kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

শনাক্তকরণ ভুল হলেও যাচাইয়ে সময় লাগবে

চাঁদাবাজির ফোনে জিসানের অবস্থান নিয়ে অস্পষ্টতা

কালা জাহাঙ্গীর, ডাকাত শহীদ ও পিচ্চি হান্নানকে নিয়েও এখনো আলোচনা

এস এম আজাদ   

১৮ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চাঁদাবাজির ফোনে জিসানের অবস্থান নিয়ে অস্পষ্টতা

জিসান আহমেদ

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদ সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহরে গ্রেপ্তার হয়েছেন—এই খবর প্রকাশের পর তাঁর অবস্থান নিয়ে দুটি গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। একটি হচ্ছে, ‘দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি প্রকৃত জিসান নন।’ অন্যটি হলো, ‘গ্রেপ্তার হওয়া জিসান এরই মধ্যে জামিন নিয়ে ভারতে চলে গেছেন।’ দেশের কিছু গণমাধ্যমে গোপন সূত্রের বরাতে প্রশ্ন তুলে সংবাদও প্রকাশ করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, যে বিদেশি ফোন নম্বর থেকে জিসানের নামে দেশে যোগাযোগ করা হতো এবং চাঁদা দাবি করা হতো, সেই নম্বরে এখনো যোগাযোগ অব্যাহত থাকায় দ্বিধায় পড়েছেন অনেকে। এমন নম্বর থেকে ফোন করে জিসান লন্ডনে আছেন বলেও দাবি করা হয়। ভিন্ন নম্বর থেকে তাঁর ভারতে থাকার দাবিও করা হয়। কিছু গোয়েন্দা ও সাংবাদিকের সূত্রের কাছে এসব তথ্য আছে বলে এসংক্রান্ত সংবাদে উল্লেখ করা হয়। তবে পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোলের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর (এনসিবি) মাধ্যমে যোগাযোগ করে বাংলাদেশ পুলিশ এখনো নিশ্চিত যে দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের পর এখন পর্যন্ত সেখানে কারাগারেই আছেন জিসান। তাঁর অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হওয়ার পর পুলিশ সদর দপ্তর এনসিবির মাধ্যমে দুবাইয়ে যোগাযোগ করে তথ্য যাচাই করে নিশ্চিত হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দাবি করছেন, বিদেশে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামে অনেক সহযোগীও দেশে ফোন করে চাঁদা দাবি করে। আবার শীর্ষ সন্ত্রাসীরা নিখোঁজ বা নিহত হলে তাদের নিয়ে বিভিন্ন গুঞ্জন ছড়ায়। শীর্ষ সন্ত্রাসী কালা জাহাঙ্গীর, পিচ্চি হান্নান ও ডাকাত শহীদকে নিয়েও নানা গুঞ্জনের সৃষ্টি হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, দুবাই পুলিশের গ্রেপ্তার করা ব্যক্তি জিসান না হলে সেটি বাংলাদেশে গোয়েন্দাদের যাচাইয়ে ধরা পড়বে। বিষয়টি ভুল কি না, তা নিশ্চিত হতে কালের কণ্ঠ প্রতিবেদককে আরো অপেক্ষার অনুরোধ জানান তাঁরা।

দুবাইয়ে গ্রেপ্তার সন্ত্রাসী জিসান কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন—এমন খবরের ব্যাপারে জানতে চাইলে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের মুক্তির খবর ভিত্তিহীন। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে।’

গতকাল পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, ‘আমরা আগের অবস্থানেই আছি। এখন পর্যন্ত আমাদের তথ্য সঠিক। আমরা প্রপার চ্যানেলে যোগাযোগ করেছি। সেখানে জিসান সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছি। আজও (গতকাল) এনসিবির মাধ্যমে তথ্য যাচাই করেছি।’

গত ৩ অক্টোবর একটি প্রেস নোট দিয়ে পুলিশ সদর দপ্তর শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের গ্রেপ্তার হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে। এনসিবি শাখার এআইজি মাহিউল ইসলাম তখন বলেন, ‘দুবাই এনসিবি জিসানকে গ্রেপ্তারের পর আমাদের তা জানিয়েছে। আমরা তাদের সঙ্গে আইপি ফোনে যোগাযোগ করি এবং ভেরিফাই করে নিশ্চিত হই গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিই জিসান। তাকে দুবাইয়ের জুডিশিয়াল কাস্টডিতে নেওয়া হয়।’

একটি সূত্র জানায়, গত ৩ অক্টোবর জিসানকে দুবাই থেকে গ্রেপ্তার করার পরও বিভিন্ন সূত্র থেকে তিনি গ্রেপ্তার হননি বলে খবর আসতে থাকে। জিসান বিদেশে যে নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো ও ভাইভার অ্যাপ ব্যবহার করেন সে নম্বর খোলা ছিল। কথিত সেই জিসান ইউরোপের কয়েকটি দেশ ঘুরে লন্ডনে অবস্থান করছেন বলে জানায় সূত্র। গ্রেপ্তার না হওয়া জিসানের দাবি, তিনি আগে ভারতের পাসপোর্টধারী থাকলেও সেটি বাদ দিয়ে আরেকটি দেশের পাসপোর্ট নিয়ে চলছেন। আরেকটি সূত্রের দাবি, জিসান হিসেবে দুবাই পুলিশ যাঁকে গ্রেপ্তার করেছে তিনি এরই মধ্যে জামিন পেয়ে ভারতে চলে গেছেন। পুলিশের তথ্য মতে, দুবাইয়ে গ্রেপ্তার ব্যক্তির পাসপোর্টে নাম ‘আলী আকবর চৌধুরী’। জিসানের ভারতীয় পাসপোর্টে এটিই তাঁর নাম। বাংলাদেশ ও ভারত পুলিশ এ তথ্য নিশ্চিত হয়ে এনসিবির মাধ্যমে তা ইন্টারপোলের রেড নোটিশে দিয়েছে। তাঁকে গ্রেপ্তারের পর দুবাই পুলিশ এনসিবির মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশের কাছে তথ্য যাচাইয়ের অনুরোধ জানায়। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি) জিসানের প্রফাইল থাকায় সেটি যাচাই করে দুবাইয়ে গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে জিসান বলেই শনাক্ত করা হয়। এর পরও জিসানের নতুন কোনো ছবি না থাকায় এবং ফোনের ব্যক্তির কারণে গলদ থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছেন কয়েকজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে গোয়েন্দা পুলিশের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পতনে অপরাধজগতে মেরুকরণ হয়। এ কারণে অনেক সময় ইচ্ছা করে গুঞ্জন ছড়ানো হয়। এর আগে কালা জাহাঙ্গীর কোথায় আছে, তা নিয়ে অনেক গুঞ্জন হয়েছে। শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হান্নান ও ডাকাত শহীদ র‌্যাবের বন্দুকযুদ্ধে মারা গেলে তাদের নামে পরেও চাঁদাবাজি হয়। অনেক গুঞ্জনও ছড়ায়। সম্প্রতি ঢাকায় ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের পর অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুবলীগের দুই নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও জি কে শামীমের সঙ্গে জিসানের বিরোধের বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে।’ এসব কারণে এ প্রতিবেদককে গুঞ্জন বিশ্বাস না করে অপেক্ষা করে তা যাচাইয়ের পরামর্শ দেন ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা।

প্রসঙ্গত, ২০০১ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষিত দেশের শীর্ষ ২৩ সন্ত্রাসীর একজন জিসান। তাঁকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। রাজধানীর গুলশান, বনানী, বাড্ডা, মতিঝিলসহ বেশ কিছু অঞ্চলে তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির একাধিক মামলা ছিল তাঁর নামে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা