kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ নভেম্বর ২০১৯। ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

পরিকল্পিত দুটি খুনের প্রতিহিংসার বলি

শামস শামীম ও আবু হানিফ চৌধুরী, দিরাই (সুনামগঞ্জ)   

১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পরিকল্পিত দুটি খুনের প্রতিহিংসার বলি

তুহিন হত্যা

প্রায় দেড় যুগ আগের ঘটনা। সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের খেজাউড়া গ্রামের বাঁধে পার্শ্ববর্তী মধুপুর গ্রামের যুবক মুজিবুর রহমানের ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া যায়। এই ঘটনায় মুজিবুরের পিতা আবদুর রউফ খেজাউড়া গ্রামের সচেতন ও মাতুব্বর শ্রেণির ১৪ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। এই মামলার আসামিদের তালিকায় তুহিনের বাবা আব্দুল বাছিরের নামও ছিল।

সরেজমিনে গতকাল বুধবার এলাকায় গেলে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি বলেন, সহজ-সরল ও একরোখা হিসেবে পরিচিত বাছির মুজিবুর হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট ছিলেন না। নারীসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটায় মধুপুর গ্রামের এলাইছ মিয়া, তাঁর ভগ্নিপতি কনোরুল ও আনোয়ার হোসেনের লোকজন। কিন্তু আনোয়ার হোসেন ও তাঁর লোকজন নানা কৌশলে চার্জশিট থেকে নিজেদের নাম বাদ ফেলার ব্যবস্থা করেন—এমন অভিযোগ আছে। আর চার্জশিটে থাকা তিনজনের মধ্যে একজন হলেন আব্দুল বাছির।

চার্জ গঠন ও সাক্ষ্য্যগ্রহণ শেষে গত ১৪ অক্টোবর এই মামলার যুক্তিতর্ক শুনানির দিন ছিল। এর দুদিন আগে আদালতে আসতে ও উকিলের খরচের জন্য ভাই আব্দুল মোছাব্বিরকে চাপ দিচ্ছিলেন বাছির। আর গত রবিবার রাতে তুহিন হত্যাকাণ্ডের পর আইনজীবীকে ফোন করে মামলার তারিখ পেছানোর অনুরোধ করেছিলেন চাচা মাওলানা আব্দুল মোছাব্বির।

আরেকটি ঘটনা চার বছর আগের। খেজাউড়া গ্রামের একটি ছোট জলাশয় নিয়ে সাবেক ইউপি মেম্বার আনোয়ার হোসেন এবং শিশু তুহিনের দুই চাচা মাওলানা আব্দুল মোছাব্বির ও জমসেদ মিয়ার বিরোধ ছিল। ২০১৫ সালের ৭ অক্টোবর এ নিয়ে মামুলি সংঘর্ষ হয়। ঘটনা মীমাংসায় ৯ অক্টোবর বিচারের দিন ধার্য করা হয়। এর আগের দিন সন্ধ্যায় বাছিরের তালতো বোনের মেয়ে এক সন্তানের জননী নিলুফার বেগমকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় প্রতিপক্ষ আনোয়ার, সালাতুল, সোলেমানসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। মামলার সাক্ষী তুহিনের চাচা মাওলানা আব্দুল মোছাব্বির। এই মোছাব্বির একজন বিতর্কিত ব্যক্তি এবং একাধিক মামলার আসামি।

এলাকাবাসী জানায়, সাবেক মেম্বার আনোয়ার, সালাতুল, সোলেমানসহ প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে নিলুফার বেগমকে স্বজনরাই হত্যা করেন। এই মামলারও প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন না করে চার্জশিট দেয় পুলিশ। মামলাটি সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। তবে সম্প্রতি আপস নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এই আপসের বিরোধী ছিলেন মাওলানা আব্দুল বাছির।

এলাকাবাসী ও আইনজীবীরা জানান, দুই খুনের প্রকৃত তদন্ত হয়নি। ফলে অনেক নিরপরাধকে জড়িয়ে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। নিরপরাধ থাকার পরও মামলায় জড়িয়ে দণ্ডিত হওয়ার শঙ্কা থেকেই শিশু তুহিনকে নির্মমভাবে পরিবারের লোকজন খুন করেছেন।

আইনজীবী ও সচেতন লোকজন জানান, যথাযথভাবে দুটি মামলার চার্জশিট হলে একদিকে নিরপরাধ লোকজন রেহাই পেতেন, অন্যদিকে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে শিশু তুহিন হত্যার মতো নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটত না। সচেতন নাগরিকরা তুহিন হত্যায় জড়িত স্বজনদের কাছ থেকে নিলুফার আক্তার হত্যার তথ্য নতুন করে উদ্ঘাটনের আহ্বান জানিয়েছে।

সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি শহিদুজ্জামান চৌধুরী বলেন, দুটি হত্যা মামলার প্রকৃত তদন্ত হলে তুহিন হত্যার ঘটনা নাও ঘটতে পারত। বিচার না পেয়েই প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে এমন নিষ্ঠুর ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।

তুহিনের বাবাসহ তিনজন রিমান্ডে : তুহিন হত্যা মামলায় বাবা আব্দুল বাছির, চাচা জমসেদ ও মাওলানা আব্দুল মোছাব্বিরকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। আরেক চাচা নাসির ও চাচাতো ভাই শাহরিয়ার ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এই হত্যাকাণ্ডে আরো কেউ জড়িত কি না তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

দিরাই থানার ওসি এ কে এম নজরুল ইসলাম গতকাল এসব তথ্য জানান। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মুজিব ও নিলুফার হত্যা মামলা অনেক পুরনো। এসব মামলার তদন্ত ও চার্জশিট প্রদান বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই।’ এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতেও অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, পুলিশের তথ্য মতে গত সোমবার ভোরে তুহিনকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে বাবা ও চাচা নাসির গলা কেটে হত্যা করেন। পরে দুই কান ও যৌনাঙ্গ কেটে পেটে ছুরিবিদ্ধ করে লাশ ঝুলিয়ে রাখেন কদম গাছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা