kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ইয়াবা পাচার

কৌশলে আড়ালে আন্তর্জাতিক চক্র

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

১৮ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কৌশলে আড়ালে আন্তর্জাতিক চক্র

আমেরিকা, ইতালি, সৌদি আরব, দুবাই, কাতার, ওমানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইয়াবা পাচারের পরও কৌশলে রক্ষা পেয়ে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক ইয়াবা পাচারকারী চক্র। বিভিন্ন দেশে বসে অপরাধ করায় এবং পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা ও অবস্থান শনাক্ত করতে না পারায় পুলিশ এসব ইয়াবা পাচারকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করতে পারছে না। ফলে তারা থেকে যাচ্ছে বিচারের বাইরে।

এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে চক্রটি নতুন বাহকের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইয়াবা পাচার অব্যাহত রেখেছে। প্রমাণ হিসেবে এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালির পুলিশ ওই সব দেশে অভিযান চালিয়ে ইয়াবা উদ্ধার করেছে। এতে দেশগুলোতে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ইয়াবা পাচারের একটি মামলায় জড়িত প্রমাণ হওয়ার পর দুই পাচারাকারীর বিষয়ে তদন্ত করতে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পুলিশ সদর দপ্তরের অনুমতি চেয়েছিল পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তবে পুলিশ সদর দপ্তর পিবিআইকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি। ফলে ওই মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করা মূল হোতাদের বাদ দিয়ে। এতে বিচার থেকে রক্ষা পেয়ে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্র।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক ইয়াবা পাচারকারী চক্রের কারণে যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, দুবাই, সৌদি আরব, কাতার, ওমানসহ অন্যান্য দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছে। আবার চক্রটিকে আইনের আওতায় আনতে না পারায় তাদের অপরাধমূলক কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে। চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইয়াবা উদ্ধারের আগে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও ইয়াবা উদ্ধার হয়েছিল। কিন্তু সেসব মামলায়ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করা ইয়াবা কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা যায়নি। এতে বোঝা যায়, বাংলাদেশের বাইরে বসে ইয়াবা পাচার করলে বিচারের মুখোমুখি হতে হয় না।

পুলিশ কর্মকর্তারা আরো বলছেন, ২০১৮ সালে ফেডেক্স কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে নিউ ইয়র্কে পাঠানো একটি পার্সেল থেকে দুই হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে ইন্ডিয়ানা পুলিশ। গত ৭ সেপ্টেম্বর ইতালির রোমের ভিল্লা দে সান্টিস এলাকা থেকে সে দেশের পুলিশ ৯৭৮ পিস ইয়াবাসহ তিন বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করে। সে দেশের পুলিশ ইয়াবাগুলোর নাম দেয় ‘হিটলার ড্রাগস’।

বাংলাদেশ থেকে ইয়াবা পাচার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী আহমদ নবী ও ইতালিপ্রবাসী মহিম ফারুকী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাদকপাচার কাণ্ডে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। বিমানবন্দরে কড়া তল্লাশির ব্যবস্থা রেখে কেউ যাতে ইয়াবা নিয়ে বিদেশে আসতে না পারে, সে ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি।’

ফেডেক্স আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ঢাকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ইয়াবা পাঠানোর একটি ঘটনা ধরা পড়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি। এ ছাড়া চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমাবন্দর দিয়ে ইয়াবা পাচারের তিনটি ঘটনায় গ্রেপ্তার আসামির বিরুদ্ধে পতেঙ্গা থানায় তিনটি মামলা হয় চলতি বছর।

যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, দুবাই ও মাসকাটে ইয়াবা পাচারের চার মামলার তদন্ত শেষে পুলিশ ও পিবিআই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। চার মামলার একটিতেও আন্তর্জাতিক পাচারকারীদের আসামি করা হয়নি। ‘সুনির্দিষ্ট তথ্য’ না পাওয়ায় মো. আরিফকে সৌদি আরবে ইয়াবা পাচার মামলায় আসামি করা হয়নি।

শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত ৪ এপ্রিল তিন হাজার ৮৮০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন মাসকাটগামী যাত্রী মো. সাহেদ। ১৯ এপ্রিল ৩৮৯ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন সৌদি আরবগামী যাত্রী মোস্তাফিজুর রহমান (৪৭) ও ওয়াশিম আকরাম নাবিল (২৪)। আর ১ জুন শারজাহগামী যাত্রী মোহাম্মদ সোহেল (৩০) গ্রেপ্তার হন পাঁচ হাজার পিস ইয়াবাসহ। তিন মামলার মধ্যে সৌদি আরবে ইয়াবা পাচার মামলায় মূল হোতা আরিফের নাম এজাহারভুক্ত হয়েছে। বাকি দুই মামলায় বিদেশে অবস্থানরত মূল হোতাদের আসামি করা হয়নি। অথচ তিন ঘটনায়ই গ্রেপ্তার আসামিরা বিদেশে কার কাছে ইয়াবা নিয়ে যাচ্ছিলেন সেই তথ্য প্রকাশ করেছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তদন্তের সীমাবদ্ধতার কারণে মূল হোতাদের নাম এজাহারভুক্ত করতে পারেনি পুলিশ।

আন্তর্জাতিক পাচারকারীদের নাম এজাহারভুক্ত না করার তথ্য সঠিক নয় দাবি করে পতেঙ্গা থানার ওসি উৎপল বড়ুয়া বলেন, ‘বাদী যেভাবে এজাহার দিয়েছেন, সেভাবেই মামলা রুজু হয়েছে। পুলিশ আসামির নাম বাদ দেয়নি।’ সৌদি আরবে ইয়াবা পাচারের মূল হোতা আরিফকে আসামি না করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সৌদি আরবে অবস্থানরত আরিফের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় তাঁকে আসামি করা হয়নি।’

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ইয়াবা পাচার মামলার অভিযোগপত্র গত ১৮ আগস্ট আদালতে দাখিল করেন পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমা। অভিযোগপত্রে বাংলাদেশের বাসিন্দা মো. ফারুক (২৭), জালাল উদ্দিন (২০) ও মঞ্জুরুল আলম মঞ্জুকে (২৭) আসামি করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী হওয়ায় আসামি করা হয়নি ইয়াবা পাচারের মূল হোতা মোহাম্মদ হাফিজ ও নামজুল রুশোকে।

অথচ আসামি ফারুক আদালতে জবানবন্দিতে জানিয়েছেন, ইয়াবা বিক্রির সময় আমেরিকাপ্রবাসী নাজমুল রুশোর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। রুশো আমেরিকা ফিরে গিয়ে মোবাইলে মো. হাফিজের সঙ্গে ফারুকের পরিচয় করিয়ে দেন। ২০১৮ সালে হাফিজ ফোনে ফারুককে ইয়াবা পাঠানোর প্রস্তাব দেন। ফারুক রাজি হয়ে কয়েক দফা ইয়াবা পাঠান। ফেডেক্স কুরিয়ার সার্ভিসের পার্সেল রিসিভার মো. জালাল ইয়াবার চালান রিসিভ করে আমেরিকায় পাঠাতেন। টাকা লেনদেন হতো ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মাধ্যমে। দুটি চালান যুক্তরাষ্ট্র পৌঁছালেও তৃতীয় চালানের দুই হাজার ইয়াবা জব্দ করে ইন্ডিয়ানা পুলিশ। এরপর কিছুদিন ইয়াবা পাচার বন্ধ থাকে। পরে গত ফেব্রুয়ারিতে ফের পাচার করতে গিয়ে ধরা পড়েন ফারুক।

তাঁর জবানবন্দিতে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী মো. হাফিজ ও নাজমুল রুশোর সম্পৃক্ততার কথা উঠে এলেও অভিযোগপত্রে তাঁদের আসামি করা হয়নি। তাঁদের আসামি না করার বিষয়ে অভিযোগপত্রের একাংশে লেখা হয়েছে, পলাতক আসামি মো. হাফিজ ও নাজমুল রুশোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় নাম-ঠিকানা যাচাই, আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ ও সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহে যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার অনুমতি দিতে পুলিশ সদর দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্তকারী কর্মকর্তা সন্তোষ কুমার চাকমা বলেন, ‘এখনো অনুমতি পাইনি যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার। ভবিষ্যতে অনুমতি পেলে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিলের সুযোগ আছে। এই মামলায় যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা হাফিজ ও নাজমুল জড়িত—এটা তদন্তে প্রমাণিত। শুধু পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা সংগ্রহ ও শনাক্ত করতে না পারায় তাঁদের আপাতত আসামি করা যায়নি।’ 

তদন্তকারী কর্মকর্তাকে কেন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে পিবিআই ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, ‘তদন্তের স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র পাঠানোর বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে চিঠি পাঠিয়েছে পিবিআই। পুলিশ সদর দপ্তর এই চিঠির আলোকে আরো কিছু তথ্য চেয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের চাওয়া তথ্যগুলোর বিষয়ে কাজ চলছে। পরে অনুমতি পাওয়া গেলে হাফিজ ও নামজুল রুশোর বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করতে পারবেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা