kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বিবিসিকে নোবেলজয়ী অভিজিৎ

দুর্নীতি থাকলেই পরিবর্তন আটকে থাকে না

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৮ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দুর্নীতি থাকলেই পরিবর্তন আটকে থাকে না

এ বছরের অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী বাঙালি অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেন, একটি দেশে দুর্নীতি থাকলেই সব কিছু অচল হয়ে যায় না। তিনি বলেন, কোনো একটি বিষয় দারিদ্র্য বিমোচন আটকে রাখে না। গতকাল বৃহস্পতিবার বিবিসি বাংলাকে টেলিফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভারতীয় এই নোবেলজয়ী এ কথা বলেন। গতকালই বিশ্বজুড়ে পালিত হয়েছে দারিদ্র্য বিমোচন দিবস।   

দারিদ্র্য বিমোচনে অনেক সমাধান লাগবে উল্লেখ করে অভিজিৎ বলেন, ‘এর সাথে অনেক বিষয় জড়িত। দুর্নীতি থাকলেই সব কিছু অকেজো হয়ে যাবে তা নয়। মানে দুর্নীতির ভেতরেও অনেক কিছু হয়, পরিবর্তন হয়। যে দেশে দুর্নীতি আছে সে দেশে পরিবর্তন আটকে থাকে না।’ তিনি বলেন, ‘যেসব লোক দুর্নীতিতে জড়িয়ে থাকে, তাদেরও ভোটে জেতার আশা থাকে।’

ইন্দোনেশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট সুহার্তোর উদাহরণ টেনে অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, তিনি ‘বিখ্যাত দুর্নীতিগ্রস্ত প্রেসিডেন্ট’ ছিলেন বলে নানা লোকে বলে। কিন্তু ইন্দোনেশিয়ায় সবার জন্য স্কুল এবং অপুষ্টি দূর করার ওপর জোর দিয়েছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আরো যে দুজন নোবেল পুরস্কার জিতেছেন, তাঁদের একজন তাঁর ফরাসি স্ত্রী এস্তার ডুফলো, অন্যজন যুক্তরাষ্ট্রের মাইকেল ক্রেমার। পুরস্কার পাওয়ার পর এস্তার ডুফলো বলেন, ৩০ বছরে বিশ্ব অর্থনীতি থেকে দুটি গ্রুপ খুবই লাভবান হয়েছে। একটি অংশ হচ্ছে অতি ধনী এবং অন্য অংশটি হচ্ছে অতি দরিদ্র।

তার অর্থ কি মধ্যবিত্তরা মার খাচ্ছে?—এ প্রশ্নে অভিজিৎ বলেন, ‘হ্যাঁ, তারা মার খেয়েছে। যেমন—মার্কিন দেশে, যেখানে আমরা থাকি, সেখানে মধ্যবিত্তরা মার খেয়েছে। এবং দরিদ্ররাও মার খেয়েছে। মার্কিন দেশে যারা দরিদ্র, তারাও পৃথিবীতে মধ্যবিত্ত। তারাও মার খেয়েছে। যারা মার খায়নি তারা হচ্ছে পৃথিবীর দরিদ্র দেশের দরিদ্র লোকেরা—ভারতবর্ষ, বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং চীন—এসব দেশের দরিদ্রদের উন্নতি হয়েছে।’

পৃথিবীর নতুন ধন-সম্পদ সব ধনীর কাছে যাচ্ছে, এ কথা উল্লেখ করে অভিজিৎ বলেন, সেখান থেকে দুই-চার ফোঁটা যেগুলো ছিটকে যাচ্ছে সেগুলোও যদি গরিবরা পায় তাতেই তারা এগিয়েছে। কারণ তারা এতটাই দরিদ্র যে সে দুই-চার ফোঁটাও তাদের কাজে লাগছে।

দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘ব্র্যাকের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে দারিদ্র্য একটি সমস্যা নয়, এটা বহুমাত্রিক সমস্যা। কিছু প্রকল্প আছে যার মাধ্যমে অতি দরিদ্রদের জন্য কাজ করা যায়। অন্য আরেকটি অংশ আছে যারা তাদের চেয়ে কম দরিদ্র। ব্র্যাক অনেক আলাদা ধরনের প্রগ্রাম করে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য-শিক্ষাও রয়েছে। তাদের ধারণা আমাদের মতোই। নানা সমস্যার নানা সমাধান আছে।’

নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরে অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে ভারতে বেশ বিতর্ক হচ্ছে। বলা হচ্ছে, তিনি কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর উপদেষ্টা ছিলেন। ক্ষমতাসীন বিজেপির অনেক নেতা অভিজিেক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

এ প্রসঙ্গে অভিজিৎ বলেন, তিনি এই বিতর্কে জড়াতে চান না। তা ছাড়া তিনি কখনো রাহুল গান্ধীর উপদেষ্টা ছিলেন না। তিনি বলেন, ‘উপদেষ্টা হতে গেলে যে ধরনের লেভেল অব ইন্টার‌্যাকশন লাগে সেটা আমার কোনো সময়ই ছিল না। কিন্তু তাই বলে আমি নিশ্চয়ই বলছি না যে আমি ওদের বিরোধীও নই। পলিটিক্সের সঙ্গে আমাদের কাজটা জড়াতে আমি অসম্মত।’ তিনি বলেন, আবদুল লতিফ জামিল ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তিনি গুজরাটে মোদি সরকার এবং পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেও কাজ করেছেন।

অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিন্তা হচ্ছে, দরিদ্রদের উন্নয়নের জন্য অর্থ যাতে ঠিকমতো খরচ করা হয়, সেদিকে তাদের দৃষ্টি বেশি। কোন রাজনৈতিক দল সেটি করছে তা মুখ্য বিষয় নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ভারতের কলকাতা শহর অনেকের কাছেই ‘নোবেল নগরী’ হিসেবে পরিচিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অমর্ত্য সেন এবং মাদার তেরেসাসহ কয়েকজন নোবেল বিজয়ীর সঙ্গে এই শহরের সংযোগ রয়েছে। এখন এই তালিকায় যুক্ত হলেন অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি কলকাতা শহরেই বেড়ে উঠেছেন।

১৯৮১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৮৩ সালে জওয়াহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন অভিজিৎ। পরে ১৯৮৮ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন হার্ভার্ড থেকে।

অভিজিৎ ব্যানার্জি বলেন, কলকাতা একসময় ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড় শহর ছিল। সেখানে সবাই আসত। কলকাতা ভারতবর্ষের সবচেয়ে এগিয়ে থাকা শহর ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘সেই দিনটা এখন গেছে কলকাতার। সেটাই দুঃখের কথা। অনেকে কলকাতায় জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কাটিয়েছিল। কলকাতায় বসে রিসার্চ করেছিল। রবীন্দ্রনাথ কলকাতায় বসে তাঁর কাজ করেছিলেন। সেটা কলকাতায় যে হচ্ছে না সেটাই দুঃখজনক।’

নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর আপনার জীবনে কী বদলেছে?—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জীবন আপাতত কিছু বদলাবে না। আপাতত প্রতি ঘণ্টায়-ঘণ্টায় এখন মিটিং, ফোন কল, ইন্টারভিউ চলছে। আশা করি কিছুদিন পর এটা থিতিয়ে যাবে এবং আমার জীবনটা যা ছিল সেখানে পুরোদস্তুর ফিরে যাবে।’

তিনি বলেন, দারিদ্র্য নিয়ে অনেকে অনেক কিছু বলে আবার অনেকে ভুলও বলে। অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় দারিদ্র্য বিষয়ে তত্ত্বের ভেতরে না থেকে হাতে-কলমে দেখিয়েছেন যে দারিদ্র্যের চেহারাটা কেমন এবং সেখান থেকে বের হওয়ার উপায় কী। তিনি বলেন, ‘আমরা বাড়িতে বসে চোখ বন্ধ করে তত্ত্ব বের না করে লোকেরা যা করছে যেটা দেখে তার ভেতর থেকে তত্ত্বটা বের করেছি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা