ঢাকতে শিবির-ছাত্রদল তকমা

রেদওয়ানুল হক, রাবি   

১৮ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রাবিতে ভিন্নমত সহ্য করে না ছাত্রলীগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সরকারের সমালোচনা কিংবা ভিন্নমত প্রকাশ করলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমর্থক ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের মারধরের শিকার হন শিক্ষার্থীরা। গত তিন বছরে কমপক্ষে ৪৯ জন শিক্ষার্থী সংগঠনটির নেতাকর্মীদের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। নির্যাতনের পর শিবির-ছাত্রদল কিংবা মাদক কারবারি তকমা দিয়ে পুলিশে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।

এমন ঘটনাকে বাক্স্বাধীনতার পরিপন্থী বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক। তাঁরা মনে করেন, ভিন্নমত প্রকাশ বা সমালোচনা সহ্য করা গণতন্ত্রেরই অংশ। তবে ভিন্নমত যখন রাষ্ট্রবিরোধী কিংবা বিভ্রান্তি ছড়াবে, সে ক্ষেত্রে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. মো. সুলতান মাহমুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শিক্ষার্থী নির্যাতনকে বৈধতা দিতেই ভুক্তভোগীদের শিবির-ছাত্রদল তকমা দেওয়া হয়। যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী তারা কখনোই এ কাজ করতে পারে না। কিছু নেতাকর্মী, যারা আদর্শের রাজনীতি করে না তারাই এসব করে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত তিন বছরে শুধু ছাত্রদল-শিবির সন্দেহেই মারধরের শিকার হয়েছেন ৪০ শিক্ষার্থী। এ ছাড়া কোটা সংস্কার আন্দোলনের একজন, ছাত্রলীগের নিষেধাজ্ঞা না শোনায় ছয়জন এবং প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করায় আরো দুজন নির্যাতিত হন। অনেককেই তুলে দেওয়া হয় পুলিশের হাতে। কিন্তু অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ায় অনেককেই ছেড়ে দিতে হয়েছে।

হলে কিংবা ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে মারধরের এসব ঘটনা ঘটলেও নিশ্চুপ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কোনো শিক্ষার্থীকে মারধর করা হচ্ছে—এমন খবর পেলেও প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছেন খুব দেরিতে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন অধ্যাপক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যখন যেই দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের অনুসারীরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পেয়ে থাকে। তাই তারা সরকার সমর্থক ছাত্রসংগঠনের বিরোধিতা করে না।’

চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি সুরঞ্জিত প্রসাদ বৃত্তের নেতৃৃত্বে কয়েকজন নেতাকর্মী তিন শিক্ষার্থীকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলে জিম্মি করে ২০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন। পরে তাঁদের মারধর করে মাদক কারবারি ও ছাত্রদল আখ্যা দিয়ে পুলিশে দেওয়া হয়। এর আগে ১৮ জানুয়ারি মাজহারুল ইসলাম নামের এক ছাত্রদলকর্মীকে মারধর করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

গত বছরের ১৮ অক্টোবর ১৪ জন ও ২৭ ফেব্রুয়ারি ৯ জনকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে এবং এর আগের বছরের আগস্টে সোহরাওয়ার্দী হলে ১৩ শিক্ষার্থীকে রাতভর পিটিয়ে শিবির আখ্যা দিয়ে পুলিশে দেওয়া হয়। গত বছরের ১ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাণিজ্যিক সিনেমার প্রদর্শনীর প্রতিবাদ করায় ছয়জন এবং ২ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা তরিকুল ইসলাম মারধরের শিকার হন। হাতুড়ি ও লাঠি দিয়ে পিটিয়ে তরিকুলের কোমর ও পায়ের হাড় ভেঙে দেওয়া হয়। তিনি আজও সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারেন না। এ ছাড়া ১৩ নভেম্বর ও ৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ায় দুই শিক্ষার্থী নির্যাতিত হন। মারধরের পর ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে ফোন ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।

জানতে চাইলে ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা যাদের পুলিশে দেই তাদের অনেকের নামেই নাশকতা মামলা রয়েছে। একটা সময় শিবির আমাদের নেতাকর্মীদের অনেক ক্ষতি করেছে। অনেকের হাত-পা কেটে নিয়েছে। আমরা ক্যাম্পাসে সুষ্ঠু পরিবেশ ও শিবিরমুক্ত রাখতে চাই। তাই সন্দেহ হলে আমরা তাদের ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করি। আর শিবিরসংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেলেই কেবল পুলিশে দেই।’ 

মারধরকারীরা ক্যাম্পাসেই প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় তাঁরা নির্বিঘ্নে এ ধরনের কাজ করছেন। ব্যবস্থা নিলে বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের অপরাধ কমত—মনে করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক লুত্ফর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভুক্তভোগীরা আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ করে না। তারা অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেওয়া যেত।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা